টি-টোয়েন্টিটা এভাবেই খেলতে হয়

জিততে হলে রেকর্ড গড়তে হতো। শুরুর আগেই চাপে বাংলাদেশ। নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে এর আগে টি-টোয়েন্টিতে সর্বোচ্চ ১৩৫ রান তাড়া করে জিতেছিল বাংলাদেশ। আজকের লক্ষ্যটা ১৮৩। ৪৮ রান বেশি। টপ অর্ডার চেষ্টা করেছে ভালো শুরু এনে দিতে। সাইফ হাসান ও তানজিদ হাসান ক্রিজে ছিলেন ৫.৩ ওভার। ৩৩ বলে রান তোলেন ৪১।

শুরু হিসেবে মন্দ নয়। তবে যেখানে ওভার প্রতি ৯ এর বেশি রানরেট দরকার, সেখানে প্রায় ৬ ওভার পরও ওভার প্রতি ৮ এর কম রান তোলা শঙ্কা জাগায়। সেই শঙ্কা থেকেই কি না, সাজঘরে ফিরলেন সাইফ-তামিম। বাড়ল দলের বিপদ।

টপ অর্ডারের ব্যর্থতা বাংলাদেশে নতুন কিছু নয়। কিন্তু, নিয়মিত ঘটনার বাইরে মিডল অর্ডার দাঁড়িয়ে গেল। এমনভাবে দাঁড়াল, এক মুহূর্তের জন্য দলটিকে বাংলাদেশ মনে হয়নি। স্বভাবজাত বাংলাদেশ যে এভাবে খেলে অভ্যস্ত নয়।

তাওহিদ হৃদয়, পারভেজ হোসেন ইমন ও শামীম হোসেন পাটোয়ারী মিলে কী এমন করলেন? বাংলাদেশ ১৮৩ রান তুলে ফেলেছে গোটা ২ ওভার ও ৬ উইকেট অক্ষত রেখে। হৃদয় ২৭ বলে অপরাজিত ৫১, শামীম ১৩ বলে অপরাজিত ৩১ এবং ইমন ১৪ বলে ২৮। পারফেক্ট টি-টোয়েন্টি যাকে বলে। সময়ের প্রয়োজন মেটাতে সাহসী ক্রিকেট খেলতে হয়, টি-টোয়েন্টিতে যা আরও বেশি। তারা সেটিই করে দেখালেন।

আরও আছে! আজ সোমবার (২৭ এপ্রিল) চট্টগ্রামের বীরশ্রেষ্ঠ শহীদ ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট মতিউর রহমান স্টেডিয়ামে দর্শক দেখেছে খেলার প্রতি ক্রিকেটারদের অনুরাগ। বাংলাদেশ দলের এই প্রজন্মের খেলোয়াড়দের কাছে যা দেখা যায় না বলেই অভিযোগ।

শামীম পাটোয়ারী মাত্রই ক্রিজেই এসেছেন। সিঙ্গেল নিয়ে হৃদয়কে স্ট্রাইক দিয়েছেন। ১৬তম ওভারের দ্বিতীয় বলে নাথান স্মিথকে লং অনে ঠেলে দুই রানের জন্য দৌড়ালেন হৃদয়-শামীম। কিউই ফিল্ডার বলটা লুফে নিয়েই মারলেন, শামীম তখনও দাগ থেকে দূরে। শেষ সেকেন্ডে দুরন্ত এক ডাইভ দিলেন, উইকেট বেঁচে গেল। অন্য সময় অন্য ক্রিকেটার হলে, রানআউটই ভবিতব্য ছিল। আজ হয়নি। ম্যাচের মোমেন্টাম ঘুরে গেছে তখনই।

শামীম এরপর বেধড়ক পিটিয়েছেন কিউই বোলারদের। ১৩ বলের ইনিংসে একটি মাত্র ডটবল দিয়েছেন। ১৩ বলের ক্যামিওতে ৩টি চার ও ২টি ছক্কায় অপরাজিত ৩১ রান করেন শামীম। স্ট্রাইক রেট ২৩৮. ৪৬। ওই একটি ডাইভে আত্মবিশ্বাস পেয়েছেন। জ্বালানী হয়ে রসদ জুগিয়েছে পরের সময়টুকু।

ইমনও খেলেছেন সবটুকু নিংড়ে। অধিনায়ক লিটন দাসের বিদায়ের পর খানিকটা ব্যাকফুটে যায় দল। দলকে কক্ষপথে ফেরাতে সাহায্য করেন ইমন। ১৪ বলে ২০০ স্ট্রাইক রেটে ২৮ রান করেন। চার একটি, ছক্কা দুটি। ডটবল মোটে একটি।

হৃদয় আরেক কাঠি সরেস। ২৭ বলে ৫১ রানের ইনিংসে চার ছিল ২টি, ছক্কা ৩টি। ১৮৮. ৮৯ স্ট্রাইক রেটের ইনিংসে ডটবল মাত্র দুটি। নিজের শেষ ৫ রান নিয়েছেন সিঙ্গেলসে। ঠাণ্ডা মাথায় ফিনিশিং দিয়েছেন।

১৭তম ওভার শেষে বাংলাদেশের জয়ের জন্য প্রয়োজন ছিল ৫ রান। ৩ ওভার ও ৬ উইকেট তখনও হাতে। বড় শট খেলার বিলাসিতা করতে পারতেন ক্রিজে থাকা হৃদয়-শামীম। অতীত বলছে, এসব মুহূর্তে উত্তেজিত হয়ে শট খেলতে গিয়ে কেবল উইকেট নয়, বাংলাদেশের ম্যাচ ছেড়ে দেওয়ার নজির আছে ভুরিভুরি। তারা সেদিকে হাঁটলেন না।

সাগরিকার পাড়ে ভিন্ন এক বাংলাদেশের দেখা মিলল। ১৭তম ওভারে ২৫ রান নেওয়ার পরের ওভারে ৫টি সিঙ্গেল নিলেন দুজন। মাঝে ইনিংসে নিজের একমাত্র ডটবল খেললেন শামীম।

কিউই বোলার বেন লিস্টার নিশ্চয়ই ভাবছিলেন, এরা করছেটা কী? কিন্তু, স্রোতে না ভেসে মোমেন্টাম বুঝে তারা এগিয়েছেন। ম্যাচ তো বটে, মনস্ত্বাত্তিক লড়াইয়েও হেরেছে প্রতিপক্ষ।

সংবাদ সম্মেলনে হৃদয় বলেছেন, ‘এটা যেহেতু একটা টিম গেম, রেগুলার সবাই ভালো করে না, এটাই স্বাভাবিক। তারপরও আমরা ভালোভাবে শেষ করেছি।’

টি-টোয়েন্টিটা আসলে এভাবে খেলতে হয়। দলের প্রয়োজনে, সময়ের প্রয়োজনে। জানতে হয় কখন ঝড়ের গতিতে ছুটতে হবে, কখন শান্ত নদীর মতো ধীরে বইতে হবে। তবেই না জেতা যায়। সব জয়ই আনন্দ এনে দেয়। কিছু জয় এনে দেয় বিশ্বাস, এভাবেও জেতা যায়।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *