প্রায় তিন মাস ধরে চলা ইরান যুদ্ধ অবসানের লক্ষ্যে এক সপ্তাহের বেশি সময় ধরে চলা যুদ্ধবিরতির মধ্যেই মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এক কঠোর বার্তা দিয়েছেন। তিনি জানিয়েছেন, তেহরানের সঙ্গে চুক্তি হলে তা অত্যন্ত ‘চমৎকার ও অর্থবহ’ হতে হবে, অন্যথায় কোনো চুক্তিই করা হবে না। আজ সোমবার (২৫ মে) নিজের সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ‘ট্রুথ সোশ্যাল’-এ দেওয়া এক পোস্টে তিনি এই মন্তব্য করেন। খবর আল জাজিরার।
মধ্যস্থতাকারীদের চাপে ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে গত ৮ এপ্রিল থেকে একটি সাময়িক যুদ্ধবিরতি চললেও সংকট কাটেনি। ইরান এখনো হরমুজ প্রণালিতে বেশিরভাগ জাহাজ চলাচল বন্ধ রেখেছে এবং যুক্তরাষ্ট্রও দেশটির বন্দরগুলোতে নৌ অবরোধ বজায় রেখেছে।
ট্রাম্প স্পষ্ট করে বলেছেন, ‘একটি চুক্তি পুরোপুরি সম্পাদিত ও স্বাক্ষরিত না হওয়া পর্যন্ত মার্কিন অবরোধ পূর্ণ শক্তিতে বলবৎ থাকবে। উভয় পক্ষকেই সময় নিয়ে বিষয়টি সঠিকভাবে সম্পন্ন করতে হবে।’
আলোচনায় অগ্রগতি, তবে চুক্তি এখনই নয়
সোমবার ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই তেহরানে এক সংবাদ সম্মেলনে জানান, ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র আলোচনার একটি বড় অংশের বিষয়ে ঐকমত্যে পৌঁছেছে। তবে এর মানে এই নয় যে চুক্তি স্বাক্ষর আসন্ন। বাঘাই পুনর্ব্যক্ত করেন, গত ২৮ ফেব্রুয়ারি শুরু হওয়া এই যুদ্ধ থামানোই এখন প্রধান লক্ষ্য এবং এই পর্যায়ে পারমাণবিক বিষয় নিয়ে কোনো আলোচনা হচ্ছে না। তবে যুক্তরাষ্ট্র পরে চুক্তি রক্ষা করবে কিনা—তা নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেন তিনি।
অন্যদিকে, মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও আজ নয়াদিল্লি সফরকালে সাংবাদিকদের বলেন, ‘ওয়াশিংটন হয় ইরানের সঙ্গে একটি শক্তিশালী চুক্তি করবে, নয়তো অন্য কোনো উপায়ে দেশটির মোকাবিলা করবে। হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়ার বিষয়ে আমাদের কাছে বেশ শক্তিশালী একটি প্রস্তাব রয়েছে।’
পাকিস্তানের মধ্যস্থতা ও চীনের সমর্থন কূটনৈতিক তৎপরতার অংশ হিসেবে এই চুক্তির প্রধান মধ্যস্থতাকারী দেশ পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরীফ ও সেনাপ্রধান আসিম মুনির বর্তমানে চীনের বেইজিংয়ে রয়েছেন। পাকিস্তান টেলিভিশন জানিয়েছে, তারা চীনা নেতাদের সঙ্গে মধ্যপ্রাচ্য পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা করছেন। চীনও জানিয়েছে, তারা মধ্যপ্রাচ্যে দ্রুত শান্তি ফিরিয়ে আনতে পাকিস্তানের সঙ্গে কাজ করতে প্রস্তুত। উল্লেখ্য, গত সপ্তাহে পাকিস্তানের এই শীর্ষ নেতারা তেহরান সফর করেছিলেন।
চুক্তির মূল শর্ত
নাম প্রকাশ না করার শর্তে ট্রাম্প প্রশাসনের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা রয়টার্সকে জানিয়েছেন, মার্কিন নৌ অবরোধ তুলে নেওয়ার বিনিময়ে ইরান তার উচ্চ-সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম নিষ্পত্তি করতে এবং হরমুজ প্রণালি খুলে দিতে ‘নীতিগতভাবে’ সম্মত হয়েছে। ইরানের সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনি এই চুক্তির মূল রূপরেখা অনুমোদন করেছেন বলেও জানা গেছে। তবে পারমাণবিক পদক্ষেপের বিস্তারিত বিষয় চূড়ান্ত করতে আরও সময় লাগবে।
কাউন্সিল অন ফরেন রিলেশনস-এর সিনিয়র ফেলো চার্লস কাপচান অবশ্য আল জাজিরাকে বলেন, ‘ট্রাম্প প্রশাসনের একদিন এক কথা, অন্যদিন অন্য কথা বলার স্বভাব রয়েছে। যতক্ষণ না ইরান কোনো বিধিনিষেধ ছাড়া হরমুজ প্রণালি পুরোপুরি খুলে দিচ্ছে এবং ইউরেনিয়াম ত্যাগ করছে, ততক্ষণ স্থায়ী চুক্তি অনেক দূরে।’
সব মুসলিম দেশকে ‘আব্রাহাম চুক্তি’ স্বাক্ষরের দাবি ট্রাম্পের
ট্রাম্প আরও একটি বড় শর্ত জুড়ে দিয়ে বলেছেন, ইরানের সঙ্গে এই চুক্তির অংশ হিসেবে মধ্যপ্রাচ্য ও এর বাইরের মুসলিম-সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশগুলোকে ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করতে হবে এবং ‘আব্রাহাম চুক্তি’তে স্বাক্ষর করতে হবে। ট্রাম্প জানান, তিনি শনিবার মিশর, জর্ডান, কাতার, পাকিস্তান, সৌদি আরব ও তুরস্কের নেতাদের সঙ্গে কথা বলেছেন এবং তাদের একযোগে এই চুক্তিতে স্বাক্ষর করা উচিত। বিশেষ করে সৌদি আরব ও কাতারের অবিলম্বে এই চুক্তিতে স্বাক্ষর করা উচিত বলে তিনি মন্তব্য করেন।
উল্লেখ্য, ২০২০ সালে এই আব্রাহাম চুক্তির মাধ্যমে ইসরায়েলের সঙ্গে চার আরব দেশের সম্পর্ক স্বাভাবিক হয়েছিল, যা ফিলিস্তিন রাষ্ট্র গঠনের দাবিকে উপেক্ষা করায় অঞ্চলজুড়ে ব্যাপক সমালোচনার মুখে পড়েছিল।