রামপুরায় কার্নিশে তরুণকে গুলি ও দুজনকে হত্যা, হাবিবসহ ৫ পুলিশের বিরুদ্ধে রায় আজ

২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থানে রাজধানীর রামপুরায় নির্মাণাধীন ভবনের কার্নিশে ঝুলে থাকা এক তরুণকে ছয়টি গুলি করা, নাদিম ও মায়া ইসলাম নামে দুজনকে হত্যাসহ তিনটি অভিযোগে সাবেক ডিএমপি কমিশনার হাবিবুর রহমানসহ পাঁচজনের বিরুদ্ধে রায় আজ (২৮ জুন) ঘোষণা করবেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল।

রাষ্ট্রপক্ষ এ মামলায় সর্বোচ্চ শাস্তি চেয়েছে। তবে আসামিদের নির্দোষ দাবি করে ন্যায়বিচার চেয়েছেন তাদের আইনজীবীরা। এ মামলায় হাবিবুর রহমানসহ পুলিশের চার কর্মকর্তা পলাতক ও এক আসামি গ্রেপ্তার রয়েছেন। চাঁনখারপুলে শহীদ আনাসসহ ছয় হত্যায়ও গত ২৬ জানুয়ারি ট্রাইব্যুনাল সাবেক ডিএমপি কমিশনার হাবিবুর রহমানকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছেন।

আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ এর চেয়ারম্যান বিচারপতি মো. গোলাম মর্তূজা মজুমদারের নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের বিচারিক প্যানেল এ রায় ঘোষণা করবেন। প্যানেলের অপর দুই সদস্য হলেন— বিচারপতি মো. শফিউল আলম মাহমুদ ও মো. মোহিতুল হক এনাম চৌধুরী।

এ মামলায় পলাতক আসামিদের পক্ষে রাষ্ট্রনিযুক্ত আইনজীবী আমির হোসেন ও গ্রেপ্তার আসামি চঞ্চল চন্দ্র সরকারের পক্ষে আইনজীবী সারওয়ার জাহান নিপ্পন যুক্তি তুলে ধরে ন্যায়বিচার প্রার্থনা করেন।

অপরদিকে রাষ্ট্রপক্ষে চিফ প্রসিকিউটর আমিনুল ইসলাম, প্রসিকিউটর গাজী এম এইচ তামিম, ফারুক আহমেদ, আব্দুস সাত্তার পালোয়ান, শাইখ মাহাদী ও তারেক আব্দুল্লাহ শুনানিতে অংশ নেন। প্রসিকিউশনের পক্ষে মামলার পাঁচ আসামিরই সর্বোচ্চ শাস্তি দাবি করে চিফ প্রসিকিউটর আমিনুল ইসলাম বলেন, জুলাই গণঅভ্যুত্থান দমনে মারণাস্ত্র ব্যবহারে অতি উৎসাহী ছিলেন সাবেক ডিএমপি কমিশনার হাবিবুর রহমান হাবিব। তিনি ওয়্যারলেসে মারণাস্ত্র ব্যবহারের নির্দেশ দেন। তার নির্দেশে পুলিশ কর্মকর্তারা হত্যাযজ্ঞে মেতে ওঠেন।

এ মামলায় একমাত্র গ্রেপ্তার আসামি রামপুরা পুলিশ ফাঁড়ির সাবেক এএসআই চঞ্চল চন্দ্র সরকার। পলাতক রয়েছেন ডিএমপির সাবেক কমিশনার হাবিবুর রহমান, খিলগাঁও জোনের সাবেক এডিসি রাশেদুল ইসলাম, রামপুরা থানার সাবেক ওসি মশিউর রহমান ও রামপুরা থানার সাবেক এসআই তারিকুল ইসলাম ভূঁইয়া।

গত ৪ মার্চ এ মামলার রায় ঘোষণার জন্য দিন ধার্য ছিল। কিন্তু নতুন করে ডিজিটাল এভিডেন্স জমা দেওয়ার আবেদন করে প্রসিকিউশন। এরপর প্রথম সাক্ষী হিসেবে জবানবন্দি দেওয়া আমির হোসেনকে পুনরায় সাক্ষ্য দিতে হয়। গত বছরের ১৮ সেপ্টেম্বর তিনটি অভিযোগ এনে পাঁচজন আসামির বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ গঠন করে বিচার শুরুর আদেশ দেন ট্রাইব্যুনাল-১। তার আগে ৭ আগস্ট আনুষ্ঠানিক অভিযোগ দাখিল করে প্রসিকিউশন।

অভিযোগ তিনটি হলো— ১. বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সময় রামপুরা এলাকায় একটি ভবনের কার্নিশে ঝুলে থাকা আমির হোসেনকে পিস্তল দিয়ে ছয় রাউন্ড গুলি করা হয়। ২. বনশ্রী এইচ ব্লকে ছয় বছরের শিশু ঘরের ভেতরে দাদির কোলে বসেছিল। পুলিশের গুলি শিশুর মাথা ভেদ করে দাদি মায়া বেগমের পেটে লাগে। এতে মায়া ইসলাম মারা যান। শিশুটিকে সিঙ্গাপুরে চিকিৎসা দেওয়া হয়েছে। মস্তিষ্কে আঘাতের কারণে শিশুটি কথা বলতে পারে না। ৩. এ ছাড়া বনশ্রী এলাকায় পুলিশের গুলিতে শহীদ হন নাদিম নামে এক ব্যক্তি।

এ মামলায় মোট ১৩ জন সাক্ষ্য প্রদান করেন। এরমধ্যে ছয়টি গুলি খেয়ে কার্নিশে ঝুলে থাকা আমির হোসেন প্রথম সাক্ষীতে তাকে গুলি করার ঘটনা ও নিহত নাদিমের স্ত্রী মর্মস্পর্শী জবাববন্দি দেন। এছাড়া সাক্ষ্যতে শিশু মুসার মাথা ছিদ্র হয়ে দাদি মায়া ইসলামের পেটে পুলিশের গুলি লাগার পর মৃত্যুর মর্মান্তিক বর্ণনা উঠে এসেছে।

‘পুলিশ বলে লাফ দে, পরে ছয় রাউন্ড গুলিতে আমি জ্ঞান হারিয়ে ফেলি’

গুলিতে আহত তরুণ আমির হোসেন ট্রাইব্যুনালে ২০২৫ সালের অক্টোবরে তার জবানবন্দিতে বলেন, ২০২৪ সালে জুলাই আন্দোলনের সময় আমি আফতাবনগরে মামা কফিশপ নামক একটি খাবারের দোকানে চাকরি করতাম। আমি রামপুরা থানাধীন মেরাদিয়া এলাকায় আমার ফুফুর সঙ্গে থাকতাম। ১৯ জুলাই শুক্রবার জুমার নামাজের পর দোকান থেকে বাসার উদ্দেশ্যে রওনা দেই। রামপুরা খালের ওপর সাঁকো পার হয়ে মেইন রাস্তায় ওঠার পর দেখতে পাই, পুলিশ ও বিজিবির সদস্যরা আন্দোলনরত ছাত্র-জনতার ওপর গুলি চালাচ্ছে। ভয়ে আমি পাশে একটি নির্মাণাধীন ভবনের ৪র্থ তলার ছাদে ওঠে যাই। তিনজন পুলিশ আমার পিছে পিছে ছাদে উঠে আসে। পুলিশ আসতে দেখে আমি ছাদের সঙ্গে একটি রড ধরে ঝুলে থাকি। একজন পুলিশ আমাকে বলে, লাফ দে। আমি লাফ না দিয়ে রড ধরে ঝুলে থাকি। তখন ওই পুলিশ সদস্য আমাকে পিস্তল দিয়ে পরপর ৩ রাউন্ড গুলি করে। ৩টি গুলিই আমার পায়ে বিদ্ধ হয়। তারপর সে চলে যায়। আরেকজন পুলিশ এসে পিস্তল দিয়ে আরও ৩ রাউন্ড গুলি করে। সেই ৩ রাউন্ড গুলিও আমার দুই পায়ে লাগে। ছয় রাউন্ড গুলিতে আমি জ্ঞান হারিয়ে ফেলি। জ্ঞান ফিরে এলে আমি দেখতে পাই যে, ফেমাস হাসপাতালে চিকিৎসাধীন আছি। ডাক্তাররা আমার পায়ের গুলিবিদ্ধ স্থানে সেলাই ও ব্যান্ডেজ করছে। খবর পেয়ে সন্ধ্যার দিকে আমার ফুফু হাসপাতালে আসেন। অবস্থার অবনতি হওয়ায় রাত ১২টার দিকে আমাকে সেখান থেকে অ্যাম্বুলেন্সে করে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হয়। ঢাকা মেডিকেলে ৩ দিন ভর্তি থাকার পর যথাযথ চিকিৎসা না পেয়ে বাসায় চলে আসি এবং বনশ্রী এলাকার ফরাজী হাসপাতালে চিকিৎসা নেই। আমাকে গুলি করার ভিডিও কিছুদিন পরে ফেসবুকে ভাইরাল হয়। ওই ভিডিও দেখে কয়েকজন ছাত্র আমার বাসায় আসে এবং তারা আমাকে টঙ্গী আহসানিয়া হাসপাতালে চিকিৎসা করায়। সেখানে এক সপ্তাহ চিকিৎসা শেষে আমাকে জাতীয় হৃদরোগ হাসপাতালে নিয়ে আসে। গুলিতে আমার পায়ের রক্তনালি ছিঁড়ে যাওয়ায় আমার একটি অপারেশন করা হয়। সেখানে আমি এক মাস চিকিৎসাধীন ছিলাম।

এরপর আমাকে সাভার সিআরপি হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। সেখানে আমি ৩/৪ মাস ফিজিওথেরাপি ও অন্যান্য চিকিৎসা নেই। এখনও মাঝে মাঝে আমাকে সেখানে যেতে হয়। আমি আমার পায়ের আঙ্গুল ঠিকমতো নাড়াতে পারি না। পরবর্তীতে আমি জানতে পারি যে, রামপুরা থানার ওসি, এএসআই চঞ্চল ও এসআই তরিকুল আমাকে গুলি করেছিল। আরও জানতে পারি এএসআই চঞ্চল ধরা পড়েছে। এসআই তরিকুল পালিয়ে গেছে। আমাকে যারা বিনা কারণে গুলি করেছে, আমি তাদের শাস্তি চাই।

শহীদ নাদিমের স্ত্রীর মর্মস্পর্শী বর্ণনা

ট্রাইব্যুনালে স্বামী হত্যার বিচার দাবি করে জুলাই গণঅভ্যুত্থানে শহীদ নাদিম মিজানের স্ত্রী তাবাসসুম আক্তার নিহা ২০২৫ সালে দেওয়া জবানবন্দিতে বলেন, গত বছরের (২০২৪ সাল) ১৯ জুলাই তার স্বামী নাদিম জুমার নামাজ পড়তে রামপুরা থানার সামনের মসজিদে যান। বেলা আড়াইটার দিকে স্থানীয় লোকজন তার স্বামীকে গুলিবিদ্ধ-রক্তাক্ত অবস্থায় বনশ্রী এলাকার বাসায় (তাবাসসুমের বাবার বাড়ি) নিয়ে আসেন। তিনি দেখতে পান, তার স্বামীর পেট থেকে রক্ত ঝরছে। স্বামীর এই অবস্থা দেখে তিনি অজ্ঞান হয়ে যান। ৫-১০ মিনিট পর জ্ঞান ফিরলে তিনি জানতে পারেন, তার স্বামীকে স্থানীয় একটি হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। বাইরে তখন অনবরত গুলি চলছিল। তাই তিনি হাসপাতালে যেতে পারেননি। হাসপাতালে নেওয়ার পর চিকিৎসক তার স্বামীকে মৃত ঘোষণা করেন। পরে তিনি জানতে পারেন, নামাজ শেষে মসজিদ থেকে বের হওয়ার পর থানার সামনে তার স্বামীর শরীরে পুলিশ ও বিজিবির ছোড়া গুলি লাগে।

হাসপাতাল থেকে নাদিমের লাশ বাসার নিচে আনা হয় বলে জবানবন্দিতে উল্লেখ করেন তাবাসসুম। তিনি বলেন, তখন রামপুরা থানার পুলিশ লাশ নিয়ে যেতে চায়। তারা নাদিমের লাশ দোতলার বাসায় নিয়ে যান। সে সময় বাসায় ও বাসার আশপাশে অনেক আন্দোলনকারী ছাত্র-জনতা জড়ো হন। এ সময় হেলিকপ্টার থেকে বাড়ি ও ছাত্রজনতাকে লক্ষ্য করে টিয়ারশেল নিক্ষেপ করা হয়। তখন তার মা ছাদে ছিলেন। টিয়ারশেল থেকে মাকে রক্ষা করেন দুলাভাই। টিয়ারশেল ছাদে পড়ে বিস্ফোরিত হয়। তিনি (তাবাসসুম) রুমে বসে হেলিকপ্টারের আওয়াজ শুনতে পান। টিয়ারশেলের গন্ধ পান। এতে তার চোখমুখ জ্বলছিল। সেদিন রাত ১০টার দিকে অ্যাম্বুলেন্সে করে নাদিমের লাশ মিরপুর-১ নম্বরের ঈদগাহ মাঠে নেওয়া হয় বলে জবানবন্দিতে উল্লেখ করেন তাবাসুম। তিনি বলেন, জানাজা শেষে মিরপুর বুদ্ধিজীবী কবরস্থানে নাদিমের দাফন সম্পন্ন হয়।

ট্রাইব্যুনালে তাবাসসুম বলেন, আমি আমার স্বামীর হত্যার বিচার চাই। এ ঘটনার জন্য সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও গুলি ছোড়া পুলিশদের দায়ী করছি। আমার সন্তানরাও তাদের বাবার হত্যার বিচার চায়।

গুলিতে ছেলের মাথা ছিদ্র হয়ে মায়ের বুকে লাগে

রামপুরায় ১৯ জুলাই মা মায়া ইসলাম ও শিশু সন্তানের (ছেলে) গুলিবিদ্ধের ঘটনায় ব্যবসায়ী মোস্তাফিজুর রহমান ২০২৫ সালে তার জবানবন্দিতে বলেন, ২০২৪ সালের ১৯ জুলাই শুক্রবার বিকেল আনুমানিক ৩টার সময় তিনি তার বাবা ও ছেলেকে খাবার পৌঁছে দেওয়ার জন্য বাসা থেকে বের হচ্ছিলেন। ছেলে বাসিত খান মুসা আইসক্রিম খেতে চাইলে তিনি তার মা (নিহত মায়া ইসলাম) এবং ছেলেকে নিয়ে বাসার নিচে নামেন। বাসার গেটের বাইরে নামার পরই ঘটে সেই মর্মান্তিক ঘটনা।

সাক্ষী বলেন, বাসার নিচে নামার পর গেটের বাইর থেকে পুলিশের ছোড়া একটি গুলি আমার ছেলের মাথা ভেদ করে পেছন দিয়ে বের হয়ে যায়। তাৎক্ষণিকভাবে আমি আমার ছেলেকে কোলে করে পার্শ্ববর্তী ফেমাস হাসপাতালে নিয়ে যাই।

একই সঙ্গে তিনি দাবি করেন, আমি আমার বাসার গেট থেকে দেখতে পাচ্ছিলাম ওই থানার ওসি মশিউর রহমানসহ আরও কয়েকজন পুলিশ সদস্য সরাসরি গুলি করছিল।

তার বাসা থেকে রামপুরা থানা ভবন প্রায় ৭০ ফুট দূরে অবস্থিত। মুসাকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার পর মোস্তাফিজুর রহমান জানতে পারেন তার মা মায়া ইসলামও গুলিবিদ্ধ হয়েছেন। প্রতিবেশীর মাধ্যমে তিনি জানতে পারেন, যে গুলিটি তার ছেলের মাথা ভেদ করে গেছে, সেই গুলিটিই তার মায়ের পেটে লেগেছে। তাৎক্ষণিকভাবে ছেলেকে নিয়ে দ্রুত হাসপাতাল অভিমুখে রওনা হওয়ায় তিনি মায়ের গুলি লাগার বিষয়টি জানতে পারেননি। গুলিবিদ্ধ অবস্থায় প্রতিবেশীরা তার মাকে ফরাজী হাসপাতালে ভর্তি করেন। পরে মোস্তাফিজুর রহমান ফরাজী হাসপাতাল থেকে মাকে ঢাকা মেডিকেলে নেওয়ার চেষ্টা করেন। গোলাগুলির কারণে অ্যাম্বুলেন্স না পাওয়ায় এবং দেরিতে আসায় পরদিন সকালে মাকে ঢাকা মেডিকেলে আনার পর ডাক্তাররা তাকে মৃত ঘোষণা করেন। (এ সময় সাক্ষী কান্নায় ভেঙে পড়েন)।

দীর্ঘ ও ব্যয়বহুল চিকিৎসার বর্ণনা দিয়ে ব্যবসায়ী মোস্তাফিজুর রহমান জবানবন্দিতে বলেন, গুলিবিদ্ধ হওয়ায় লাশ নিতে হলে রামপুরা থানা পুলিশের অনুমতি লাগবে। পুলিশ প্রথমে লাশ দিতে রাজি না হলেও, পরে এই শর্তে রাজি হয় যে লাশ রামপুরায় নেওয়া যাবে না। পুলিশের কথামতো তার বাবা লাশ নিয়ে টাঙ্গাইলের মির্জাপুর থানায় গ্রামের বাড়িতে দাফন করেন।

সাক্ষী জানান, শিশু মুসা দীর্ঘ চিকিৎসার মধ্য দিয়ে গেছেন। ২০২৪ সালের ২৬ আগস্ট পর্যন্ত সে আইসিইউতে ভর্তি ছিল। এরপর তাকে সিএমএইচে নেওয়া হয় এবং অবস্থার অবনতি হলে তাকে সিঙ্গাপুরে চিকিৎসার জন্য পাঠানো হয়। সরকার তার চিকিৎসার সব খরচ বহন করেছে। বর্তমানে শিশু বাসিত খান মুসা এনজি-টিউবের মাধ্যমে খাবার গ্রহণ করে, তার শরীরের ডানদিক প্যারালাইজড। সে কথা বলতে পারে না বা চলাফেরাও করতে পারে না। ট্রাইব্যুনালে হুইলচেয়ারে করে আনা মুসার মাথায় গুলির ক্ষতচিহ্ন এবং চিকিৎসার সরঞ্জামাদি দৃশ্যমান ছিল।

মোস্তাফিজুর রহমান সরাসরি ওসিকে গুলি করতে দেখার দাবি করে বলেন, আমি রামপুরা থানার ওসিকে সরাসরি অস্ত্র হাতে গুলি করতে দেখেছি। সেখানে আরও অনেক পুলিশ ছিল। পরবর্তীতে জানতে পেরেছি সেখানে চঞ্চল নামে একজন পুলিশ ছিল। কান্নায় ভেঙে পড়ে তিনি বিচারকের কাছে আবেদন জানান, আমার মায়ের হত্যা এবং আমার সন্তানের এই অবস্থা করার জন্য যারা দায়ী তাদের বিচার চাই। পরে আসামিদের আইনজীবীরা সাক্ষীদের জেরা করেন।

মামলার বিবরণে জানা যায়, ২০২৪ সালের ছাত্র-জনতার আন্দোলনের সময় ১৯ জুলাই বিকেলে রামপুরায় কফিশপ থেকে কাজ শেষে বাসায় ফিরছিলেন আমির হোসেন। তার গ্রামের বাড়ি ব্রাহ্মণবাড়িয়ায়। বনশ্রী-মেরাদিয়া সড়কের দুই পাশে পুলিশ-বিজিবির গাড়ি দেখে ভয়ে প্রাণ বাঁচাতে পাশে থাকা একটি নির্মাণাধীন চারতলা ভবনের ছাদে ওঠেন তিনি। ওই সময় পুলিশও তার পিছু পিছু যায়। একপর্যায়ে জীবন বাঁচাতে ওই নির্মাণাধীন ভবনটির ছাদের কার্নিশের রড ধরে ঝুলে থাকেন আমির। কিন্তু তাকে দেখে ফেলে পুলিশ। পরে তার ওপর ছয়টি গুলি ছোড়ে এক পুলিশ সদস্য। এতে তিন তলায় পড়ে গেলে তার চিৎকারে আশপাশের লোকজন উদ্ধার করেন। এরপর বনশ্রীর একটি হাসপাতালে নেওয়া হয়। ওইদিন রাতেই তাকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালে পাঠান চিকিৎসকরা। সেখানে দীর্ঘদিন চিকিৎসা শেষে বাড়ি ফেরেন ভুক্তভোগী ওই তরুণ। এছাড়া একইদিন রামপুরার বনশ্রী এলাকায় পুলিশের গুলিতে নাদিম ও মায়া ইসলাম নিহত হন। একইসাথে মায়া ইসলামের ছয় বছর বয়সী নাতি বাসিত খান মুসা গুলিবিদ্ধ হয়। সিঙ্গাপুরে চিকিৎসা নিলেও এখনও কথা বলতে পারছে না এই শিশু।

এ ঘটনায় ভুক্তভুগী পরিবারগুলো ট্রাইব্যুনালে অভিযোগ দায়ের করে। ২০২৫ সালের ২৬ জানুয়ারি রাতে আমির হোসেনকে লক্ষ্য করে গুলি চালানো সাবেক এএসআই চঞ্চল সরকারকে খাগড়াছড়ির দীঘিনালা থেকে গ্রেপ্তার করে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউটর তানভীর হাসান জোহার নেতৃত্বাধীন ঢাকা মহানগর পুলিশের একটি দল।

২০২৫ সালের ৭ জুলাই আনুষ্ঠানিক অভিযোগ দাখিল করে প্রসিকিউশন। পরের মাসে ১০ আগস্ট তিনটি অভিযোগ আমলে নিয়ে পাঁচজনের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেন ট্রাইব্যুনাল। পরে ১ সেপ্টেম্বর পলাতক চার আসামির পক্ষে স্টেট ডিফেন্স নিয়োগ দেন ট্রাইব্যুনাল। ২৫ আগস্ট পলাতক আসামিদের ট্রাইব্যুনালে হাজিরের জন্য পত্রিকায় বিজ্ঞপ্তি প্রকাশের নির্দেশ দেওয়া হয়। গত ৩১ জুলাই চিফ প্রসিকিউটরের কার্যালয়ে এ মামলার তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল করেন তদন্ত সংস্থার কর্মকর্তারা।

২৩ অক্টোবর প্রসিকিউশনের সূচনা বক্তব্য উপস্থাপনের মাধ্যমে এ মামলার সাক্ষ্যগ্রহণ শুরু হয়। প্রথম সাক্ষী হিসেবে সাক্ষ্য দেন কার্নিশে ঝুলে থাকা গুলিবিদ্ধ হওয়া আমির হোসেন। গত ১৮ সেপ্টেম্বর হাবিবুর রহমানসহ পাঁচজনের বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ গঠন করে বিচার শুরুর আদেশ দেন ট্রাইব্যুনাল-১।

ওইদিন এএসআই চঞ্চল চন্দ্র সরকারের পক্ষে শুনানি করেন আইনজীবী সারওয়ার জাহান। আসামিকে অভিযোগ পড়ে শোনান তিনি। এরপর নিজেকে নির্দোষ দাবি করেন চঞ্চল। ১৬ সেপ্টেম্বর পলাতক চার আসামির পক্ষে শুনানি করেন রাষ্ট্রনিযুক্ত আইনজীবী আমির হোসেন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *