জানুয়ারিতে নতুন বেতন, বৃহস্পতিবার কাজে ফেরার প্রত্যাশা মালিক-শ্রমিক ও সরকারের

দ্রুততম সময়ে মজুরি বোর্ডের বৈঠক এবং জানুয়ারি থেকে নতুন বেতন-ভাতা কার্যকরের ঘোষণার পর বৃহস্পতিবার থেকে পোশাকশ্রমিকেরা কাজে ফিরবেন বলে আশা প্রকাশ করেছেন মালিক, শ্রমিক ও সরকারের প্রতিনিধিরা। আন্দোলনরত শ্রমিকদের কারখানা বন্ধ না করে কাজে ফেরার আহ্বান জানিয়েছেন তারা। তাদের প্রত্যাশা, দেশের ইতিহাসে সবচেয়ে কম সময়ে মজুরি বোর্ড নতুন বেতন কাঠামোর সুপারিশ করবে। এদিকে, আন্দোলনে নিহত শ্রমিকের পরিবারকে আর্থিক সহায়তা এবং হত্যাকাণ্ডে জড়িত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস দিয়েছেন শ্রমমন্ত্রী। অন্যদিকে, কোনো ধরনের উসকানিতে পা না দিতে শ্রমিকদের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা মাহদী আমিন।

বুধবার (৪ নভেম্বর) সচিবালয়ে শ্রমিক, মালিকপক্ষ ও সরকারের প্রতিনিধিদের অংশগ্রহণে ত্রিপক্ষীয় বৈঠক শেষে আয়োজিত ব্রিফিংয়ে এসব কথা বলেন তারা।

ব্রিফিংয়ে শ্রমিকনেত্রী নাজমা আখতার বলেন, দেশের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো মজুরি বোর্ড গঠনের মাত্র তিন দিনের মাথায় বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে। এর আগে তিন মাসেও এমন বৈঠক হয়নি। ডিসেম্বরের মধ্যে মজুরি বোর্ড সুপারিশ দেবে এবং জানুয়ারি থেকে নতুন বেতন-ভাতা কার্যকর হবে। তাই শিল্প টিকিয়ে রাখতে শ্রমিকদের কাজে ফেরার আহ্বান জানান তিনি। একই সঙ্গে কোনো রাজনৈতিক ফাঁদে না পড়ার বিষয়েও শ্রমিকদের সতর্ক করেন।

শ্রমিকনেতা মন্টু ঘোষও কারখানার পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে উৎপাদন কার্যক্রম চালু রাখার আহ্বান জানান। তিনি বলেন, পরিস্থিতি বুঝে কারখানা চালু রাখতে হবে। কারখানা ধ্বংস হোক— এমন আন্দোলন কেউ কামনা করেন না।

শ্রমিকনেত্রী মোশারেফা মিশু বলেন, মজুরি বোর্ডের বৈঠকে অল্প সময়ের মধ্যে নতুন মজুরির সুপারিশ এবং জানুয়ারি থেকে তা বাস্তবায়নের বিষয়ে আলোচনা হয়েছে।

বিজিএমইএর সভাপতি মাহমুদুল হাসান বলেন, প্রথম বৈঠকেই নতুন মজুরি সুপারিশের সময়সীমা নির্ধারণের সিদ্ধান্ত নিয়েছে মজুরি বোর্ড। বোর্ডকে স্বাধীনভাবে ও স্থিরভাবে কাজ করার সুযোগ দিতে হবে। তা হলে দ্রুত নতুন মজুরি কার্যকর করা সহজ হবে। বিজিএমইএ শ্রমিকদের পক্ষে রয়েছে বলেও জানান তিনি।

বিকেএমইএর সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম বলেন, শ্রমিকদের দাবির বিষয়ে বিকেএমইএ ও বিজিএমইএ একমত। মজুরি বোর্ড দ্রুত সুপারিশ করলে মালিকপক্ষও তা দ্রুত বাস্তবায়ন করবে। তবে মজুরি বাড়ার পর যেন পোশাকশ্রমিকদের বাড়িভাড়া বেড়ে না যায়, সে বিষয়ে সরকারকে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানান তিনি। শ্রমিকদের কাজে ফেরার অনুরোধ জানিয়ে হাতেম বলেন, মালিকপক্ষ শ্রমিকদের পাশে রয়েছে।

প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা মাহদী আমিন বলেন, মজুরি বোর্ড নির্মোহভাবে কাজ করে ডিসেম্বরের মধ্যে একটি যৌক্তিক বেতন কাঠামোর সুপারিশ করবে। শ্রমিক, মালিক ও সরকার একসঙ্গে কাজ করলে পোশাক খাতকে আরও এগিয়ে নেওয়া সম্ভব। বৃহস্পতিবার থেকে সব শ্রমিক কাজে ফিরবেন বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি। এ সময় আন্দোলনে বাইরে থেকে উসকানি দেওয়া হচ্ছে বলেও অভিযোগ করেন তিনি। শ্রমিকদের কোনো ধরনের উসকানিতে জড়িত না হওয়ার আহ্বান জানান মাহদী আমিন।

ব্রিফিংয়ে শ্রমমন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী শ্রমিক আন্দোলনের মধ্যে নিহত এক শ্রমিকের প্রতি শোক প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, নিহত শ্রমিকের আত্মার মাগফেরাত কামনা করছেন তারা। প্রধানমন্ত্রী ও শ্রম মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে তার পরিবারকে এক লাখ টাকা দেওয়া হয়েছে। হত্যাকাণ্ডে জড়িত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলেও জানান তিনি।

শ্রমমন্ত্রী আরও বলেন, প্রধানমন্ত্রী শ্রমিকবান্ধব। শ্রমিকদের চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করতে গাজীপুরে ১০০ শয্যার একটি হাসপাতাল নির্মাণের সিদ্ধান্ত দিয়েছেন তিনি। এক সপ্তাহের মধ্যে হাসপাতাল নির্মাণের প্রক্রিয়া শুরু হবে।

পোশাক খাতকে অস্থিতিশীল করে এ শিল্প অন্য দেশে সরিয়ে নেওয়ার চেষ্টা চলছে বলে অভিযোগ করেন শ্রমমন্ত্রী। তার দাবি, এ উদ্দেশ্যে কিছু ব্যক্তি সহিংসতা করছে। বিভিন্ন ঘটনার ভিডিও ফুটেজ পর্যালোচনা করে জড়িত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলেও জানান তিনি।

শ্রমিকদের উদ্দেশে শ্রমমন্ত্রী বলেন, মজুরি নিয়ে আলোচনার জন্য মজুরি বোর্ড রয়েছে। কোনো ধরনের আলোচনা ছাড়াই রাস্তায় নেমে যাওয়ার সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। শ্রমিক নেতাদের নিজ নিজ কারখানায় গিয়ে শ্রমিকদের কাজে ফেরাতে বোঝানোর আহ্বান জানান তিনি। একই সঙ্গে যেসব মালিক কারখানায় ছুটি ঘোষণা করছেন, তাদেরও শ্রমিকদের কাজে ফেরানোর বিষয়ে উদ্যোগ নিতে বলেন।

বৃহস্পতিবার থেকে সবাই মিলে নতুন করে কাজ শুরু করার প্রত্যাশা ব্যক্ত করে, শ্রমিক, মালিক ও সংশ্লিষ্ট সবাইকে কারখানার উৎপাদন কার্যক্রম সচল রাখার আহ্বান জানান আরিফুল হক চৌধুরী।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *