সৌদি আরব কেন হুথিদের ক্ষেপণাস্ত্র ঠেকাতে হিমশিম খাচ্ছে?

সৌদি নেতৃত্বাধীন জোটের বিরুদ্ধে হুথি সমর্থকদের সমাবেশে সানায় একটি ব্যানারে লেখা, ‘সৌদি আরবের সকল তেল স্থাপনা আমাদের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোনের লক্ষ্যবস্তু’।

ইয়েমেনের সশস্ত্র বিদ্রোহী গোষ্ঠী হুথি সৌদি আরবের ভূখণ্ডে টানা ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র, ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন দিয়ে সিরিজ হামলা চালাচ্ছে। গত সেপ্টেম্বর মাস থেকে শুরু হওয়া নতুন এই সামরিক অভিযানের অংশ হিসেবে বেশ কয়েকবার রিয়াদের কিং খালিদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরকে লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছে।

গতকাল শনিবার (১০ অক্টোবর) কিং খালিদ বিমানবন্দরে হুথিদের এক ভয়াবহ হামলায় ১২ জন নিহত এবং ৩০৯ জন আহত হয়েছেন। এটি গত এক দশকেরও বেশি সময়ের মধ্যে সৌদি আরবের মাটিতে সবচেয়ে প্রাণঘাতী হামলা। হামলার পর সৌদি সিভিল এভিয়েশন কর্তৃপক্ষ সব ফ্লাইট বাতিল ও বিমান ওঠানামা অন্য বিমানবন্দরে সরিয়ে দিতে বাধ্য হয়। 

অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্য তাদের নাগরিকদের জন্য নতুন ভ্রমণ সতর্কতা জারি করেছে। চলতি সপ্তাহে এই বিমানবন্দর লক্ষ্য করে আরও দুটি হামলা চালায় হুথিরা। একই সঙ্গে তারা সাধারণ মানুষকে সৌদি আরবের সব বিমানবন্দর এড়িয়ে চলার চরম হুঁশিয়ারি দিয়েছে।

সৌদি আরব বিশ্বের অন্যতম সেরা সুসজ্জিত সামরিক বাহিনীর অধিকারী দেশ। তাদের রয়েছে বহুস্তরবিশিষ্ট আধুনিক আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা। গত এক সপ্তাহে ইয়েমেনজুড়ে হুথি অবস্থানগুলোতে ব্যাপক বিমান হামলা চালিয়েছে সৌদি যুদ্ধবিমান। এর লক্ষ্য ছিল সৌদি সমর্থিত ইয়েমেনি সরকারি বাহিনীর বিরুদ্ধে ইরান সমর্থিত হুথিদের সাম্প্রতিক অগ্রগতি ঠেকিয়ে দেওয়া।

তবে ২০১৪ সালের সেপ্টেম্বরে সানার নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার পর থেকে হুথিদের অস্ত্রভাণ্ডার অনেক শক্তিশালী হয়েছে। তাদের তৈরি ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র বর্তমানে প্রায় ২ হাজার কিলোমিটার দূরে ইসরায়েলেও আঘাত হানতে সক্ষম। সৌদি বিমানবন্দর ও তেল স্থাপনার মতো সুনির্দিষ্ট লক্ষ্যবস্তুতেও তারা নিখুঁত হামলা চালাতে পারছে।

হুথিদের এই উন্নত অস্ত্রভাণ্ডারের রহস্য এবং সৌদি আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা নিয়ে একটি সার্বিক বিশ্লেষণ তুলে ধরেছে সংবাদমাধ্যম আলজাজিরা। 

হুথিদের অস্ত্রভাণ্ডার কতটা আধুনিক?

কিং খালিদ বিমানবন্দরে ঠিক কোন অস্ত্রটি ব্যবহার করা হয়েছে তা নির্দিষ্ট করে জানা যায়নি। তবে ২০১৫ সালে সৌদি হস্তক্ষেপের পর থেকে হুথিরা শত শত ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়েছে। এ ছাড়া ২০২৩ সালের অক্টোবরে গাজা যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর তারা ইসরায়েল এবং লোহিত সাগরে জাহাজগুলোতেও হামলা চালিয়েছে।

হুথিরা তাদের হামলায় একই সঙ্গে বিভিন্ন গতির ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্রের সংমিশ্রণ ঘটিয়ে আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে বিভ্রান্ত করে। তাদের কাছে রয়েছে ‘ফিলিস্তিন-২’-এর মতো মাঝারি পাল্লার হাইপারসনিক ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র। দুই ধাপের শক্ত জ্বালানি চালিত এই ক্ষেপণাস্ত্রের পাল্লা প্রায় ২ হাজার কিলোমিটার। তা ছাড়া রয়েছে ‘তুফান’ নামের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র, যা ইরানি ‘ঘদর’ ক্ষেপণাস্ত্রের পুনর্নামকরণ বলে মনে করা হয়। এর পাল্লা ১ হাজার ৩৫০ থেকে ১ হাজার ৯৫০ কিলোমিটার।

এর বাইরে হুথিদের কাছে ‘বোরকান’ ও ‘বদর’ সিরিজের মতো বেশ কিছু স্বল্প পাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র রয়েছে। এগুলো মূলত সীমান্তে সৌদি লক্ষ্যবস্তুতে হামলায় ব্যবহৃত হয়।

কিংস কলেজের ওয়ার স্টাডিজ ডিপার্টমেন্টের জ্যেষ্ঠ গবেষক নওয়াফ ওবায়েদের মতে, হুথিদের অধিকাংশ ক্ষেপণাস্ত্র প্রযুক্তি ইরান থেকে এসেছে। এতে কিছু চীনা প্রযুক্তির প্রভাবও রয়েছে। তিনি জানান, হুথিদের নিজস্ব কোনো বড় প্রযুক্তিগত উদ্ভাবন নেই। তারা মূলত স্বল্প ক্ষমতার ড্রোন ও নিম্নমানের ক্ষেপণাস্ত্র তৈরিতে সক্ষম। ইয়েমেন সরকার সম্প্রতি অভিযোগ করেছে, হুথিরা ‘লোইটারিং ক্রুজ মিসাইল’ বা আত্মঘাতী ক্ষেপণাস্ত্র তৈরিতে ইরানের রেভোলিউশনারি গার্ড কর্পসের (আইআরজিসি) সরাসরি সহায়তা পাচ্ছে।

সৌদি প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা কেন ব্যর্থ হচ্ছে?

সৌদি কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, তারা গত এক সপ্তাহে বেশ কিছু ক্ষেপণাস্ত্র আকাশে ধ্বংস করেছে। যার মধ্যে বৃহস্পতিবার রিয়াদ অভিমুখে আসা দুটি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রও ছিল। কিন্তু শনিবার কিং খালিদ বিমানবন্দরে আসা ক্ষেপণাস্ত্রটি তারা আটকাতে ব্যর্থ হয়।

বিশেষজ্ঞ নওয়াফ ওবায়েদ জানান, সৌদি আরবের বিশাল আয়তন এবং ইয়েমেনের সঙ্গে সুদীর্ঘ সীমান্তের কারণে মাঝে মাঝে কোনো ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ভেদে ঢুকে পড়া অস্বাভাবিক নয়। বহুস্তরের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা থাকলেও সব সময় শতভাগ হামলা আটকানো সম্ভব হয় না।

অন্যদিকে প্রতিরক্ষা বিশ্লেষক উলফগ্যাং পুস্তাই জানান, সৌদির ব্যালিস্টিক মিসাইল ডিফেন্স মূলত ইরানকে নজরদারিতে রাখার জন্য তৈরি ছিল। তবে এখন হুথি হামলা বাড়ায় তারা ইয়েমেন সীমান্তের দিকে দৃষ্টি বাড়াচ্ছে। এ ছাড়া প্যাট্রিয়ট ও থাড ক্ষেপণাস্ত্রের ঘাটতি তৈরি হয়েছে। আন্তর্জাতিক সংঘাতের কারণে মধ্যপ্রাচ্যে এসব প্রতিরোধক ক্ষেপণাস্ত্রের মজুদ দ্রুত ফুরিয়ে আসছে। ফলে সৌদি আরব বাধ্য হয়ে সম্প্রতি মিত্র দেশগুলোর কাছে অতিরিক্ত আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার সহায়তা চেয়েছে।

হুথিদের সীমাবদ্ধতা ও বাস্তবতা

এত আক্রমণের পরও হুথিরা চরম চাপে রয়েছে। জাতিসংঘ আরোপিত অস্ত্র নিষেধাজ্ঞা, সৌদি জোটের বহুবছরের অবরোধ এবং ইয়েমেনের ভেতরে একসঙ্গে কয়েকটি ফ্রন্টে যুদ্ধ চালাতে হচ্ছে তাদের।

ওবায়েদের মতে, সামরিকভাবে সৌদি নেতৃত্বাধীন জোট অনেক এগিয়ে রয়েছে। তবে হুথিরা মাঝে মাঝে সৌদির গুরুত্বপূর্ণ স্থানে হামলা চালিয়ে খবরের শিরোনাম হতে পারছে। কারণ বিশ্বের বৃহত্তম অপরিশোধিত তেল রপ্তানিকারক ও জি২০ সদস্য দেশ হওয়ায় সৌদিতে একটি ছোট হামলাও বিশ্বে বড় আলোড়ন তোলে।

বর্তমানে সৌদি জোট বিমান হামলা চালিয়ে হুথিদের মূল ভূগর্ভস্থ অস্ত্রাগার ও ড্রোন কারখানাগুলো ধ্বংস করে তাদের বিপুল ক্ষতিসাধন করছে। বিশ্লেষকরা মনে করছেন, হুথিদের স্বল্প পাল্লার ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের মজুদ এখন শেষের দিকে। তাই তারা একসঙ্গে ডজন ডজন ক্ষেপণাস্ত্র বা ড্রোনের বড় হামলা চালানোর ক্ষমতা হারিয়ে ফেলছে। ফলে তারা কৌশলগত প্রভাব বাড়াতে এখন বেসামরিক বিমানবন্দরগুলোর মতো কম সুরক্ষিত স্থানে একটি বা দুটি ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়ে বিমান চলাচল ব্যাহত করার পথ বেছে নিয়েছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *