বিশ্বরাজনীতিতে সাম্রাজ্যের পতন খুব কম ক্ষেত্রেই হঠাৎ ঘটে। অধিকাংশ সময় পতন শুরু হয় অদৃশ্যভাবে—ক্ষমতার ভেতরে আত্মতুষ্টি, নীতিগত বিভ্রান্তি, কৌশলগত অতিবিস্তার এবং বাস্তবতা থেকে বিচ্ছিন্নতার মধ্য দিয়ে। ইতিহাসের রোমান সাম্রাজ্য থেকে ব্রিটিশ সাম্রাজ্য—প্রায় সব ক্ষেত্রেই এই সত্য প্রযোজ্য। একবিংশ শতাব্দীতে যুক্তরাষ্ট্রকে ঘিরে যে বিতর্ক, সেটিও একই প্রশ্নের মুখোমুখি দাঁড়িয়েছে: আমেরিকার বৈশ্বিক নেতৃত্ব কি শেষ হয়ে যাচ্ছে, নাকি এটি কেবল রূপান্তরিত হচ্ছে?
এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়ে আন্তর্জাতিক বিশ্লেষক ফারিদ জাকারিয়া একাধিক প্রবন্ধে গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণ করেছিলেন। তাঁর মতে,“ শীতল যুদ্ধ-পরবর্তী আমেরিকান আধিপত্যের ধীর অবসান (“the slow unraveling”) কেবল চীনের উত্থানের ফল নয়। বরং ওয়াশিংটন নিজেই নিজের শক্তিকে ক্ষয় করেছে।“ এই বক্তব্য শুধু আমেরিকার জন্য নয়, সমগ্র আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার জন্য একটি মৌলিক সতর্কবার্তা।
সাম্রাজ্যের পতন হয় বাইরের আঘাতে নয়, ভেতরের অবক্ষয়ে
রাজনৈতিক বিজ্ঞানের একটি পুরোনো ধারণা হলো— ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, কোনো পরাশক্তি শুধু প্রতিপক্ষের উত্থানে পরাজিত হয় না। প্রকৃত পতন শুরু হয় যখন সে নিজের কৌশলগত সংযম, দূরদৃষ্টি ও নীতিগত ধারাবাহিকতা হারিয়ে ফেলে। (great powers rarely collapse solely because rivals become stronger; they decline because they lose strategic discipline).
জাকারিয়ার বিশ্লেষণও মূলত এই তত্ত্বকেই নতুন ভাষায় ব্যাখ্যা করে। এক্ষেত্রে চীনের উত্থান অবশ্যই বাস্তব। রাশিয়ার প্রত্যাবর্তনও বাস্তব। ইরানসহ মধ্যপ্রাচ্যের পরিবর্তিত শক্তি-সমীকরণও বাস্তব। কিন্তু এগুলোই আমেরিকার একক দুর্বলতার কারণ নয়। বরং আরও বড় কারণ হলো যুক্তরাষ্ট্রের নিজের নীতিগত অসংগতি।
২০০৩ সালে ইরাক আক্রমণকে জাকারিয়া “imperial overreach” হিসেবে চিহ্নিত করেন। এটি ছিল এমন এক সামরিক অভিযান, যা যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক শক্তি প্রদর্শন করলেও তার নৈতিক নেতৃত্বকে গভীরভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করে। গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার নামে যুদ্ধ শুরু হলেও ফল হয় রাষ্ট্রব্যর্থতা, গৃহযুদ্ধ, জঙ্গিবাদ এবং আঞ্চলিক অস্থিতিশীলতা। সামরিক বিজয় সবসময় রাজনৈতিক বিজয় নয়—ইরাক সেই শিক্ষার সবচেয়ে বড় উদাহরণ।
বিশ্বের রূপান্তর, কিন্তু নেতৃত্বের অনীহা
জাকারিয়ার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ যুক্তি সম্ভবত অন্যত্র। তিনি বলেন, শীতল যুদ্ধ শেষে এমন একটি সময় এসেছিল যখন যুক্তরাষ্ট্রের জন্য বিশ্বব্যবস্থাকে উদার আন্তর্জাতিকতাবাদের ভিত্তিতে পুনর্গঠনের সুযোগ ছিল সবচেয়ে বেশি।
কিন্তু ঠিক সেই সময়েই আমেরিকা ক্লান্ত হয়ে পড়ে। আফগানিস্তান। ইরাক। অর্থনৈতিক সংকট। অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক মেরুকরণ। “America First” ধরনের রাজনৈতিক প্রবণতা। সব মিলিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ধীরে ধীরে বৈশ্বিক নেতৃত্ব থেকে নিজেকে আংশিক গুটিয়ে নিতে শুরু করে। জাকারিয়ার ভাষায়, আমেরিকা তখন “একজন দূরবর্তী শুভাকাঙ্ক্ষী (distant well-wisher), কিন্তু সক্রিয় বৈশ্বিক নেতৃত্বদানকারী শক্তি নয়।”
এই পর্যবেক্ষণ অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। কারণ আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে শূন্যস্থান কখনও দীর্ঘস্থায়ী হয় না। যেখানে যুক্তরাষ্ট্র পিছিয়ে যায়, সেখানে অন্য শক্তি এগিয়ে আসে।
চীনের উত্থান: বিকল্প শক্তি নাকি বিকল্প ব্যবস্থা?
আজকের বিশ্বে চীন কেবল অর্থনৈতিক শক্তি নয়। বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ (BRI), এশিয়ান ইনফ্রাস্ট্রাকচার ইনভেস্টমেন্ট ব্যাংক (AIIB), গ্লোবাল ডেভেলপমেন্ট ইনিশিয়েটিভ (GDI), গ্লোবাল সিকিউরিটি ইনিশিয়েটিভ (GSI), ডিজিটাল সিল্ক রোড—সব মিলিয়ে বেইজিং এক নতুন আন্তর্জাতিক নেটওয়ার্ক নির্মাণের চেষ্টা করছে।
অন্যদিকে BRICS-এর সম্প্রসারণ, সাংহাই সহযোগিতা সংস্থা (SCO)-এর শক্তিশালী হওয়া এবং ডলারনির্ভর আর্থিক ব্যবস্থার বিকল্প নিয়ে আলোচনা—সবই বহুমেরুকেন্দ্রিক বিশ্বব্যবস্থার লক্ষণ। এটি কেবল ক্ষমতার পরিবর্তন নয়। এটি আন্তর্জাতিক শাসনব্যবস্থার পুনর্বিন্যাস।
আমেরিকার প্রকৃত সংকট: ধারণার সাম্রাজ্য
জাকারিয়ার সবচেয়ে দূরদর্শী প্রশ্নটি সম্ভবত এটি—আমেরিকার ক্ষমতা কমলেও কি তার প্রতিষ্ঠিত নিয়ম, মূল্যবোধ এবং প্রতিষ্ঠানগুলো টিকে থাকবে?
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর যে আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার জন্ম হয়েছিল—জাতিসংঘ, বিশ্বব্যাংক, আইএমএফ, ডব্লিউটিও, মানবাধিকার, আইনের শাসন, উন্মুক্ত বাণিজ্য,মুক্ত সমুদ্রপথ—এসবের পেছনে যুক্তরাষ্ট্র ছিল প্রধান স্থপতি।
আজ প্রশ্ন হলো—আমেরিকার শক্তি কমলে কি এই প্রতিষ্ঠানগুলোরও অবক্ষয় ঘটবে? নাকি নতুন শক্তিগুলো এগুলোকে নতুন রূপে পুনর্গঠন করবে? এই প্রশ্নের উত্তর এখনও অনিশ্চিত।
ট্রাম্প যুগ ও পশ্চিমা গণতন্ত্রের সংকট
ডোনাল্ড ট্রাম্পের “America First” নীতি যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতিতে একটি মৌলিক পরিবর্তন আনে। মিত্রদের ওপর আস্থা কমে। বহুপাক্ষিকতা দুর্বল হয়। আন্তর্জাতিক চুক্তি থেকে বেরিয়ে আসার প্রবণতা বাড়ে। ফলে যুক্তরাষ্ট্রের মিত্ররাও নতুন বিকল্প খুঁজতে শুরু করে।
ইউরোপ “Strategic Autonomy” নিয়ে ভাবতে শুরু করে। মধ্যপ্রাচ্যে সৌদি আরব একই সঙ্গে ওয়াশিংটন, বেইজিং এবং মস্কোর সঙ্গে সম্পর্ক বাড়ায়। ভারতও “multi-alignment” কৌশল গ্রহণ করে। অর্থাৎ, বিশ্ব আর একক নেতৃত্বে পরিচালিত হচ্ছে না।
বাংলাদেশের জন্য শিক্ষা
বাংলাদেশের মতো মধ্যম শক্তির রাষ্ট্রের জন্য এই পরিবর্তন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ আমাদের সামনে তিনটি বাস্তবতা স্পষ্ট।
প্রথমত, বিশ্ব একক আধিপত্য থেকে বহুমাত্রিক প্রতিযোগিতার যুগে প্রবেশ করেছে।
দ্বিতীয়ত, বড় শক্তিগুলোর প্রতিযোগিতা এখন সামরিকের চেয়ে বেশি প্রযুক্তি, বাণিজ্য, সাপ্লাই চেইন, সমুদ্রপথ এবং অবকাঠামোকে কেন্দ্র করে।
তৃতীয়ত, ছোট ও মাঝারি রাষ্ট্রগুলোর জন্য কৌশলগত স্বায়ত্তশাসন (strategic autonomy) আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
বাংলাদেশের উচিত কোনো একটি শক্তির সঙ্গে একমাত্রিক সম্পর্ক গড়ে না তুলে ভারসাম্যপূর্ণ বহুমুখী কূটনীতি অনুসরণ করা।
শক্তির চেয়ে বিশ্বাসযোগ্যতা বড়
ফারিদ জাকারিয়ার লেখার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা সম্ভবত এটিই—আধিপত্য শুধু সামরিক শক্তির ওপর দাঁড়ায় না; এটি দাঁড়ায় বিশ্বাসযোগ্যতার ওপর। কোনো রাষ্ট্র যদি নিজেই নিজের ঘোষিত মূল্যবোধ অনুসরণ না করে, তবে তার নরম শক্তি (soft power) দ্রুত ক্ষয় হয়। এই বাস্তবতা কেবল যুক্তরাষ্ট্রের জন্য নয়। সব বড় শক্তির জন্য সমানভাবে প্রযোজ্য।
চীন, ভারত, ইউরোপ কিংবা ভবিষ্যতের অন্য কোনো শক্তি—যে-ই নেতৃত্ব দিক না কেন, বৈশ্বিক নেতৃত্বের মূল ভিত্তি হবে কেবল অর্থনীতি বা সামরিক শক্তি হবে না। হবে নৈতিক গ্রহণযোগ্যতা, প্রাতিষ্ঠানিক স্থিতিশীলতা এবং আন্তর্জাতিক আস্থা।
নতুন বিশ্বের সূচনা
সম্ভবত আমরা আমেরিকার পতনের যুগে নয়, বরং একটি নতুন বিশ্বব্যবস্থার জন্মযন্ত্রণার সময়ে বাস করছি। এটি “পোস্ট-আমেরিকান” বিশ্ব হতে পারে, কিন্তু “অ্যান্টি-আমেরিকান” বিশ্ব হওয়া বাধ্যতামূলক নয়।
যুক্তরাষ্ট্র এখনও বিশ্বের সবচেয়ে উদ্ভাবনী অর্থনীতি, সবচেয়ে শক্তিশালী সামরিক শক্তি এবং সর্বাধিক প্রভাবশালী বিশ্ববিদ্যালয় ও প্রযুক্তি-ব্যবস্থার অধিকারী। কিন্তু নেতৃত্বের অর্থ এখন একক কর্তৃত্ব নয়: অংশীদারিত্ব, নেটওয়ার্ক, বিশ্বাসযোগ্যতা এবং নিয়মভিত্তিক সহযোগিতা।
ফারিদ জাকারিয়ার সতর্কবার্তা তাই মূলত একটি রাজনৈতিক দর্শন। তা হলো এই যে, যেসব সাম্রাজ্য কেবল ক্ষমতার ওপর নির্ভর করে, তার পতন অনিবার্য। কিন্তু যে রাষ্ট্র ধারণা, প্রতিষ্ঠান ও বিশ্বাসযোগ্যতার ওপর নেতৃত্ব গড়ে তোলে, তার প্রভাব ক্ষমতার সীমা অতিক্রম করে দীর্ঘস্থায়ী হয়।
বাংলাদেশের মতো উদীয়মান রাষ্ট্রগুলোর জন্য এখানেই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা নিহিত। একবিংশ শতাব্দীর ভূরাজনীতিতে টিকে থাকার পথ কোনো একক শক্তির ছায়ায় হতে পারবে বলে মনে কনে না বিশেষজ্ঞরা। তা হতে পারে বহুমাত্রিক কূটনীতি, কৌশলগত ভারসাম্য, অর্থনৈতিক সক্ষমতা এবং নিয়মভিত্তিক আন্তর্জাতিক সহযোগিতার মাধ্যমে। বাস্তবে বিশ্বের শক্তির মানচিত্র বদলাচ্ছে। যে রাষ্ট্র পরিবর্তনকে অনুধাবণ করবে এবং পরিবর্তনের ভাষা বুঝতে পারে, ভবিষ্যতের আন্তর্জাতিক ব্যবস্থায় তারই অবস্থান হবে সবচেয়ে শক্তিশালী।
এসএন/পিডিকে