আনমনে অরুনেন্দু, গান মনে প্যাক্সটন

আল মাহফুজ ⚫


‘সারারাত আমি হই শুধু আমার
নির্ঘুম নির্জনতায় বাড়ে আঁধার
কাটে না, কাটে না যে সময়
অস্থির ভাবনারা ঘিরে রয়
অনুভব শুধু এক ব্যথাভার
নির্ঘুম নির্জনতায় বাড়ে আঁধার
আসে না সে তো আর, যে আসার
নির্ঘুম নির্জনতায় বাড়ে আঁধার..’

গানে যদি থাকে প্রাণের তাগিদ কিংবা প্রাণ যদি বয় গানের গাঙ্গে, তবে কি তা প্রশান্তির? গান যদি কানের ভেতর দিয়ে মর্মে গিয়ে পৌঁছায়, পায় পরিপূর্ণতা। একটা গান ‘গান’ হয়ে উঠেছে কিনা, তা অনুভব করা যায়। যেভাবে অ্যাঞ্জেল জলপ্রপাত দেখলে বোঝা যায়, সাধনার অপূর্ব সম্ভার। এখানে ঘণ্টা বাজাতে গেলে পাহাড়ি পাতা ছোঁয়ার আড়ম্বর নেই। কিন্তু ফেনার রঙ দেখলে চোখ ফেরানো দুঃসাধ্য। তবে এমন ভ্রমণের জন্য প্রাণশক্তি থাকাও প্রয়োজন। তখন ‘আসে না, সে তো আর’ শুনে আপনি হয়তো মুষড়ে পড়বেন কিন্তু মচকাবেন না। ‘অনুভব শুধু এক ব্যথাভার’ আপনার কান বেয়ে এক নিমিষে ছুটে যাবে কাঁধে। আপনি তখন টের পাবেন সেই পাথর বহনের ভার। বাংলায় মডার্ন মিউজিক যার হাত ধরে প্রায় সাবালক হয়ে ওঠে, আপনি গড়াগড়ি খাবেন সেই অরুনেন্দু দাসে।

শোনা যাক দুয়েকটা গান আরও—

‘দিশেহারা যে মোর মন, কীসে সার্থক এ জীবন
খুঁজে ফিরি কোথা নেব ঠাঁই
চারিদিকে সবাই মোর, কেউ ভালো, কেউ মন্দ ঘোর
আপন মান যেচে সেথা বেড়াই
মনে ভাবনা তবু ঘিরে রয়েছে সদাই
এতো চাওয়া নিয়ে কোথা যাই?’

অরুনেন্দুর আরেক জনপ্রিয় গান। জীবনমুখী গানটার মূল শিল্পী টম প্যাক্সটন (আই কান্ট হেল্প বাট ওয়ান্ডার..)। আপনি কি মার্কিন এই সিংগার-সং রাইটারের নাম জীবনে প্রথম শুনলেন? তাহলে বলি– কিছু কিছু বৃষ্টি চঞ্চল করে তোলে হাওরের বুক, কিছু কিছু সলতের জলসায় জ্বলে ওঠে অতীন্দ্রিয় দীপ, তেমনই এক বৃষ্টি বা সলতের নাম প্যাক্সটন।

ছোটবেলা থেকে সংগীতের প্রতি যার ছিল নিগূঢ় আকর্ষণ। সংগীত যার কাছে বুদ্বুদ ওঠা জলাধার। এক আত্মীয়ের কাছ থেকে উপহার হিসেবে পেয়েছিলেন একটা ছোট্ট উকুলেলে। সেই উকুলেলে প্যাক্সটনের জীবনের বুদ্বুদ বাড়িয়ে দেয় মৌতাতের মতো। সেখান থেকেই শুরু হয় সংগীতের সঙ্গে তার গাঁটছড়া বাঁধা।

এই দীর্ঘ যাত্রায় প্যাক্সটনের হৃদয় কখনও ভাঙ্গে, কখনও বুকের ভেতর স্যালিক্স উইলো গজায়। লু বাতাস এসে কখনও চন্দ্রমল্লিকার রেণু ছড়ায়। নিঃসঙ্গতার যাবতীয় নিঃশ্বাস নিয়ে তবু তিনি লেখেন, ‘ইটস আ লেসন টু লেট ফর দ্য লার্নিং/ মেড অব স্যান্ড, মেড অব স্যান্ড/ ইন দ্য উইঙ্ক অব অ্যান আই মাই সৌল ইজ টার্নিং/ ইন ইয়োর হ্যান্ড, ইন ইয়োর হ্যান্ড.. ওয়েল, আই কুড হ্যাভ লাভড ইউ বেটার/ ডিডন্ট মিন টু বি আনকাইন্ড/ ইউ নো দ্যাট ওয়াজ দ্য লাস্ট থিং অন মাই মাইন্ড..’

পাঠশালায় যেতে দেরি হয়েছে ঢের
চোরাবালিতে জীর্ণ সে পথ
পলকে পলকে আমার আত্মার রথ
জপে তোমার নামের শপথ

আরও ভালোবাসতে পারতাম, জেনো
ক্রুর হতে চাইনি কখনও
আমার পরম প্রেম, প্রিয়তমা
কেবল তুমিই জানো..

প্যাক্সটনের লিরিক নির্জলা জলের মতো, সুর যেন কোকিলের ডাক। আর যখন মঞ্চে দাঁড়ান, হাওয়াই গিটার হয়ে যায় প্রিয় বেড়াল আর আঙ্গুল মখমলের চাদর। মনে হয় বেড়ালকে তিনি আদর করছেন। ঘেমে নেয়ে একাকার হয়ে প্যাক্সটন যখন কণ্ঠ ছাড়েন ‘পিস উইল কাম’, ভক্তের মনে আশার ঘুড়ি– একদিন থেমে যাবে ঝড়, শান্ত হবে সব।

মহাকালও তাতে সায় দেয়। প্যাক্সটনের গান শুধু মার্কিন মুলুকে নয় বরং দুনিয়ার নানা প্রান্তের মানুষের অনুভূতি স্পর্শ করে। এ কারণেই নিউইয়র্কের গ্রিনউইচ ভিলেজের ‘ফোক মিউজিক আন্দোলন’-এর অংশ হিসেবে তার নামে রব ওঠে। এ কারণেই হয়তো তার গিটার প্লেয়িং থেকে উদগীরণ হয় লক্ষাধিক শব্দলাভা।

আরও দেখুন

সরকারি আদেশ দেখুন

টিভি দেখুন

আরব সংস্কৃতি জানুন

প্যাক্সটনের গান যেমন সরল-নৈর্ব্যক্তিক, তেমনই একান্ত ব্যক্তিক। কখনও তাতে সন্তুর বৈঠা বয়, কখনও তৈরি হয় আবেগের তীব্র স্রোত। টম শুধু ফোক গায়ক নন বরং একজন রোম্যান্টিক কবি। টম কেবল নীরব বিপ্লবীই নন বরং হাওয়ার অনন্ত ফল্গুধারা; যার গান যুগ যুগ ধরে মানুষের হৃদয় ছুঁয়ে গেছে। বাবুইয়ের মতো বাসা বেঁধেছে ‘দ্য লাস্ট থিং অন মাই মাইন্ড’, ‘র‍্যাম্বলিং বয়’সহ অজস্র সৃষ্টির।

‘হি ওয়াজ আ ম্যান অ্যান্ড আ ফ্রেন্ড অলওয়েজ
হি স্টাক উইথ মি ইন দ্য ব্যাড ওল্ড ডেইজ
হি নেভার কেয়ার্ড ইফ আই হ্যাড নো ডো
উই র‍্যাম্বল্ড রাউন্ড ইন দ্য রেইন অ্যান্ড স্নো

সো হিয়ার্স টু ইউ মাই র‍্যাম্বলিং বয়
মে অল ইয়োর র‍্যাম্বলিং ব্রিং ইউ জয়’

প্রাণের তাগিদ থেকে গানের বহিরানা 

অরুনেন্দু দাস জন্মেছিলেন মিয়ানমারে। বিশ্বযুদ্ধের ডঙ্কা বাজলে চলে আসেন বাংলাদেশে। বিক্রমপুরের বজ্রযোগিনী গ্রাম তার বড় হবার সঙ্গী। ষাট দশকের শেষের দিকে চলে যান বিলেতে। পোষাক বদলের মতো করে পাল্টে যায় ঘর। অতিথি পাখির মতো পরবাসেও বাড়ে বন্ধুর পরিধি। সেখানে তার চিন্তাধারায় ব্যাপক পরিবর্তন আনে নতুন শোনা সব গান।

আমেরিকা ও ব্রিটিশ ফোক মিউজিকের সাথে পরিচিত হলে গান নিয়ে অরুনেন্দুর ডেফিনেশনটাই পাল্টে যায়। অক্সফোর্ডশায়ারের ফোক ক্লাবের সদস্য হন তিনি। গানের সঙ্গে তাল মিলিয়ে গিটার বাজানোর কায়দা কানুন রপ্ত করেন। এরপর সেগুলোকে বাংলার তূনে প্রবেশ করিয়ে শুরু হয় গান রচনা।

অরুনেন্দু তখন কি প্যাক্সটনের সান্নিধ্য পেয়েছিলেন? টম দুবছর লন্ডনে বসবাস করেছেন বলে জানা যায়। কিন্তু আমরা জানি না, তাদের মোলাকাত হয়েছিল কিনা। তবে এটা জানতে কসুর হয় না, সেই ফোক ক্লাব থেকে অরুনেন্দুর পরিচয় প্যাক্সটনের গানের সাথে। কারণ, ষাটের দশকে ফোক মিউজিক রিভাইভালের অন্যতম ‘পোস্টার বয়’ ছিলেন এই মার্কিন মিউজিশিয়ান।

টম প্যাক্সটনের জন্ম ১৯৩৭ সালের ৩১ অক্টোবর, যুক্তরাষ্ট্রের শিকাগোতে। ইউরোপেও ছিল পদচারণ। আর অরুনেন্দু দাস তার এক বছর বাদে জন্মেছিলেন মিয়ানমারে। বেড়ে ওঠা বাংলাদেশ ও কলকাতায়। দুজনের শেকড় দুই মহাদেশে থাকলেও মিউজিকের বিন্দুতে তারা মিলেছেন একসূত্রে। নিজের লিরিকে সুর বসিয়ে তারা সেটা কণ্ঠের মোড়কে জড়িয়েছেন। শুধু একটা গিটার সঙ্গে করে বিরামহীন গেয়ে চলেছেন গানের পর গান। সাক্ষাৎ ‘দ্য ওয়ান ম্যান শো’!

এই অমর দুই শিল্পীর সংযোগ আমাদের মনে করিয়ে দেয় ‘ডিভাইন কমেডি’র কথা। বিয়াত্রিচ যেমন স্বর্গের পথে দান্তের পথপ্রদর্শক ছিলেন, অরুনেন্দুর গানের ভেলায় প্যাক্সটন তেমন। দুজনের গানের সহজ লোকজ সুর, মর্মভেদী গিটার বাদন অথবা লিরিকের ধরন লক্ষ্য করলে এ কথা অমূলক বলে মনে হয় না। যদিও অরুনেন্দুতে প্রভাব আছে বব ডিলানসহ আরও অনেকেরই।

মনের খোরাক যোগাতে গান বেঁধেছেন, আড্ডায় হুল্লোড় করে গেয়েছেন– এই পর্যন্তই। গান নিয়ে অ্যালবাম করার ভাবনা অরুণেন্দুর কখনও ছিল না। কিন্তু এই অন্তর্মুখী ভাবনার মেঘ বহির্মুখী বৃষ্টি হয়ে ঝরে ‘মহীনের ঘোড়াগুলি’র আদি ঘোড়া গৌতম চট্টোপাধ্যায়ের সঙ্গে আলাপের পর। একে একে উড়ে বেড়ায় ‘তাই জানাই গানে’, ‘যাস কোথা তুই’, ‘দিশেহারা’, ‘গঙ্গা’, ‘সারারাত’, ‘মাগো তোমায়’র মতো প্রবল জনপ্রিয় গান। অরুণেন্দু দাস হয়ে যান বাংলা আধুনিক গানের প্রথম সিংগার-সং রাইটার।

তবে প্যাক্সটন ছিলেন তার বিপরীত মেরুতে। এক জীবনে শুধু গানটাই করতে চেয়েছেন। গ্রিনউইচ ভিলেজে বব ডিলান, ফিল অক্সের সাথে ফোক গান গেয়েছেন। সামাজিক ন্যায়বিচার, পরিবেশ সচেতনতার প্রসঙ্গ যেমন উঠে এসেছে প্যাক্সটনের গানে, তেমনি ছুটে বেরিয়েছেন নাগরিক অধিকার-শ্রমিক অধিকারসহ বিবিধ ইস্যুতে।

প্যাক্সটনের জীবন প্রবাহিত হয়েছে গানকে কেন্দ্র করেই। গানের মাধ্যমে নিজের দর্শন ছড়িয়ে দিতে চেয়েছেন বিশ্ববাসীর কাছে। নিজে গেয়েই ক্ষান্ত হননি, শিশুদের কাছেও পৌঁছে দিয়েছেন সুরের নজরানা। প্রচলিত রাজনীতি নিয়ে ব্যঙ্গ করেছেন। যুদ্ধবিরোধী আন্দোলনে অংশ নিয়েছেন, গান বেঁধেছেন। যা তাকে পরিণত করে সমসাময়িক সমাজ ও সংগীতের এক বলিষ্ঠ কণ্ঠস্বর রূপে।

জার্মান দার্শনিক নীৎশে ‘দ্য বার্থ অব ট্রাজেডি’ বইতে লিখেছিলেন, অ্যাপোলো হলেন ক্লাসিক সভ্যতার প্রতীক আর ডায়োনিসাস রোমান্টিকতার। এই দুই মহান শিল্পী প্রসঙ্গে আমরা বলতে পারি— প্যাক্সটন ফোক মিউজিক ও প্রতিবাদের প্রতীক এবং অরুনেন্দু হলেন নির্মল জীবনের।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *