যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচন

পূর্বাভাস পাল্টে দিয়ে যে ৬ কারণে জয়ী হতে পারে রিপাবলিকানরা

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের জনসমর্থন কমে যাওয়া, নিত্যপণ্যের উচ্চমূল্য নিয়ে ভোটারদের উদ্বেগ এবং ইরান যুদ্ধ নিয়ে অসন্তোষ—সব মিলিয়ে নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচনে ডেমোক্র্যাটদের বড় ধরনের সাফল্যের সম্ভাবনা দেখছেন অনেক বিশ্লেষক। তবে অনুকূল রাজনৈতিক পরিস্থিতি থাকলেও কংগ্রেসে প্রত্যাশার চেয়ে বড় জয় পাওয়া দলটির জন্য কঠিন হতে পারে। নির্বাচনি আসনের সীমিত প্রতিদ্বন্দ্বিতা, সিনেটে সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জনের অনিশ্চয়তা, ভোটার উপস্থিতি এবং রিপাবলিকানদের আর্থিক সুবিধাসহ ছয়টি কারণ ডেমোক্র্যাটদের অগ্রগতির পথে বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে।

বার্তা সংস্থা রয়টার্সের সঙ্গে কথা বলা ছয়জন বিশ্লেষক ও দলীয় কৌশলবিদের মতে, ৩ নভেম্বরের নির্বাচনে ডেমোক্র্যাটরা কংগ্রেসে আসন বাড়াতে পারলেও তা বড় ধরনের নির্বাচনি ঢেউয়ে রূপ নেবে কি না, সে বিষয়ে অনিশ্চয়তা রয়েছে।

১. প্রতিনিধি পরিষদে প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ আসন কম

গত তিন দশকে মার্কিন প্রতিনিধি পরিষদের প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ আসনের সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। রাজনৈতিক মেরুকরণ এবং নির্বাচনি এলাকার সীমানা পুনর্নির্ধারণ—যার মধ্যে দলীয় সুবিধা অনুযায়ী সীমানা নির্ধারণের অভিযোগও রয়েছে—অনেক আসনকে ডেমোক্র্যাট বা রিপাবলিকানদের জন্য তুলনামূলকভাবে নিরাপদ করে তুলেছে।

বিশ্লেষকদের ধারণা, প্রতিনিধি পরিষদের মোট ৪৩৫টি আসনের মধ্যে এ বছর প্রকৃত অর্থে প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ আসন মাত্র ৪০ থেকে ৫০টি।

বেশির ভাগ বিশ্লেষক মনে করছেন, ডেমোক্র্যাটরা প্রতিনিধি পরিষদের নিয়ন্ত্রণ পুনরুদ্ধার করতে পারে। তবে তাদের সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাঁচ থেকে ২০টি আসনের মধ্যে সীমিত থাকতে পারে। ফলে ২০১৮ সালের মতো বড় সাফল্য পাওয়ার সুযোগ কম। ওই নির্বাচনে ডেমোক্র্যাটরা ৪১টি আসন বাড়িয়েছিল।

সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিনটনের উপদেষ্টা বিল গ্যালস্টন বলেন, ডেমোক্র্যাটরা ২৫টি আসন বাড়াতে পারলেও তাদের কার্যকর সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকবে, তবে তা খুব বড় হবে না।

এমন সীমিত সংখ্যাগরিষ্ঠতা প্রতিনিধি পরিষদের নিয়ন্ত্রণ ডেমোক্র্যাটদের হাতে ফিরিয়ে দিতে পারে। কিন্তু বিতর্কিত আইন পাস করা কিংবা বড় ধরনের রাজনৈতিক পরিবর্তনের পক্ষে শক্তিশালী জনসমর্থনের দাবি প্রতিষ্ঠা করা কঠিন হতে পারে।

২. সিনেটে সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিশ্চিত নয়

১০০ সদস্যের মার্কিন সিনেটে সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেতে ডেমোক্র্যাটদের নিট চারটি আসন বাড়িয়ে ৫১-৪৯ ব্যবধান তৈরি করতে হবে। দলটি কিছু আসনে ভালো ফল করতে পারে বলে ধারণা থাকলেও সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন নিশ্চিত নয়।

কারণ, ডেমোক্র্যাটদের যেসব আসন দখলের লক্ষ্য রয়েছে, তার অনেকগুলোই এমন রাজ্যে, যেখানে ২০২৪ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ট্রাম্প বড় ব্যবধানে জয় পেয়েছিলেন।

নির্দলীয় কুক পলিটিক্যাল রিপোর্টের নির্বাচন বিশ্লেষক ডেভিড ওয়াসারম্যান বলেন, ডেমোক্র্যাটদের এমন কয়েকটি রাজ্যে অগ্রগতি অর্জন করতে হবে, যেখানে ট্রাম্প দুই অঙ্কের ব্যবধানে জিতেছিলেন। জাতীয় পর্যায়ে ডেমোক্র্যাটদের পক্ষে ভোটের ব্যবধান ১০ শতাংশ পয়েন্ট বাড়লেও দলটি সিনেটে সংখ্যাগরিষ্ঠতা থেকে দুই আসন পিছিয়ে থাকতে পারে বলে তার ধারণা।

এ ছাড়া মেইন ও মিশিগানের মতো রাজ্যেও ডেমোক্র্যাটদের প্রত্যাশার তুলনায় প্রতিদ্বন্দ্বিতা কঠিন হয়ে উঠেছে।

টেনেসি বিশ্ববিদ্যালয়ের জননীতি বিভাগের অধ্যাপক ও মধ্যবর্তী নির্বাচনবিষয়ক ইতিহাসের লেখক অ্যান্ড্রু বুশ বলেন, এসব রাজ্যে রিপাবলিকানরা ডেমোক্র্যাটদের খুব কাছাকাছি অবস্থানে রয়েছে। ডেমোক্র্যাটদের পক্ষে সবকিছু ভালোভাবে এগোলে এমন পরিস্থিতি প্রত্যাশিত হতো না।

৩. ভোটার উপস্থিতি বড় নিয়ামক হতে পারে

জনমত জরিপে ডেমোক্র্যাট ভোটারদের মধ্যে নির্বাচনি উৎসাহ তুলনামূলক বেশি দেখা যাচ্ছে। তবে নির্বাচনে বেশি উৎসাহী হওয়া আর বাস্তবে ভোট দিতে যাওয়া এক বিষয় নয়।

বিশ্লেষকদের মতে, তরুণ, কৃষ্ণাঙ্গ ও হিস্পানিক ভোটারদের সমর্থন ডেমোক্র্যাটদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের তুলনায় মধ্যবর্তী নির্বাচনে এসব জনগোষ্ঠীর ভোট দেওয়ার হার ঐতিহাসিকভাবে কম থাকে।

জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি নিয়ে এসব ভোটারের মধ্যে দুই প্রধান দল সম্পর্কেই সংশয় রয়েছে। ফলে প্রত্যাশা অনুযায়ী তাদের ভোটার উপস্থিতি নিশ্চিত না হলে ডেমোক্র্যাটরা নির্বাচনে পিছিয়ে পড়তে পারে।

২০২২ সালের মধ্যবর্তী নির্বাচনে ৫০ বছর বা তার বেশি বয়সী ভোটারদের সংখ্যা ৫০ বছরের কম বয়সীদের প্রায় দ্বিগুণ ছিল। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বয়স্ক ভোটারদের একটি অংশ রিপাবলিকানদের প্রতি বেশি সমর্থন দেখিয়েছে।

তাই ডেমোক্র্যাটদের জন্য শুধু জনমত জরিপে এগিয়ে থাকা যথেষ্ট নয়; সমর্থকদের ভোটকেন্দ্রে উপস্থিত করাও বড় চ্যালেঞ্জ।

৪. নির্বাচনি প্রচারে অর্থের দিক থেকে এগিয়ে রিপাবলিকানরা

নির্বাচনি প্রচারের শেষ পর্যায়ে রিপাবলিকানরা অর্থের দিক থেকে উল্লেখযোগ্য সুবিধাজনক অবস্থানে রয়েছে। তবে গুরুত্বপূর্ণ আসনগুলোতে এখন পর্যন্ত ব্যয়ের ফল মিশ্র।

যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল নির্বাচন কমিশনে জমা দেওয়া সর্বশেষ নথি অনুযায়ী, রিপাবলিকানদের জাতীয় কমিটি ও তাদের সমর্থক কংগ্রেশনাল রাজনৈতিক অ্যাকশন কমিটিগুলোর (পিএসি) হাতে নগদ অর্থ ছিল প্রায় ৬১৪ মিলিয়ন ডলার। ডেমোক্র্যাটদের ক্ষেত্রে এই অঙ্ক প্রায় ৩৯২ মিলিয়ন ডলার।

এ ছাড়া ট্রাম্পের রাজনৈতিক সমর্থক সংগঠন এমএজিএ ইনকরপোরেটেড সুপার পিএসিও রিপাবলিকানদের প্রচারে আর্থিক সহায়তা দিচ্ছে। সেপ্টেম্বরের শুরুতে সংগঠনটির হাতে নগদ অর্থ ছিল ৪১৬ মিলিয়ন ডলার।

বিজ্ঞাপন ব্যয়ের তথ্য বিশ্লেষণকারী প্রতিষ্ঠান অ্যাডইমপ্যাক্টের হিসাব অনুযায়ী, সেপ্টেম্বরের শেষ নাগাদ সিনেটের প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ আসনগুলোতে রিপাবলিকানরা ডেমোক্র্যাটদের চেয়ে ১৮৮ মিলিয়ন ডলার বেশি বিজ্ঞাপনে ব্যয় করেছে।

অ্যান্ড্রু বুশের মতে, একটি দলের হাতে বড় আর্থিক সুবিধা থাকলে এবং নির্বাচনের শেষ মুহূর্তে প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ আসনগুলোতে অর্থ ব্যয়ের সুযোগ থাকলে তা কাছাকাছি লড়াইয়ের ফল বদলে দিতে পারে।

৫. জনমত জরিপে রিপাবলিকানদের সমর্থন কম দেখানোর নজির

সাম্প্রতিক কয়েকটি নির্বাচনে জনমত জরিপ রিপাবলিকানদের প্রকৃত সমর্থন কম দেখিয়েছে। রয়টার্স-ইপসোসের এক জরিপে নিবন্ধিত ভোটারদের মধ্যে কংগ্রেস নির্বাচনে ডেমোক্র্যাটদের পক্ষে ৪৩ শতাংশ এবং রিপাবলিকানদের পক্ষে ৩৫ শতাংশ সমর্থন দেখা গেছে।

তবে জরিপে এগিয়ে থাকা মানেই নির্বাচনে একই ব্যবধানে জয় পাওয়া নয়। অতীতের নির্বাচনের অভিজ্ঞতা থেকে বিশ্লেষকেরা বলছেন, ভোটারদের মনোভাব এবং শেষ পর্যন্ত ভোটের ফলের মধ্যে ব্যবধান থাকতে পারে।

ট্রাম্পের নাম ব্যালটে না থাকলেও তিনি সমর্থকদের নভেম্বরের নির্বাচনকে এমনভাবে বিবেচনা করতে বলেছেন, যেন তার নিজের নির্বাচন হচ্ছে। এতে রিপাবলিকান ভোটারদের উপস্থিতি ও প্রচারের ওপর প্রভাব পড়তে পারে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকদের একাংশ।

২০১৪ সালের মধ্যবর্তী নির্বাচনে রিপাবলিকানরা সিনেটে বড় জয় পেয়েছিল, কিন্তু তার আগে জনমত জরিপে দলটির শক্তি কম প্রতিফলিত হয়েছিল। বিপরীতে, ২০২২ সালের মধ্যবর্তী নির্বাচনে জরিপগুলো ডেমোক্র্যাটদের ভালো ফলের বিষয়টি যথেষ্টভাবে ধারণ করতে পারেনি।

এ অভিজ্ঞতা থেকে বোঝা যায়, জরিপে ডেমোক্র্যাটদের এগিয়ে থাকার ব্যবধানকে সরাসরি নির্বাচনি ফল হিসেবে ধরে নেওয়ার সুযোগ নেই।

৬. ডেমোক্র্যাটদের ‘সমাজতন্ত্রী’ আখ্যা দিয়ে প্রচার

ট্রাম্প ও রিপাবলিকান প্রার্থীদের অনেকে ডেমোক্র্যাটদের সমাজতন্ত্রী ও উগ্রপন্থি হিসেবে তুলে ধরছেন। তাদের বক্তব্য, ডেমোক্র্যাটদের কিছু নীতি যুক্তরাষ্ট্রের জন্য বড় হুমকি তৈরি করতে পারে।

এ ধরনের প্রচার নিয়ে উদ্বিগ্ন ডেমোক্র্যাটদের প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ আসনের কয়েকজন প্রার্থী নিজেদের পুঁজিবাদী হিসেবে পরিচয় দিচ্ছেন। তাদের আশঙ্কা, রিপাবলিকানদের এই প্রচার দোদুল্যমান ও স্বতন্ত্র ভোটারদের সিদ্ধান্তে প্রভাব ফেলতে পারে।

রিপাবলিকানরা ডেমোক্র্যাটিক সোশ্যালিস্টস অব আমেরিকা আন্দোলনের সদস্য এবং প্রগতিশীল প্রার্থীদের নির্বাচনি সাফল্যকে সামনে এনে পুরো ডেমোক্র্যাটিক পার্টিকে সমাজতন্ত্রী হিসেবে চিত্রিত করার চেষ্টা করছে। তবে চলতি বছরে দলটির প্রাথমিক নির্বাচনে এমন প্রার্থীদের মধ্যে দুই ডজনেরও কম জয় পেয়েছেন বলে রয়টার্সের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

বিল গ্যালস্টনের মতে, এ ধরনের প্রচার কিছু অনিশ্চিত ভোটারের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে এবং কাছাকাছি প্রতিদ্বন্দ্বিতার আসনগুলোতে ডেমোক্র্যাটদের সুবিধা এক থেকে দুই শতাংশ পয়েন্ট কমিয়ে দিতে পারে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *