মায়েরা কেন জড়িয়ে পড়ছেন ডিজিটাল লড়াইয়ে

পরিবারের সাধারণ গ্রুপ চ্যাটের সঙ্গে পরিচয় থাকলেও মায়েদের গ্রুপ চ্যাট বা ‘মম চ্যাট’কে একেবারে আলাদা জগৎ মনে হতে পারে। ১০ থেকে ৪০ জন মা যখন নিজেদের সন্তানদের নিয়ে কথা বলেন, তখন ভিন্ন মত, মানসিকতা ও অগ্রাধিকারের কারণে সামান্য আলোচনাও বড় জটিলতায় রূপ নিতে পারে।

সম্প্রতি অ্যাশলেজ্যামস নামের এক কনটেন্ট ক্রিয়েটর মায়েদের একটি গ্রুপ চ্যাটের মেসেজ নিয়ে ভিডিও পোস্ট করেন। এরপর ইন্টারনেটে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়। চ্যাটে ‘মিশেল’ নামের এক মা নার্সারির অন্য অভিভাবকদের অনুরোধ করেন, তারা যেন কখনোই সন্তানদের টিফিনে ‘ওরিও’ বিস্কুট না দেন।

এই ঘটনা ‘ওরিও-গেট’ নামে পরিচিতি পায়। ভিডিওগুলোতে চ্যাটের মেসেজগুলো এআই মিউজিক অ্যাপ ‘সুনো’ দিয়ে তৈরি গানের মাধ্যমে প্রকাশ করা হয়েছে। সুনো জানিয়েছে, ওই কনটেন্ট ক্রিয়েটরের সঙ্গে তাদের চুক্তি রয়েছে। তবে ওরিওর কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, এই ভাইরাল ঘটনার পেছনে তারা নেই।

বিষয়টি এআই কিংবা বিপণন কৌশল, যাই হোক না কেন, ‘ওরিও-গেট’ মানুষের মধ্যে ব্যাপক আগ্রহ তৈরি করেছে। ২০টির বেশি পর্বে মায়েদের এই নাটকে টিফিন নিয়ে কারসাজি, স্কুলে অভিযোগ করা এবং মিশেলের বিরুদ্ধে প্রতিশোধ হিসেবে সব শিশুকে ওরিও খাওয়ানোর মতো গোপন পরিকল্পনার গল্প উঠে এসেছে। এসব রিল ইতোমধ্যে ৬০ মিলিয়নের বেশি ভিউ পেয়েছে। একই সঙ্গে এগুলো নিয়ে ব্যাপক আলোচনা ও সমালোচনাও হয়েছে।

কেন মায়েদের এসব ডিজিটাল মেসেজ এত ভাইরাল হলো? এর কারণ শুধু আলোচনার বিষয় নয়, বরং যোগাযোগের ধরনও। বার্তায় ‘হ্যালো এভরিওয়ান!’, ‘অবশ্যই!’ কিংবা অসংখ্য হাসিমুখের ইমোজি থাকলেও এর ভেতরে লুকিয়ে থাকতে পারে তীব্র ক্ষোভ।

কেউ সরাসরি বলেন না যে অন্য অভিভাবকের অন্যায্য দাবি তাকে বিরক্ত করছে। ‘মিন মমস’ উপন্যাসে লেখক এমা রোজেনব্লাম দেখিয়েছেন, নিউইয়র্ক শহরের মায়েদের নিষ্ক্রিয়-আক্রমণাত্মক আচরণ ও কৃত্রিম আন্তরিকতা কীভাবে চ্যাট গ্রুপগুলোকে নাটকে পরিণত করতে পারে।

ডিজিটাল যোগাযোগের বিস্তারের আগে মায়েদের যোগাযোগ ছিল তুলনামূলকভাবে সহজ। দেখা হলে বা ফোনে অল্প সময়ের জন্য অসন্তোষ প্রকাশ করা যেত। এখন সেই অসন্তোষ ৪০টি মেসেজের দীর্ঘ চক্রে পরিণত হতে পারে, যেখান থেকে বেরিয়ে আসার সুযোগও কম।

সম্পর্কজনিত আগ্রাসন বিষয়ে বিশেষজ্ঞ ও ক্লিনিক্যাল সাইকোলজিস্ট নোয়েল সান্টোরেলি বলেন, মায়েদের মধ্যে পরচর্চা ও প্রতিযোগিতা সবসময়ই ছিল। তবে একে অপরের সঙ্গে নিরবচ্ছিন্ন ডিজিটাল যোগাযোগের কারণে যোগাযোগের ধরন পুরোপুরি বদলে গেছে।

তিনি বলেন, আমরা একে অপরের সঙ্গে যুক্ত থাকার পরিধি অনেক বাড়িয়েছি। কিন্তু বিশ্বাস বা সমস্যা সমাধানের দক্ষতা বাড়াতে পারিনি।

অফিসিয়াল গ্রুপ চ্যাটে সবাই সাধারণত অতিরিক্ত ভদ্রতা ও মিষ্টি আচরণ বজায় রাখেন। সান্টোরেলির মতে, মায়েদের চ্যাটে এই ভুয়া ভালো ব্যবহার, হাসিমুখের ইমোজি ও বিস্ময়সূচক চিহ্ন আসলে সামাজিক অবস্থান ধরে রাখার চেষ্টা। কেউই কঠোর বা ঝামেলাবাজ মা হিসেবে পরিচিত হতে চান না।

এ ছাড়া এমন কিছু লিখে ফেলার ভয়ও থাকে, যা পরে স্ক্রিনশট নিয়ে অন্য চ্যাটে বা স্কুলে ছড়িয়ে পড়তে পারে। কিন্তু বর্তমান সময়ে অভিভাবকত্বের জন্য এসব গ্রুপ এতটাই গুরুত্বপূর্ণ যে চ্যাট ছেড়ে পুরোপুরি বেরিয়ে যাওয়াও কঠিন।

কেউ মিশেলের মতো অন্যায় দাবি করলে সান্টোরেলি সরাসরি কথা বলার পরামর্শ দিয়েছেন। যেমন কোনও হার্ট বা হাসির ইমোজি ছাড়াই সরাসরি বলা যেতে পারে, ‘দুঃখিত মিশেল, আমি আমার সন্তানকে ওরিও দেওয়া চালিয়ে যাব। কারণ এটি আমার পরিবারের জন্য সুবিধাজনক।’

তবে বেশির ভাগ মা-ই অন্য কোনও মায়ের কাছে অপ্রিয় হয়ে যাওয়ার ভয় পান। তাই অন্যায্য কোনও মেসেজে প্রতিক্রিয়া না দেখিয়ে চুপ থাকা বা বিষয়টি এড়িয়ে যাওয়াই তাদের কাছে সহজ মনে হতে পারে। কারণ কৃত্রিম ইমোজি ব্যবহারের চেয়ে কোনও প্রতিক্রিয়া না দেখানোই অনেক সময় আসল অনুভূতির প্রকাশ।

সূত্র: ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল

এসএন/পিডিকে

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *