বাংলাদেশে উচ্চ রক্তচাপ (হাইপারটেনশন) নিয়ন্ত্রণে প্রয়োজনীয় অ্যান্টি-হাইপারটেনসিভ ওষুধের নিরবচ্ছিন্ন প্রাপ্যতা নিশ্চিত করতে পৃথক বাজেট বরাদ্দ, ওষুধ সরবরাহ ব্যবস্থা শক্তিশালীকরণ এবং প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবার মাধ্যমে প্রতিরোধমূলক কার্যক্রম জোরদারের আহ্বান জানিয়েছেন স্বাস্থ্যখাতের নীতিনির্ধারক, জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ, গবেষক ও উন্নয়ন সহযোগীরা।
আজ শনিবার (৬ জুন) বাংলাদেশ মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বিএমইউ) ডিপার্টমেন্ট অব পাবলিক হেলথ অ্যান্ড ইনফরমেটিক্স এবং নন-কমিউনিকেবল ডিজিজ (এনসিডি) সেন্টারের উদ্যোগে, গ্লোবাল হেলথ অ্যাডভোকেসি ইনকিউবেটরের (জিএইচএআই) সহায়তায় বাস্তবায়িত ‘প্রাইয়োরিটিস অব হাইপারটেনশন ট্রিটমেন্ট ইন বাংলাদেশ বাই ইনক্রিজিং এক্সেস টু এন্টি-হাইপারটেনসিভ ড্রাগস’ শীর্ষক প্রকল্পের আওতায় আয়োজিত এক উচ্চ পর্যায়ের রাউন্ড টেবিল আলোচনায় এ আহ্বান জানানো হয়।
সভায় উপস্থাপিত তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে বর্তমানে প্রায় ২ কোটি ২৮ লাখ প্রাপ্তবয়স্ক উচ্চ রক্তচাপে আক্রান্ত। আক্রান্তদের প্রায় ৪৮ শতাংশ এখনও রোগ সম্পর্কে অবগত নন, এবং মাত্র ১৬ শতাংশের রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। উচ্চ রক্তচাপজনিত জটিলতা প্রতিবছর বিপুল সংখ্যক হৃদরোগ, স্ট্রোক, কিডনি রোগ ও অকাল মৃত্যুর কারণ হয়ে দাঁড়াচ্ছে।
প্রধান অতিথির বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রীর স্বাস্থ্যবিষয়ক বিশেষ সহকারী ডা ডা. জিয়াউদ্দিন হায়দার বলেন, দেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থাকে কেবল চিকিৎসানির্ভর কাঠামো থেকে বেরিয়ে এসে প্রতিরোধ ও স্বাস্থ্য-উন্নয়নভিত্তিক ব্যবস্থায় রূপান্তর করতে হবে। তিনি কমিউনিটি পর্যায়ে স্বাস্থ্য সহকারী, পরিবার কল্যাণ সহকারী এবং অন্যান্য স্বাস্থ্যকর্মীদের সমন্বয়ে জনগণের দোরগোড়ায় স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে দেওয়ার পরিকল্পনার কথা তুলে ধরেন। একই সঙ্গে তিনি উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস, পুষ্টি, মানসিক স্বাস্থ্য ও অন্যান্য অসংক্রামক রোগের প্রাথমিক স্ক্রিনিং ও প্রতিরোধমূলক কার্যক্রম জোরদারের ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
বক্তারা বলেন, উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে শুধু হাসপাতাল ও চিকিৎসাসেবা সম্প্রসারণ যথেষ্ট নয়; বরং জনগণের মধ্যে সচেতনতা বৃদ্ধি, নিয়মিত স্ক্রিনিং, স্বাস্থ্যকর জীবনধারা এবং প্রয়োজনীয় ওষুধের সহজলভ্যতা নিশ্চিত করতে হবে। তারা উল্লেখ করেন, উচ্চ রক্তচাপের চিকিৎসায় সামান্য বিঘ্নও স্ট্রোক, হৃদরোগ, অক্ষমতা ও অকাল মৃত্যুর ঝুঁকি বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়।
আলোচনায় অংশগ্রহণকারীরা উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে অ্যান্টি-হাইপারটেনসিভ ওষুধের জন্য পৃথক বাজেট লাইন প্রতিষ্ঠা, এসেনশিয়াল ড্রাগস কোম্পানি লিমিটেডের (ইডিসিএল) উৎপাদন ও সরবরাহ সক্ষমতা বৃদ্ধি, চাহিদাভিত্তিক ক্রয় ও সরবরাহ ব্যবস্থাপনা জোরদার, কেন্দ্রীয় ডিজিটাল মনিটরিং ব্যবস্থা চালু এবং আন্তঃপ্রাতিষ্ঠানিক সমন্বয় বৃদ্ধির সুপারিশ করেন।
সভায় আরও উল্লেখ করা হয়, বাংলাদেশে উচ্চ রক্তচাপের ক্রমবর্ধমান বোঝা মোকাবিলায় দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ, গবেষণা কার্যক্রম সম্প্রসারণ এবং স্থানীয় ওষুধ শিল্পে গবেষণা ও উন্নয়ন (আর অ্যান্ড ডি) শক্তিশালী করা প্রয়োজন।
সভার বক্তারা বলেন, উচ্চ রক্তচাপ প্রতিরোধ ও নিয়ন্ত্রণে নিরবচ্ছিন্ন ওষুধ সরবরাহ নিশ্চিত করা শুধু একটি স্বাস্থ্যখাতের বিনিয়োগ নয়, বরং হাজারো মানুষের জীবন রক্ষা এবং বাংলাদেশে হৃদরোগজনিত অকাল মৃত্যু কমানোর একটি কার্যকর ও সময়োপযোগী পদক্ষেপ।
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন প্রধানমন্ত্রীর স্বাস্থ্যবিষয়ক বিশেষ সহকারী ডা. এস এম জিয়াউদ্দিন হায়দার, পিএইচডি। সভায় সভাপতিত্ব করেন বাংলাদেশ মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রো-ভাইস চ্যান্সেলর (প্রশাসন) অধ্যাপক ডা. মো. আবুল কালাম আজাদ। বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন স্বাস্থ্য সেবা বিভাগের সচিব মো. কামরুজ্জামান চৌধুরী। আলোচনায় স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়, স্বাস্থ্য অধিদপ্তর, এসেনশিয়াল ড্রাগস কোম্পানি লিমিটেড (ইডিসিএল), জাতীয় হৃদরোগ ফাউন্ডেশন, বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়, গবেষণা প্রতিষ্ঠান এবং নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা অংশগ্রহণ করেন।