মিয়ানমার সীমান্ত আমাদের জন্য এখন খুবই ভালনারেবল (ঝুঁকিপূর্ণ) উল্লেখ করে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেছেন, মিয়ানমার সীমান্তে নিরাপত্তা জোরদারে ১০৯ কিলোমিটার এলাকায় কাটাতারের বেড়া নির্মাণের চিন্তা করছে সরকার।
সোমবার (২০ জুলাই) বিকেলে রাজধানীর পিলখানাস্থ বিজিবি সদর দপ্তরের শহীদ ক্যাপ্টেন আশরাফ হলে বিজিবির ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে দরবার শেষে সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে তিনি এ কথা বলেন।
সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, মিয়ানমার সীমান্ত বর্তমানে বাংলাদেশের জন্য ‘অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ’। সীমান্তের ওপারে আরাকান আর্মি ও মিয়ানমারের সামরিক বাহিনীর মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে সংঘাত চলছে। এছাড়া আরএসও, আরসা এবং অন্যান্য সশস্ত্র গোষ্ঠীরও তৎপরতা রয়েছে। এসব সংঘাতের প্রভাব অনেক সময় বাংলাদেশের অভ্যন্তরে ছড়িয়ে পড়ে।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, মাদক চোরাচালান, সীমান্তের অস্থিতিশীলতা এবং ওপার থেকে ছোড়া গোলাগুলিতে বাংলাদেশি নাগরিক নিহত হওয়ার ঘটনাগুলো বিবেচনায় নিয়ে সরকার ১০৯ কিলোমিটার এলাকায় কাটাতারের বেড়া নির্মাণের প্রস্তাব করেছে। তবে বিষয়টি নিয়ে এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি।
সীমান্তে ল্যান্ডমাইনের কারণে অনেক বাংলাদেশি হতাহত হচ্ছে, এ বিষয়ে বিজিবিকে কোনো যন্ত্রপাতি দেওয়া হয়েছে কিনা জানতে চাইলে তিনি বলেন, ল্যান্ডমাইন বিস্ফোরণের ঝুঁকি মোকাবিলায় সরকার ইতোমধ্যে বিজিবিকে মাইন শনাক্তকরণ যন্ত্রপাতি সরবরাহ করেছে। বিজিবি সদস্যরা এসব যন্ত্র ব্যবহার করে কাজ করছেন, যাতে ভবিষ্যতে ল্যান্ডমাইন-সংক্রান্ত দুর্ঘটনা এড়ানো যায়।
ভারত থেকে পুশ-ইন প্রসঙ্গে এক প্রশ্নের জবাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, আমরা একজনকেও অবৈধভাবে এখানে পুশ-ইন হতে দেইনি। বিজিবি ও সীমান্তবর্তী জনগণের সহযোগিতায় এখন পর্যন্ত এ ধরনের চেষ্টা সফলভাবে প্রতিহত করা হয়েছে।
তিনি বলেন, কিছু অবৈধ অনুপ্রবেশের ঘটনা ঘটলেও সেগুলোর বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। তবে কাউকে পুশ-ইন করতে দেওয়া হয়নি।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আরও বলেন, ভারতে যদি কোনো বাংলাদেশি নাগরিক অবস্থান করে থাকেন, তাহলে তাদের তালিকা পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে পাঠাতে হবে। বাংলাদেশ জাতীয়তা যাচাই করে সত্যতা পেলে প্রচলিত আইনি প্রক্রিয়ায় তাদের দেশে ফিরিয়ে নেবে। এর বাইরে অন্য কোনো উপায়ে কাউকে গ্রহণ করা হবে না।
বিজিবি সীমান্তে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে কাজ করছে, তাদের বিশেষ পুরস্কার দেওয়ার বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, বীরত্বপূর্ণ ও সাহসিকতাপূর্ণ কাজের স্বীকৃতি হিসেবে প্রতিবছর বিজিবিকে পদক দেওয়া হয়। সাম্প্রতিক সময়ে পুশ-ইন প্রতিরোধে সাহসিকতার জন্য পদকের পাশাপাশি সনদ বা অন্যান্য প্রণোদনার ব্যবস্থা করা যায় কি না, সে বিষয়ে বিজিবির মহাপরিচালকের সঙ্গে আলোচনা করবেন বলেও জানান তিনি।
এর আগে, পিলখানাস্থ শহীদ শাকিল আহমেদ হলে আয়োজিত এক মতবিনিময় সভায় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বিজিবি সদস্যদের উদ্দেশ্যে দিক-নির্দেশনামূলক বক্তব্য প্রদান করেন। সভায় বিজিবির মহাপরিচালক মেজর জেনারেল মোহাম্মদ আশরাফুজ্জামান সিদ্দিকী, বিজিবি সদর দপ্তরের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা, জেসিও, অন্যান্য পদবির সদস্য এবং অসামরিক কর্মকর্তা-কর্মচারীরা উপস্থিত ছিলেন। এছাড়া সারাদেশে বিজিবির বিভিন্ন রিজিয়ন, সেক্টর, ব্যাটালিয়ন ও সীমান্ত ফাঁড়িতে (বিওপি) কর্মরত সদস্যরা ভিডিও টেলিকনফারেন্স (ভিটিসি)-এর মাধ্যমে অনুষ্ঠানে যুক্ত হন।
মতবিনিময়কালে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বিজিবি সদস্যদের দেশপ্রেম, সততা ও পেশাদারিত্বের সঙ্গে দায়িত্ব পালনের আহ্বান জানান। তিনি সীমান্তে সর্বোচ্চ সতর্কতা বজায় রেখে অবৈধ অনুপ্রবেশ, পুশ-ইন, মাদক, অস্ত্র ও চোরাচালান এবং মানবপাচার প্রতিরোধে আরও কার্যকর ভূমিকা পালনের নির্দেশনা দেন। একইসঙ্গে বাহিনীর শৃঙ্খলা, চেইন অব কমান্ড, পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ ও পেশাদার আচরণ বজায় রাখার ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী গুজব ও অপপ্রচার থেকে সতর্ক থেকে যাচাইকৃত তথ্যের ভিত্তিতে দায়িত্ব পালনের আহ্বান জানান এবং আধুনিক প্রযুক্তি ও গোয়েন্দা তথ্যের সর্বোত্তম ব্যবহার, সীমান্তবর্তী জনগণের আস্থা অর্জন, দুর্যোগ ও জাতীয় সংকটে মানবিক ভূমিকা পালন এবং সর্বক্ষেত্রে নিরপেক্ষতা, জবাবদিহিতা ও আইনের শাসন অনুসরণের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেন।
এসএন/পিডিকে