সকালে খালি পেটে চা-কফি পান কি সত্যিই ক্ষতিকর?

প্রতিদিন সকালে ঘুম থেকে উঠে অনেকেরই এক কাপ চা বা কফি পানের অভ্যাস রয়েছে। কিন্তু এ ধরনের উত্তেজক পানীয় ঘুম থেকে উঠেই পান করা কতটা স্বাস্থ্যকর?

স্নায়ুবিজ্ঞানের মতে, ঘুম থেকে ওঠার পরপরই আমাদের শরীর নিজেই জেগে ওঠার একটি প্রাকৃতিক প্রক্রিয়া শুরু করে। এই সময় শরীরে কর্টিসল হরমোনের মাত্রা ৫০ শতাংশ থেকে ৭৫ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধি পায়, যাকে ‘কর্টিসল অ্যাওয়েকেনিং রেসপন্স’ বলা হয়। এটি মূলত শরীরের একটি প্রাকৃতিক অ্যালার্মের মতো কাজ করে। যেমন- ঘুম কাটাতে, মনকে সতর্ক করতে এবং শরীরকে সক্রিয় করে তুলতে সাহায্য করে।

নিউরোসায়েন্টিস্ট স্টিভেন মিলারের গবেষণা অনুযায়ী, ঘুম থেকে ওঠার ৩০ থেকে ৪৫ মিনিটের মধ্যেই এই হরমোনের মাত্রা সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছে। ফলে এই সময় শরীর নিজের শক্তিতেই জেগে ওঠার জন্য প্রস্তুত হয়। কিন্তু ঠিক এই সময়েই যদি কফি খাওয়া হয়, তাহলে ক্যাফেইন এই স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় হস্তক্ষেপ করে এবং ধীরে ধীরে শরীর ক্যাফেইনের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়তে পারে।

এখানেই অ্যাডিনোসিনের বিষয়টি আসে। সারাদিন আমাদের মস্তিষ্কে অ্যাডিনোসিন নামের একটি রাসায়নিক জমতে থাকে, যার ফলে আমরা ক্লান্তি অনুভব করি। ঘুমের সময় এটি পরিষ্কার হয়ে যায়, তবে ঘুম থেকে ওঠার পর সামান্য কিছু অংশ অবশিষ্ট থাকে। কফিতে থাকা ক্যাফেইন মূলত এই অ্যাডিনোসিনের কার্যকারিতা সাময়িকভাবে বন্ধ করে দেয়, ফলে আমরা হঠাৎ সতেজ অনুভব করি। ক্লান্তি দূর হয়ে যায়। কিন্তু সকালে ঘুম থেকে উঠেই কফি খেলে সেই অবশিষ্ট অ্যাডিনোসিনগুলো পরিষ্কার হওয়ার সুযোগ পায় না।

Stanford University School of Medicine (Dr. Andrew Huberman, Huberman Lab Podcast)- এর তথ্যমতে, কফি পানের কয়েক ঘণ্টা পর ক্যাফেইনের প্রভাব কমে গেলে অবশিষ্ট অ্যাডিনোসিন একবারে মস্তিষ্কে আঘাত করে, যাকে বলা হয় ‘ক্যাফেইন ক্র্যাশ’। এর ফলেই দুপুরে হঠাৎ মাথা ঝিমঝিম বা তীব্র ক্লান্তি অনুভূত হয়।

এই কারণেই বিশেষজ্ঞরা পরামর্শ দেন যে, ঘুম থেকে ওঠার অন্তত ৬০ থেকে ৯০ মিনিট পর প্রথম কাপ কফি পান করা উচিত। এই সময়টুকু দিলে শরীর তার প্রাকৃতিক কর্টিসল ব্যবস্থার মাধ্যমে সম্পূর্ণভাবে জেগে ওঠার সুযোগ পায় এবং অবশিষ্ট অ্যাডেনোসিনও ধীরে ধীরে পরিষ্কার হয়ে যায়।

আধুনিক ক্রোনোবায়োলজি গবেষণা বলছে, দেরিতে কফি পান করলে ক্যাফেইনের প্রভাব অনেক বেশি স্থিতিশীল থাকে এবং দিনের মাঝামাঝি সময়ে হঠাৎ ক্লান্তি নেমে আসে না। এই অভ্যাসটি শরীরের ‘সার্কাডিয়ান রিদম’ বা জৈবিক ঘড়িকে সুস্থ রাখতে সাহায্য করে।

তবে সকালের শুরুটা আরও স্বাস্থ্যকরভাবে করতে চাইলে কফির ওপর নির্ভর না করেও কিছু সহজ অভ্যাস গড়ে তোলা যায়। Harvard Health Publishing এবং National Sleep Foundation (NSF) -এর মতে, ঘুম থেকে উঠে পানি পান করলে রাতের পানিশূন্যতা দূর হয়ে বিপাকক্রিয়া সচল হয় এবং সূর্যের আলো মস্তিষ্ককে দ্রুত সংকেত পাঠায় যে দিন শুরু হয়ে গেছে। এর ফলে কফির ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা ছাড়াই শরীর ও মন প্রাকৃতিকভাবেই জেগে ওঠে এবং দীর্ঘ সময় কর্মক্ষম থাকে।

তথ্য উপাত্ত পর্যালোচনায় দেখা যায়, ঘুম থেকে উঠেই কফি খাওয়া ভালো অভ্যাস নয়— বরং এটি শরীরের প্রাকৃতিকভাবে জেগে ওঠার প্রক্রিয়ায় হস্তক্ষেপ করে। পরে হঠাৎ ক্লান্তি বা এনার্জি কমে যাওয়ার ঝুঁকি বাড়ায়। তাই কফি পুরোপুরি বাদ দেওয়া নয়, বরং এর সঠিক সময় নির্বাচনই বেশি গুরুত্বপূর্ণ। এই সচেতনতাই পারে পুরো দিনের শক্তি ও মনোযোগে বড় পার্থক্য এনে দিতে।

এসএন/পিডিকে

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *