চলতি বছরের জানুয়ারিতে বিশ্ববাজারে আউন্সপ্রতি রেকর্ড ৫ হাজার ৫০০ ডলারের ঐতিহাসিক মাইলফলক স্পর্শ করার পর থেকেই আন্তর্জাতিক বাজারে স্বর্ণের দামে সংশোধন বা দরপতন লক্ষ্য করা যাচ্ছে। বাজার বিশ্লেষকদের মতে, সাম্প্রতিক এই দরপতন সাময়িক কোনো ঘটনা নয়, বরং অতীতের বড় বড় অর্থনৈতিক ধসের ধারাকে অনুসরণ করে এটি দীর্ঘস্থায়ী মন্দার রূপ নিতে পারে। খবর রয়টার্সের।
শুক্রবার (৫ জুন) একদিনেই স্পট গোল্ডের দাম প্রায় ৩ শতাংশ কমে আউন্সপ্রতি ৪ হাজার ৩৪১ দশমিক ৫২ ডলারে নেমে এসেছে। যা এই সপ্তাহে সামগ্রিক পতনকে ৪ দশমিক ৩ শতাংশে নিয়ে গেছে। বাজার সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ইতিহাসের সবচেয়ে বড় রেকর্ড উত্থানের পর স্বর্ণের বাজারে এখন দীর্ঘমেয়াদি পতনের সংকেত মিলছে, যার নেপথ্যে প্রধান তিনটি কারণ কাজ করছে।
প্রথম কারণ হিসেবে কাজ করছে ঐতিহাসিক ধারার পুনরাবৃত্তি, যা স্পষ্ট করে উত্থানের পরই মূলত বড় ধস নেমে আসে। স্বর্ণের বাজারের গত দুই দশকের ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, এই মূল্যবান ধাতুর মূল্যে যখনই কোনো তীব্র উত্থান এসেছে, তার ঠিক পরপরই একটি বড় ধরনের দীর্ঘমেয়াদি পতন বা সংশোধনমূলক সময়কাল তৈরি হয়েছে। যেমন ২০০৮ থেকে ২০১১ সালের চক্রে স্বর্ণের দাম ১৭০ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়ে ১ হাজার ৮৮৪ দশমিক ৪০ ডলারে পৌঁছানোর পর, পরবর্তী কয়েক বছরে তা প্রায় ৩৭ শতাংশ পতনে হয়। এরপর ২০১৮ থেকে ২০২০ সালের মধ্যে দাম ৭৪ শতাংশ বাড়লেও ২০২২ সালের সেপ্টেম্বরের মধ্যে তা আবার ২২ শতাংশ হ্রাস পায়।
ঐতিহাসিক ধারা অনুযায়ী, উত্থানের হার যত বড় হয়, পরবর্তী পতনের গভীরতাও ততটাই বেশি হয়। যেহেতু ২০২২ সালের সেপ্টেম্বর থেকে ২০২৬ সালের জানুয়ারি পর্যন্ত স্বর্ণের দাম অবাস্তব ২৪৫ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়ে সর্বকালের সর্বোচ্চ ৫ হাজার ৫৯৪ দশমিক ৮২ ডলারে গিয়ে ঠেকেছিল, তাই পূর্বের এই ধারা বিবেচনা করলে আগামী মাস বা বছরগুলোতে স্বর্ণের মূল্যে আরও বড় ও দীর্ঘস্থায়ী পতন ঘটার প্রবল সম্ভাবনা রয়েছে।
দ্বিতীয় কারণটি হলো বিশ্বব্যাপী স্বর্ণের মৌলিক চাহিদাতে বড় ধরনের ধস নামা। জানুয়ারির রেকর্ড উচ্চতার পর স্বর্ণের দাম যেটুকু টিকে আছে, তাকে একপ্রকার অলৌকিকই বলা চলে। কারণ বিশ্বজুড়ে এর মূল চালিকাশক্তি বা মৌলিক চাহিদার জায়গাগুলোতে বড় ধরনের ঘাটতি তৈরি হয়েছে। অতিরিক্ত দাম বেড়ে যাওয়ার কারণে বিশ্বের শীর্ষ দুই ক্রেতা দেশ চীন ও ভারতে অলঙ্কারের চাহিদা ব্যাপক কমেছে। ২০২৬ সালের প্রথম প্রান্তিকে জুয়েলারি চাহিদা চীনে ৩১ শতাংশ ও ভারতে ১৯ শতাংশ কমে এসেছে। সামগ্রিকভাবে বিশ্বব্যাপী গহনার চাহিদা এক ধাক্কায় ২৫ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে।
এর পাশাপাশি ২০২৫ সালের শুরু থেকেই বিভিন্ন দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর স্বর্ণ জমানোর গতি ধীর হয়ে এসেছে, যা বিগত বছরগুলোর তুলনায় অনেক কম। একই সঙ্গে গোল্ড এক্সচেঞ্জ-ট্রেডেড ফান্ড বা স্বর্ণের তহবিলের বিনিয়োগ প্রবাহে নাটকীয় ধস নেমেছে, যা গত বছরের একই প্রান্তিকের তুলনায় ৭৩ শতাংশ কম। সব মিলিয়ে ২০২৬ সালের প্রথম প্রান্তিকে বৈশ্বিক স্বর্ণের সামগ্রিক চাহিদা গত বছরের একই সময়ের তুলনায় ৯ শতাংশ কমে ১ হাজার ১৯৫ দশমিক ৯ টনে দাঁড়িয়েছে।
সর্বশেষ কারণটি হলো মার্কিন মুদ্রানীতি ও মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধের নতুন সমীকরণ। ঐতিহ্যগতভাবে স্বর্ণকে বৈশ্বিক অস্থিরতার বিরুদ্ধে একটি নিরাপদ আশ্রয় মনে করা হলেও, বর্তমানে এর দাম পুরোপুরি মার্কিন মুদ্রানীতি ও তেলের বাজারের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে। বর্তমান আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের সাথে স্বর্ণের একটি বিপরীতমুখী সম্পর্ক তৈরি হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে চলমান সংঘাতের কারণে যখনই তেলের দাম বাড়ছে, তখন বিশ্ব অর্থনীতিতে তীব্র মূল্যস্ফীতির আশঙ্কা তৈরি হচ্ছে। আর এই উচ্চ মূল্যস্ফীতির কারণে মার্কিন কেন্দ্রীয় ব্যাংক ফেডারেল রিজার্ভ সুদের হার দীর্ঘ সময়ের জন্য চড়া রাখবে— এমন সিদ্ধান্ত জোরালো হচ্ছে। সুদের হার চড়া থাকলে স্বর্ণের মতো কোনো লভ্যাংশ বা সুদ না দেওয়া সম্পদের আকর্ষণ বিনিয়োগকারীদের কাছে কমে যায়। ফলে সরাসরি স্বর্ণের দাম পড়ে যাচ্ছে। ফলস্বরূপ, স্বর্ণ এখন ভূ-রাজনৈতিক সমীকরণ এবং সুদের হারের বেড়াজালে আটকা পড়েছে।
চূড়ান্ত পূর্বাভাস হিসেবে বাজার বিশ্লেষকরা মনে করছেন, চাহিদা ব্যাপকভাবে কমে যাওয়া সত্ত্বেও স্বর্ণের দাম এখন পর্যন্ত যেভাবে ৪,৩০০ ডলারের ওপরে অবস্থান ধরে রেখেছে। কিন্তু অতীত চক্রের ইতিহাস ও বর্তমান সামষ্টিক অর্থনৈতিক মন্দা স্পষ্ট সংকেত দিচ্ছে, বাজার এখনও তলানিতে পৌঁছায়নি। আরও পতনের সম্ভাবনা রয়েছে।