এক চিঠি, দুই দাবি-আইসিসিতে কী লিখেছিলেন বুলবুল?

বাংলাদেশ ক্রিকেটে ক্ষমতার পালাবদল নতুন কোনো ঘটনা নয়! কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের (বিসিবি) নেতৃত্ব পরিবর্তনকে ঘিরে যে নাটকীয়তা তৈরি হয়েছে, তার নতুন অধ্যায় এখনও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে। সাবেক বিসিবি সভাপতি ও জাতীয় দলের এক সময়ের অধিনায়ক আমিনুল ইসলাম বুলবুলকে ঘিরে তৈরি হয়েছে এমন এক বিতর্ক, যেখানে প্রশ্ন উঠেছে-তিনি কি নিজের হারানো অবস্থান ফিরে পাওয়ার লড়াই করছেন, নাকি সেই লড়াইয়ে বাংলাদেশের ক্রিকেটকেই অনিশ্চয়তার মুখে ঠেলে দিচ্ছেন?

বিতর্কের কেন্দ্রে রয়েছে আন্তর্জাতিক ক্রিকেট কাউন্সিলের (আইসিসি) কাছে পাঠানো একটি চিঠি। অভিযোগ উঠেছে, বুলবুল আইসিসির কাছে বাংলাদেশের ক্রিকেট বোর্ডের সদস্যপদ স্থগিত, অর্থ সহায়তা বন্ধ এবং আইসিসির বিভিন্ন টুর্নামেন্ট থেকে বাংলাদেশকে বাদ দেওয়ার মতো কঠোর পদক্ষেপ নেওয়ার আবেদন করেছেন। আইসিসিতে পাঠানো ১৪ পৃষ্ঠার একটি চিঠিতেও তিনি নিজেকে বিসিবির বৈধ সভাপতি হিসেবে উল্লেখ করেছেন। সেখানে দাবি করা হয়েছে, বর্তমান বোর্ডকে আইসিসি স্বীকৃতি না দেওয়া পর্যন্ত বাংলাদেশের জন্য বরাদ্দ সব ধরনের আইসিসি তহবিল স্থগিত রাখা হোক।

শুধু তাই নয়, চিঠিতে বাংলাদেশ সরকার, যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয় এবং জাতীয় ক্রীড়া পরিষদের বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক সতর্কবার্তা জারির আহ্বানও জানানো হয়েছে। এমনকি নির্ধারিত সময়ের মধ্যে তার নেতৃত্বাধীন বোর্ড পুনর্বহাল না হলে বিসিবির পূর্ণ সদস্যপদ স্থগিত, আইসিসির অর্থায়ন বন্ধ এবং বাংলাদেশ দলকে আইসিসির প্রতিযোগিতা থেকে বাদ দেওয়ার মতো ব্যবস্থাও বিবেচনার অনুরোধ করা হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

বুলবুলের দাবি অনুযায়ী, তিনি এখনও বিসিবির বৈধ সভাপতি। তার যুক্তি, তার নেতৃত্বাধীন বোর্ডকে যে প্রক্রিয়ায় সরানো হয়েছে, সেটি ছিল অনিয়মপূর্ণ এবং সেই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের সর্বোচ্চ সংস্থার হস্তক্ষেপ প্রয়োজন। অন্যদিকে বর্তমান বাস্তবতা হলো, জাতীয় ক্রীড়া পরিষদ (এনএসসি) তার নেতৃত্বাধীন কমিটি বাতিল করে নতুন কাঠামোর মাধ্যমে নির্বাচন আয়োজন করেছে। সেই নির্বাচনের মাধ্যমে সাবেক অধিনায়ক তামিম ইকবাল বিসিবি সভাপতির দায়িত্ব নিয়েছেন।

যদিও পরে ভিডিও বার্তায় এসব অভিযোগ সম্পূর্ণ অস্বীকার করেছেন তিনি। তবে ঘটনার সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ দিক হলো-এটি কেবল একজন সাবেক সভাপতির সঙ্গে বর্তমান বোর্ডের বিরোধ নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে গেছে একটি দেশের ক্রিকেট প্রশাসনের আন্তর্জাতিক গ্রহণযোগ্যতার প্রশ্ন!

এই দ্বন্দ্বের মূল জায়গাটি হলো ‘বৈধতা’। বুলবুল মনে করছেন, তাকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে। তার পক্ষ থেকে আইসিসির কাছে দেওয়া অভিযোগের মূল সুরও ছিল-বিসিবির বর্তমান কাঠামো আইসিসির নিয়মের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। তবে ক্রিকেট প্রশাসনের বাস্তবতায় শুধু অভিযোগ করলেই কোনো বোর্ডের স্বীকৃতি বাতিল হয় না। আইসিসি সাধারণত সদস্য দেশগুলোর অভ্যন্তরীণ প্রশাসনিক বিষয়ে হস্তক্ষেপ করে তখনই, যখন রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ বা ক্রিকেট পরিচালনায় সরাসরি বাধার বিষয়টি স্পষ্টভাবে প্রমাণিত হয়।

এখানেই তৈরি হয়েছে বড় প্রশ্ন-বুলবুলের পদক্ষেপ কি তার ব্যক্তিগত প্রশাসনিক অবস্থান রক্ষার চেষ্টা, নাকি সত্যিই বাংলাদেশের ক্রিকেটের স্বচ্ছতা রক্ষার উদ্যোগ?

কারণ আইসিসির কাছে কোনো দেশের অর্থ বন্ধ বা সদস্যপদ স্থগিত করার আবেদন একটি অত্যন্ত কঠোর পদক্ষেপ। ক্রিকেট বোর্ডের অর্থায়ন বন্ধ হলে ক্ষতিগ্রস্ত হয় শুধু প্রশাসন নয়; ক্ষতিগ্রস্ত হয় খেলোয়াড় উন্নয়ন, ঘরোয়া ক্রিকেট, বয়সভিত্তিক দল, নারী ক্রিকেট এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা। ফলে এমন আবেদন কোনো ব্যক্তিগত বা অভ্যন্তরীণ বিরোধের অংশ হলে সেটি বাংলাদেশের ক্রিকেটের ভাবমূর্তিতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।

অবশ্য বুলবুলের বক্তব্য ভিন্ন। তিনি বলেছেন, বাংলাদেশের ক্ষতি হতে পারে-এমন কোনো অনুরোধ তিনি আইসিসির কাছে কখনো করবেন না। তার দাবি, তার বিরুদ্ধে পরিকল্পিতভাবে অপপ্রচার চালানো হচ্ছে এবং অতীতেও একইভাবে তাকে ঘিরে বিভ্রান্তিকর তথ্য ছড়ানো হয়েছে।

এখানে তৈরি হয়েছে দুই পক্ষের দুই ধরনের বয়ান। একদিকে অভিযোগ-তিনি নিজের অবস্থান পুনরুদ্ধারের জন্য আন্তর্জাতিক চাপ সৃষ্টি করতে চাইছেন। অন্যদিকে তার দাবি-তিনি ষড়যন্ত্রের শিকার এবং বাংলাদেশের স্বার্থবিরোধী কোনো পদক্ষেপ নেওয়া তার পক্ষে সম্ভব নয়।

বিসিবির এই সংকটের পেছনে রয়েছে আরও বড় বাস্তবতা। বাংলাদেশের ক্রিকেটে প্রশাসনিক পরিবর্তন বহুবার রাজনৈতিক পরিবর্তনের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে। সরকার পরিবর্তনের পর বোর্ড কাঠামো বদলানো, পুরোনো নেতৃত্বের বিদায় এবং নতুন নেতৃত্বের আগমন-এসব বাংলাদেশের ক্রিকেটে নতুন নয়। কিন্তু এবার পার্থক্য হলো, বিরোধটি দেশের গণ্ডি ছাড়িয়ে আইসিসির পর্যায়ে পৌঁছানোর অভিযোগ উঠেছে।

ক্রিকেট প্রশাসনে ব্যক্তিগত দ্বন্দ্ব যতই থাকুক, আন্তর্জাতিক মঞ্চে দেশের ক্রিকেটের ভাবমূর্তি রক্ষা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। কারণ আইসিসির সদস্যপদ শুধু প্রশাসনিক পরিচয় নয়; এটি একটি দেশের ক্রিকেটের বৈশ্বিক অবস্থানের প্রতীক।

আরেকটি বিষয়ও আলোচনায় এসেছে-বিসিবির পরিবর্তনের পর শ্রীলঙ্কান ক্রিকেট বোর্ডেও পরিবর্তন এসেছে। কিন্তু আইসিসি এখন পর্যন্ত কোনো নেতিবাচক পদক্ষেপ নেয়নি। এটি ইঙ্গিত দেয়, আইসিসি সাধারণত নির্বাচিত বা স্বীকৃত কাঠামোর বিষয়ে সতর্ক অবস্থান নেয় এবং সরাসরি হস্তক্ষেপের আগে দীর্ঘ প্রক্রিয়া অনুসরণ করে।

সব মিলিয়ে বুলবুল-ইস্যু এখন বাংলাদেশের ক্রিকেটে একটি বড় পরীক্ষার নাম। এখানে শুধু কে সভাপতি ছিলেন বা কে সভাপতি হলেন-সেটিই প্রশ্ন নয়। প্রশ্ন হলো, ব্যক্তিগত প্রশাসনিক লড়াই কতটা পর্যন্ত আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের দরজায় নেওয়া উচিত?

বাংলাদেশ ক্রিকেট বহু সংগ্রামের মধ্য দিয়ে আজকের অবস্থানে এসেছে। মাঠের পারফরম্যান্সের পাশাপাশি প্রশাসনিক স্থিতিশীলতাও এখন সমান গুরুত্বপূর্ণ। তাই এই সংকটের সমাধান হতে হবে এমনভাবে, যেখানে ব্যক্তি নয়-প্রাধান্য পাবে বাংলাদেশের ক্রিকেটের দীর্ঘমেয়াদি স্বার্থ!

এসএন/কে

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *