‘শামীম ওসমান ও ক্যাডারদের গুলিতে আদিল-ইয়াসিন ঘটনাস্থলেই মারা যান’
জুলাই বিপ্লবে নারায়ণগঞ্জে ১০ জনকে হত্যার ঘটনায় করা মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় সাবেক সংসদ সদস্য শামীম ওসমানসহ ১২ আসামির বিরুদ্ধে দ্বিতীয় সাক্ষী হিসেবে জবানবন্দি দিয়েছেন যুবদলনেতা এনআরবি মামুন। আজ মঙ্গলবার (২৮ জুলাই) আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১-এর সদস্য বিচারক মো. মোহিতুল হক এনাম চৌধুরীর একক বেঞ্চ শুনানি অনুষ্ঠিত হয়। পরবর্তী সাক্ষ্যগ্রহণের জন্য আগামী ১২ আগস্ট দিন ধার্য করেছেন ট্রাইব্যুনাল।
সাক্ষ্যগ্রহণ শেষে তাকে জেরা করেন স্টেট ডিফেন্স আইনজীবী আমির হোসেন, আলী হায়দার ও মুসতাভী হাসান রাতুল।
এদিন দুই নম্বর সাক্ষী হিসেবে জবানবন্দি দেন এনআরবি মামুন। তিনি ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্ট আন্দোলনে সরাসরি অংশ নেন।
জবানবন্দিতে মামুন বলেন, তার বর্তমান বয়স আনুমানিক ৪১ বছর। তার ঠিকানা হাজিগঞ্জ, ওয়াবদা পুল, ফতুল্লা, নারায়ণগঞ্জ। তিনি ট্যুরস অ্যান্ড ট্রাভেলসের ব্যবসা করেন এবং বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী যুবদলের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত। সেই সুবাদে শেখ হাসিনার সরকারের বিরুদ্ধে আন্দোলনে অংশ নেন। ২০২৪ সালে কোটাবিরোধী আন্দোলন শুরু হওয়ার পর ১২ জুলাই থেকে তিনি আন্দোলনে যোগ দেন। ১৬ জুলাই রংপুরে আবু সাঈদ হত্যার পর নারায়ণগঞ্জে আন্দোলন তীব্র আকার ধারণ করে। তিনি বলেন, ১৯ জুলাই সহযোদ্ধাদের নিয়ে নারায়ণগঞ্জ লিংক রোডের জালকুড়ি এলাকায় অবস্থান করছিলেন। বেলা আনুমানিক ৩টার দিকে তৎকালীন নারায়ণগঞ্জের এমপি শামীম ওসমান, তার ছেলে অয়ন ওসমান, ভাতিজা আজমেরী ওসমানসহ প্রায় ১০০ জন সশস্ত্র আওয়ামী ক্যাডার তাদের ওপর আক্রমণ চালায়। এ সময় অনেকের সঙ্গে তার নিজের শরীরেও রাবার বুলেট বিদ্ধ হয়। তার পাশে থাকা আদিল ও ইয়াসিন নামে দুজন গুলিবিদ্ধ হয়ে ঘটনাস্থলেই মারা যান। তার দাবি, গুলি শামীম ওসমানের লোকজনই চালিয়েছিল। পরে সঙ্গীরা তাকে একজন প্রাইভেট চিকিৎসকের কাছে নিয়ে প্রাথমিক চিকিৎসা করান। ২০ জুলাই বিশ্রামে থেকে ২১ জুলাই আবার আন্দোলনে অংশ নেন।
জবানবন্দিতে মামুন আরও বলেন, ২১ জুলাই আনুমানিক বেলা ১১টা থেকে সাড়ে ১১টার দিকে সাইনবোর্ড থেকে চিটাগাং রোডের দিকে যাওয়ার সময় মা হাসপাতালের সামনে অবস্থানকালে বাজারের গলি থেকে শামীম ওসমান, শাহ নিজাম, ফাইজুল ইসলাম, কমিশনার রুহুলসহ প্রায় দেড়শ জন তাদের ওপর অতর্কিত হামলা চালায়। হামলার সময় তাদের প্রত্যেকের হাতে দেশি-বিদেশি অস্ত্র ছিল। হামলা থেকে বাঁচতে দৌড়ে পালানোর সময় তিনি ডিএনডি খালে পড়ে যান এবং তার ওপরের মাড়ির একটি দাঁত ভেঙে যায়। তিনি বলেন, ৫ আগস্ট সকাল থেকেই তারা খণ্ড খণ্ড মিছিল করছিলেন। দুপুর আনুমানিক দেড়টার দিকে শামীম ওসমানের নেতৃত্বে তার ছেলে অয়ন ওসমান, ভাতিজা আজমেরী ওসমান, শাহ নিজাম, ফাইজুল ইসলাম, ছাত্রলীগ নেতা টিপু সুলতান, রিয়াদ, শুভ, শুভ্র, সাংবাদিক রাজু, কমিশার ডিস বাবু, কেন্দ্রীয় ওলামা লীগের নেতা আনোয়ার, ছাত্রলীগ নেতা ভিকি, রুহুল কমিশনার, শামীম ওসমানের শ্যালক টিটুসহ প্রায় ১০০ থেকে ১৫০ জন সশস্ত্র অবস্থায় চাষাড়া মোড়ে তাদের ওপর হামলা চালায়। আওয়ামী লীগের ধাওয়ায় তারা ল্যাব এইড হাসপাতালের গলিতে আশ্রয় নেন। সেখানে তিনি দেখতে পান, অয়ন ওসমানের গুলিতে তার পাশে থাকা স্বজন নামে এক যুবক আহত হন। পরে তিনি সুজন, তুহিনসহ আরও কয়েকজন মিলে স্বজনকে সমবায় মার্কেটের নিচে নিয়ে যান, পানি পান করান এবং একটি রিকশায় করে নারায়ণগঞ্জ ভিক্টোরিয়া হাসপাতালে নিয়ে যান। তার দাবি, আন্দোলনে আহতদের চিকিৎসা না দেওয়ার জন্য পূর্ব থেকেই শামীম ওসমানের নির্দেশনা থাকায় হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ স্বজনকে চিকিৎসা দেয়নি। পরে স্বজনের বড় ভাই এলে তাকে ঢাকায় নিয়ে যাওয়ার পরামর্শ দিয়ে স্বজনকে তার কাছে বুঝিয়ে দেন।
মামুন জানান, ৬ আগস্ট বিজয় উদযাপনের সময় তিনি জানতে পারেন, আগের দিন আহত হওয়া স্বজন মারা গেছেন। এ ঘটনায় তিনি শোক প্রকাশ করে স্বজন হত্যার সঙ্গে জড়িতদের বিচার দাবি করেন।
প্রথম অভিযোগে ২০২৪ সালের ১৯ জুলাই নারায়ণগঞ্জ সদর উপজেলার চাষাঢ়া, ফতুল্লা থানাধীন সাইনবোর্ডসহ আশপাশের এলাকায় কিশোর আদিল, ইয়াছিন, শিক্ষার্থী পারভেজ, পোশাককর্মী রাসেল, ছয় বছরের শিশু রিয়াসহ ছয়জনকে হত্যা করা হয়। দ্বিতীয় অভিযোগ অনুযায়ী ২১ জুলাই ফতুল্লা থানাধীন ভূইগড় বাসস্ট্যান্ডের সামনে আবদুর রহমান ও মোহাম্মদ রাকিবকে হত্যা করা হয়। এছাড়া তৃতীয় অভিযোগে ৫ আগস্ট বদিউজ্জামান ও আবুল হাসানকে হত্যার কথা উল্লেখ করা হয়।
মামলার বিবরণ অনুযায়ী, চলতি বছরের ১৯ জানুয়ারি প্রসিকিউশনের দাখিলকৃত ফরমাল চার্জ বা আনুষ্ঠানিক অভিযোগ আমলে নেন ট্রাইব্যুনাল।
প্রথম অভিযোগে ২০২৪ সালের ১৯ জুলাই নারায়ণগঞ্জ সদর উপজেলার চাষাঢ়া, ফতুল্লা থানাধীন সাইনবোর্ডসহ আশপাশের এলাকায় কিশোর আদিল, ইয়াছিন, শিক্ষার্থী পারভেজ, পোশাককর্মী রাসেল, ছয় বছরের শিশু রিয়াসহ ছয়জনকে হত্যা করা হয়।
দ্বিতীয় অভিযোগ অনুযায়ী ২১ জুলাই ফতুল্লা থানাধীন ভূইগড় বাসস্ট্যান্ডের সামনে আবদুর রহমান ও মোহাম্মদ রাকিবকে হত্যা করা হয়।
এছাড়া তৃতীয় অভিযোগে ৫ আগস্ট বদিউজ্জামান ও আবুল হাসানকে হত্যার কথা উল্লেখ করা হয়। তবে পলাতক থাকায় আসামিদের অনুপস্থিতিতেই চলছে বিচারকাজ। তাদের পক্ষে সরকারি খরচে তিন আইনজীবী নিয়োগ দেওয়া হয়।