শাহী আল সাদাত
বাংলাদেশে শিশু ও কিশোরদের বিরুদ্ধে যৌন সহিংসতা, মানবপাচার, অনলাইন শোষণ এবং সাইবার হয়রানির মতো অপরাধ দিন দিন জটিল রূপ নিচ্ছে। প্রযুক্তির বিস্তারের সঙ্গে সঙ্গে নতুন ধরনের ঝুঁকিও যুক্ত হচ্ছে, যেখানে একটি ভুল সিদ্ধান্ত একটি শিশুর পুরো ভবিষ্যৎ বদলে দিতে পারে। এই বাস্তবতায় প্রচলিত সচেতনতামূলক কার্যক্রমের বাইরে গিয়ে প্রযুক্তিনির্ভর, দ্রুত প্রতিক্রিয়াশীল এবং তরুণদের নেতৃত্বাধীন একটি সুরক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তোলার চেষ্টা করছেন সেন্ট যোসেফ উচ্চ মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের ১৭ বছর বয়সী শিক্ষার্থী শাহী আল সাদাত।
তার প্রতিষ্ঠিত Teen-X এখন বাংলাদেশের অন্যতম আলোচিত যুব-নেতৃত্বাধীন শিশু ও কিশোর সুরক্ষা উদ্যোগ হিসেবে পরিচিত, যা প্রযুক্তি, সচেতনতা, শিক্ষা এবং প্রাথমিক সহায়তা ব্যবস্থাকে একত্রিত করে শিশু সুরক্ষার একটি নতুন মডেল তৈরি করেছে।
২০২১ সালের ২ জুন যাত্রা শুরু করা Teen-X-এর মূল লক্ষ্য ছিল এমন একটি প্ল্যাটফর্ম তৈরি করা, যেখানে কিশোর-কিশোরীরা শুধু সমস্যার কথা বলবে না, বরং প্রয়োজনীয় দিকনির্দেশনা, সহায়তা এবং নিরাপত্তার পথও খুঁজে পাবে। চার বছরেরও বেশি সময়ে প্ল্যাটফর্মটি দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে স্কুলভিত্তিক কর্মসূচি, সচেতনতামূলক ক্যাম্পেইন এবং কমিউনিটি উদ্যোগ পরিচালনা করেছে।
Teen-X-এর কর্মসূচিতে গুরুত্ব পেয়েছে সাইবার নিরাপত্তা, অনলাইন শোষণ প্রতিরোধ, ডিজিটাল নিরাপত্তা, মানসিক স্বাস্থ্য সচেতনতা, যৌন হয়রানি প্রতিরোধ, আইনগত অধিকার এবং সহিংসতা প্রতিরোধের মতো বিষয়। এসব কার্যক্রমের মাধ্যমে হাজারো শিক্ষার্থীর কাছে নিরাপদ ডিজিটাল জীবন, আইনি সচেতনতা এবং সংকট মোকাবিলার বাস্তবধর্মী ধারণা পৌঁছে দেওয়া হয়েছে।
শুধু সচেতনতা তৈরিই নয়, Teen-X অভিযোগ জানাতে উৎসাহিত করা, ভুক্তভোগীদের জন্য সহায়তার পথ তৈরি এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে সমন্বয়ের মাধ্যমেও কাজ করছে। সংগঠনটির তথ্য অনুযায়ী, তাদের কার্যক্রম বিভিন্ন ঘটনায় রিপোর্টিং ও আইনি পদক্ষেপ গ্রহণে সহায়ক ভূমিকা পালন করেছে। এর মধ্যে ধর্ষণ-সংক্রান্ত মামলায় সাতজন অভিযুক্ত ব্যক্তির গ্রেপ্তারের ঘটনাও উল্লেখযোগ্য, যা শিশু সুরক্ষায় সামাজিক অংশগ্রহণের গুরুত্বকে নতুনভাবে তুলে ধরে।
বিশ্লেষকদের মতে, বাংলাদেশের শিশু সুরক্ষা খাতে তরুণদের নেতৃত্বে প্রযুক্তিনির্ভর এমন উদ্যোগ এখনো তুলনামূলকভাবে বিরল। Teen-X সেই শূন্যস্থান পূরণের চেষ্টা করছে এমন একটি কাঠামোর মাধ্যমে, যেখানে সচেতনতা, প্রতিরোধ, সহায়তা এবং প্রযুক্তি একই প্ল্যাটফর্মে যুক্ত হয়েছে।
শাহী আল সাদাতের এই উদ্যোগ ইতোমধ্যে দেশীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বিভিন্ন স্বীকৃতি অর্জন করেছে। প্রযুক্তিনির্ভর সামাজিক উদ্ভাবন ও যুব ক্ষমতায়নের জন্য তিনি ২০২৪ সালে National Tech Award লাভ করেন। একই বছর তিনি International Children’s Peace Prize 2024-এর জন্য মনোনীত হন।
২০২৫ সালে শিশু সুরক্ষা, ডিজিটাল নিরাপত্তা ও সামাজিক উদ্ভাবনে অবদানের জন্য তিনি PBIF International Business Award, 71 Media Iconic Award, Star Bangladesh Award, South Asian Excellence Award এবং Global Excellence Award অর্জন করেন।
এর ধারাবাহিকতায় ২০২৬ সালে তিনি Global Iconic Award-এ ভূষিত হন। একই বছরে তার নেতৃত্বে Team Teen-X উদ্ভাবন ও নেতৃত্বের স্বীকৃতি হিসেবে WICE 2026 National Round Bangladesh-এ গোল্ড মেডেল অর্জন করে।
শাহী আল সাদাত বলেন, “আমাদের লক্ষ্য শুধু অপরাধের বিরুদ্ধে সচেতনতা তৈরি করা নয়; বরং এমন একটি বাংলাদেশ গড়ে তোলা, যেখানে প্রতিটি কিশোর-কিশোরী ভয়, শোষণ ও সহিংসতা থেকে মুক্ত থেকে নিজের সম্ভাবনাকে বিকশিত করতে পারবে।”
শিশু সুরক্ষা বিশেষজ্ঞদের মতে, বাংলাদেশে ডিজিটাল ঝুঁকি ও শিশু নির্যাতনের ধরন দ্রুত পরিবর্তিত হচ্ছে। এই প্রেক্ষাপটে Teen-X-এর মতো প্রযুক্তিনির্ভর, যুব-নেতৃত্বাধীন উদ্যোগ ভবিষ্যতের শিশু সুরক্ষা ব্যবস্থায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। সচেতনতা, প্রযুক্তি, কমিউনিটি সম্পৃক্ততা এবং দ্রুত সহায়তা ব্যবস্থার সমন্বয়ে Teen-X যে মডেল তৈরি করছে, তা দেশের শিশু ও কিশোর সুরক্ষায় একটি নতুন অধ্যায়ের সূচনা হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
sn/sks