ট্রাম্পের ‘ডান হাত’ কে এই নাটালি?

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠ হিসেবে নিজের জায়গা করে নিয়েছেন নাটালি হার্প। সাম্প্রতিক সময়ে নাটালি হার্পের মতো অন্য কেউ হোয়াইট হাউসে এতটা জায়গা করে নিতে পারেননি।

আজ বৃহস্পতিবার (২০ আগস্ট) বিবিসির এক প্রতিবেদনে বলা হয়, ডোনাল্ড ট্রাম্পের বিশ্বস্ত হিসেবে জায়গা করে নেওয়া ৩৫ বছর বয়সি নাটালি হার্প এতটাই বিশ্বস্ত যে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বের পাশাপাশি তিনি ডোনাল্ড ট্রাম্পের ট্রুথ সোশ্যাল পোস্ট লেখার কাজও করেন।

নাটালি হার্প নতুন করে ফের আলোচনায় এসেছেন মূলত ডেমোক্র্যাটিক দলের সিনেটর জন অসফের একটি মন্তব্যকে কেন্দ্র করে। চলতি সপ্তাহে ডেমোক্র্যাটিক দলের সিনেটর জন অসফ প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে নিয়ে একটি বক্তব্য দেন। সেখানে তিনি নাটালির নামও উল্লেখ করেন।

কাতারের আমিরের দেওয়া উপহার, অরক্ষিত উড়ন্ত প্রাসাদে নাটালির সঙ্গে ট্রাম্পের ভ্রমণের সমালোচনা করেন জন অসফ। মূলত গত জুলাইয়ে ইরানের হুমকির কারণে প্রেসিডেন্ট যখন একটি ছোট উড়োজাহাজে চড়ে গোপনে তুরস্ক ত্যাগ করেন, তখন খুব ছোট একদল সহযোগীর সঙ্গে নাটালিও যুক্ত ছিলেন।

নাটালি হার্পকে কেউ  ট্রাম্পের ‘তথ্য ও যোগাযোগের নিয়ন্ত্রক’ হিসেবে দেখেন, আবার কেউ মনে করেন তিনি ট্রাম্পের ‘মানসিক ভরসার আশ্রয়’। যদিও জন অসফেরর মন্তব্য হোয়াইট হাউসে তীব্র ক্ষোভের জন্ম দিয়েছে। 

ক্যালিফোর্নিয়ায় জন্ম নেওয়া এবং রক্ষণশীল খ্রিস্টান পরিবারে বেড়ে ওঠা হার্প অনেকটা নাটকীয়ভাবেই হোয়াইট হাউসে প্রবেশ করেন। ট্রাম্প তাঁর জীবন বাঁচিয়েছেন—এমন দাবি করে তিনি প্রথমে ব্যাপক পরিচিতি লাভ করেন।

ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদে কিছু রোগীকে পরীক্ষামূলক চিকিৎসা দেওয়ার সুযোগ বাড়ানো হয়। হার্প তাঁর হাড়ের ক্যানসারের চিকিৎসা নেন। এই অভিজ্ঞতার কথা প্রচার করে তিনি ট্রাম্পের ‘মেইক আমেরিকা গ্রেট অ্যাগেইন’ স্লোগানে রিপাবলিকান পার্টিতে জনপ্রিয়তা পান। পরে তিনি ২০২০ সালের ট্রাম্পের পুনর্নির্বাচনে প্রচারণার একটি উপদেষ্টা বোর্ডে নিয়োগ পান।

২০২০ সালের রিপাবলিকান ন্যাশনাল কনভেনশনে নাটালি হার্প বলেছিলেন, বাজারে থাকা কেমোথেরাপির চিকিৎসাগুলো যখন আমার ক্ষেত্রে ব্যর্থ হলো, তখন কোনো ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালেই আমাকে নিতে চায়নি। মি. প্রেসিডেন্ট আপনি নিয়েছিলেন। আর আপনি না থাকলে, সেগুলো অনুমোদনের অপেক্ষায় থাকতে থাকতে আমি মারা যেতাম।

অনুষ্ঠানের পর ট্রাম্প বলেছিলেন, আমি যাদের দেখেছি, তাদের মধ্যে খুব কম মানুষই টেলিভিশনের পর্দায় তার মতো উজ্জ্বল হয়ে উঠতে পেরেছে।

এরপর একজন কট্টর ট্রাম্প সমর্থক ও প্রচারক হিসেবে পরিচিতি পান নাটালি হার্প। তিনি ২০২০ সালের নির্বাচনে ট্রাম্পের জয়ের প্রচার করেন। ২০২২ সালে তিনি ট্রাম্পের পরবর্তী প্রেসিডেন্ট নির্বাচনি প্রচারণায় যোগ দেন।

নাটালি হার্পের ভাই প্রেস্টন হার্প মঙ্গলবার (১৮ আগস্ট) সিএনএনকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বলেন, আমার মা আমাদের যেসব বিষয়কে সম্মান করতে শিখিয়েছেন, ট্রাম্প তার প্রায় সবকিছুরই প্রতীক। তাই সত্যি বলতে, ট্রাম্পের প্রতি তার এই মুগ্ধতার কারণ সম্ভবত এটাই। ছোটবেলা থেকেই হার্প হোয়াইট হাউস নিয়ে খুব আগ্রহী ছিলেন এবং ইরাক যুদ্ধের সময় জর্জ ডব্লিউ. বুশসহ আগের কয়েকজন প্রেসিডেন্টকে চিঠিও লিখেছিলেন। হোয়াইট হাউসে কাজ করার সুযোগ পাওয়া তাঁর বোনের “স্বপ্ন অবশেষে সত্যি হওয়ার মতো” ছিল। তিনি আরও বলেন, তাঁর বোন ট্রাম্পের সবচেয়ে বড় ভক্ত—সম্ভবত এ কারণেই ট্রাম্প তাকে পছন্দ করেন।

প্রেস্টন হার্প বলেন, সে দেখতে সুন্দর, তার ব্যক্তিত্বও ভালো। সে মনে করে ট্রাম্প তার জীবন বাঁচিয়েছেন। তাই এমন কৃতজ্ঞতা নিয়ে বেঁচে থাকা একজন মানুষ পাশে থাকলে নিশ্চয়ই ভালোই লাগে।

হোয়াইট হাউসে হার্পের আনুষ্ঠানিক পদ হলো ‘এক্সিকিউটিভ অ্যাসিস্ট্যান্ট টু দ্য প্রেসিডেন্ট’। সাধারণত এটি তুলনামূলকভাবে নিম্নস্তরের একটি পদ। দায়িত্বের মধ্যে থাকে বিভিন্ন কাজের সমন্বয়, সময়সূচি, যোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ ও দাপ্তরিক কাজ।

তবে বিভিন্ন সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, হার্প এই পদটির অর্থই যেন নতুনভাবে সংজ্ঞায়িত করেছেন। ট্রাম্পের প্রথম প্রশাসনের একই পদে থাকা ম্যাডেলিন ওয়েস্টারহাউটের তুলনায় তাঁর পরিচিতি ও প্রভাব অনেক বেশি।

এই সপ্তাহের শুরুতে সিএনএনের এক সাংবাদিক ট্রাম্পকে অসফের মন্তব্য সম্পর্কে প্রশ্ন করলে হোয়াইট হাউস পরে তাদের অফিসিয়াল এক্স অ্যাকাউন্টে ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া জানায়। সেখানে সাংবাদিক ক্রিস্টেন হোমসকে উদ্দেশ্য করে বলা হয়, একদিন আপনার সন্তানরা আপনার এই ঘৃণ্য ও অমানবিক প্রশ্নের কথা জানতে পারবে। তারা একজন মা-বাবা হিসেবে আপনার এমন নির্মম ও প্রতিহিংসাপরায়ণ আচরণে অসুস্থ বোধ করবে এবং বিব্রত হবে।

ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদে একজন কর্মী হিসেবে হার্পের উপস্থিতি প্রায় সর্বক্ষণই চোখে পড়ে। হোয়াইট হাউসের সাংবাদিকরা প্রায়ই তাঁকে ওভাল অফিসে ট্রাম্পের মাত্র কয়েক ফুট দূরে দাঁড়িয়ে থাকতে অথবা ট্রাম্পের বিভিন্ন অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক সফরে ‘এয়ার ফোর্স ওয়ানে’ উঠতে দেখেন।

হোয়াইট হাউসের ঘনিষ্ঠ একজন সূত্র বিবিসিকে বলেন, সে সবসময় ডোনাল্ড ট্রাম্পের আশেপাশেই থাকে।

হোয়াইট হাউসের অভ্যন্তরীণ কর্মকর্তা ও সাংবাদিকদের মধ্যে তাকে প্রায়ই ‘মানব প্রিন্টার’ বলা হয়। কারণ তাঁকে প্রায়ই একটি বহনযোগ্য প্রিন্টার নিয়ে ঘুরতে দেখা যায়, যাতে ট্রাম্পের পছন্দের বিভিন্ন নিবন্ধ ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের পোস্টের কাগজের কপি তাঁকে দেওয়া যায়।

বাস্তবে এর অর্থ হলো, ট্রাম্প কী ধরনের তথ্য বা আপডেট দেখতে পাচ্ছেন, তা নিয়ন্ত্রণ করার ক্ষেত্রে হার্পের অস্বাভাবিক মাত্রায় প্রভাব রয়েছে।

অসফের মন্তব্যের পর ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়া একটি ছবিতে দেখা যায়, ২০২৪ সালে কমালা হ্যারিসের একটি বক্তব্য দেখার সময় ট্রাম্প তাঁকে নির্দেশনা দিচ্ছেন এবং হার্প ট্রাম্পের নিজস্ব লেখার ধরন অনুসরণ করে একটি পোস্ট টাইপ করছেন।

হার্পকে নিয়ে সাম্প্রতিক আলোচনার মধ্যে হোয়াইট হাউস তাঁকে দলের একজন “বিশ্বস্ত ও মূল্যবান” সদস্য হিসেবে বর্ণনা করেছে। তবে ট্রাম্প ক্যামেরার সামনে তাঁর সম্পর্কে খুব কমই কথা বলেছেন।

২০২৪ সালে নিউইয়র্ক টাইমসের জন্য রিপোর্ট করার সময় সাংবাদিক হ্যাবারম্যান ও সোয়ান দাবি করেছিলেন যে, হার্প নাকি ট্রাম্পকে লেখা একটি চিঠিতে লিখেছিলেন, আপনিই আমার কাছে সবকিছু।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *