ফ্রান্সে বড় আকারে ছড়িয়ে পড়ছে শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভ

ফ্রান্স জুড়ে কয়েক দিন ধরে চলা অস্থিরতা ও সংকট কাটানোর নানা চেষ্টা সত্ত্বেও দেশটির হাইস্কুল শিক্ষার্থীরা আন্দোলনের নতুন ধাপে প্রবেশ করতে শুরু করেছে।

দেশজুড়ে শত শত হাইস্কুলের প্রবেশপথ এক সপ্তাহেরও বেশি সময় ধরে অবরুদ্ধ করে রেখেছে কিশোর শিক্ষার্থীরা। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে দাঙ্গা পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে এবং মাঝেমধ্যেই তা সহিংস সংঘর্ষে রূপ নিচ্ছে। খবর বার্তা সংস্থা এএফপির।

আন্দোলন আরও ছড়িয়ে পড়ায় হাইস্কুল শিক্ষার্থীদের সংগঠনগুলো আজ বৃহস্পতিবার (৮ অক্টোবর) দেশব্যাপী গণজমায়েতের ডাক দেয়। তাদের সঙ্গে এবার বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর ছাত্র ইউনিয়ন যোগ দিয়েছে। রাজধানী প্যারিসে শিক্ষার্থীদের বিশাল বিক্ষোভের পরিকল্পনা করা হয়েছে এবং অন্যদিকে জাতীয় শিক্ষক সমিতি সর্বাত্মক ধর্মঘটের ডাক দিয়েছে।

বেশিরভাগ সমাবেশ ও মিছিল শান্তিপূর্ণ থাকলেও কিছু বিক্ষোভকারী অগ্নিসংযোগ এবং বাস স্টপ ভাঙচুর করেছে। অন্যদিকে পুলিশ কাঁদানে গ্যাস, লাঠি এবং ব্লাস্ট বল ব্যবহার করেছে। অধিকার রক্ষা বিষয়ক সংস্থা ও শিক্ষার্থীরা অভিযোগ তুলেছে যে, পুলিশ অতিরিক্ত ও অযৌক্তিক শক্তিপ্রয়োগ করছে।

গতকাল বুধবার সন্ধ্যায় টেলিভিশনে প্রচারিত এক ভাষণে ফ্রান্সের প্রধানমন্ত্রী সেবাস্তিয়েন লোকোর্নু অক্টোবরের শেষ নাগাদ এই সংকট সমাধানের জন্য একটি কার্যকর পরিকল্পনা উপস্থাপনের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। তরুণ বিক্ষোভকারীদের মুখোমুখি হওয়ার জন্য নিরাপত্তা বাহিনীকে ‘কোনো আদেশ দেওয়া হয়নি’ বলেও জানান তিনি। তবে, সরকারের সংকট সমাধানের আশ্বাসে অনেক শিক্ষার্থীই আশ্বস্ত হতে পারেনি।

পশ্চিমাঞ্চলীয় শহর নঁতে-র একটি মিছিল থেকে ১৭ বছর বয়সী ক্যামিল বার্তা সংস্থা এএফপি-কে বলেন, ‘আমরা মুখের কথা চাই না, আমরা বাস্তব পদক্ষেপ দেখতে চাই।’

রেনের একটি হাইস্কুলের বাইরে ১৮ বছর বয়সী হানা এএফপি-কে জানান, সে লোকোর্নুর বক্তব্যে ‘হতাস ও অসন্তুষ্ট’। তার সহপাঠী সালাইনা বলেন, ‘আমরা তার কাছে থেকে আরও কার্যকর কিছু আশা করেছিলাম।’ সরকারের পদক্ষেপের জন্য চলতি মাসের শেষ পর্যন্ত অপেক্ষা করার বিষয়ে হতাশা প্রকাশ করে সে আরও যোগ করে, ‘এটি অত্যন্ত জরুরি একটি পরিস্থিতি।’

শিক্ষার্থীদের সঙ্গে ‘আলোচনা’

সরকার নরম ও নমনীয় অবস্থান নেওয়ার চেষ্টা করায় শিক্ষামন্ত্রী এদুয়ার্দ জফ্রে প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন যে, কয়েক ঘণ্টা বা কয়েক দিনের মধ্যে অনুপস্থিত শিক্ষকদের বদলি সংক্রান্ত একটি জরুরি পরিকল্পনা প্রকাশ করা হবে। রেইমসের একটি হাইস্কুল পরিদর্শনের পর এবং শিক্ষার্থীদের সঙ্গে ‘আলোচনায়’ অংশ নেওয়ার পর তিনি এই বক্তব্য দেন।

বৃহস্পতিবার বিকেলে শিক্ষামন্ত্রী জফ্রের সঙ্গে প্রধান তিনটি ছাত্র সংগঠনের একটি নতুন বৈঠকের কথা ছিল। শিক্ষার্থীরা তাদের দাবিগুলো বাস্তবায়নে সুনির্দিষ্ট খরচের হিসাবসহ একটি প্রস্তাব তুলে ধরার জন্য সরাসরি প্রধানমন্ত্রী লোকোর্নুর সঙ্গে বৈঠকের দাবি জানিয়েছে।

১৫ থেকে ১৮ বছর বয়সী বিক্ষোভকারী শিক্ষার্থীরা অভিযোগ করেছে যে, স্কুলে পর্যাপ্ত শিক্ষক নেই, ক্লাসের সময়সূচি অতিরিক্ত চাপযুক্ত, শ্রেণিকক্ষগুলো জরাজীর্ণ এবং ভবনগুলো বাড়তে থাকা তাপমাত্রা সহ্য করার উপযোগী নয়।

ফ্রান্সের অর্থমন্ত্রী রোল্যান্ড লেসকিউর চলতি সপ্তাহে জানিয়েছেন, উত্তপ্ত রাজনৈতিক বিতর্কের মুখে থাকা ২০২৭ সালের সংকুচিত বাজেটের মধ্যেও স্কুলের বরাদ্দ বাড়ানোর দাবিগুলো বিবেচনার সুযোগ রয়েছে।

বাজেটের বর্তমান খসড়ায় প্রতিরক্ষা খাতের পর শিক্ষা খাতেই দ্বিতীয় সর্বোচ্চ বরাদ্দ বাড়ানো হয়েছে—যেখানে ১.৪ শতাংশ বৃদ্ধি করে মোট বরাদ্দ ধরা হয়েছে ৯০.৯ বিলিয়ন ইউরো।

হাইস্কুলগুলো সংস্কার ও আধুনিকায়ন অভিযান সম্পর্কে জানতে চাওয়া হলে রোল্যান্ড লেসকিউর জানান, স্কুলের অবকাঠামোগত উন্নয়নের দায়িত্ব মূলত আঞ্চলিক সরকারগুলোর ওপর বর্তায়।

শিক্ষা খাতে ফ্রান্সের সামগ্রিক খরচের চিত্রটি বেশ মিশ্র। অর্থনৈতিক সহযোগিতা ও উন্নয়ন সংস্থা ওইসিডি’র একটি প্রতিবেদনে দেখা গেছে, উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষায় ওইসিডি-র গড় খরচের তুলনায় ফ্রান্স শিক্ষার্থীপ্রতি ২৪ শতাংশ বেশি খরচ করে—তবে প্রাথমিক শিক্ষার শুরুর দিকের ধাপগুলোতে দেশটি তুলনামূলকভাবে অনেকটাই কম খরচ করে।

১৫ বছর বয়সী শিক্ষার্থীদের দক্ষতা পরিমাপের বার্ষিক সমীক্ষা পিআইএসএ-তে ফ্রান্সের সাম্প্রতিক পারফরম্যান্স ২০০০ সালে র‌্যাঙ্কিং শুরু হওয়ার পর থেকে সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে গেছে।

শিশুদের ওপর পুলিশের দমন-পীড়ন

প্যারিসের একটি হাইস্কুলে এএফপি-র সাংবাদিকরা দেখতে পান, বয়স্ক বিক্ষোভকারীরা পুলিশ এবং আন্দোলনরত কিশোর শিক্ষার্থীদের মাঝে একটি মানবঢাল বা দেয়াল তৈরি করে রেখেছেন, যেখানে কাঁধে ব্যাগ ঝুলানো তরুণ শিক্ষার্থীরা প্ল্যাকার্ড হাতে একজোট হয়ে দাঁড়িয়ে ছিল।

স্কুলের প্রবেশপথ ডাস্টবিন ও লোহার রেইল দিয়ে বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল এবং সেখানে দাঙ্গা পুলিশ ও বিক্ষোভকারীদের মধ্যে হাতাহাতির দৃশ্যও চোখে পড়ে।

দক্ষিণাঞ্চলীয় শহর তুলুসে বিক্ষোভকারী হাইস্কুল শিক্ষার্থীরা ফরাসি পতাকা ও প্ল্যাকার্ড উঁচিয়ে ধরে, যেখানে স্কুলের দেয়ালে গ্রাফিতিতে লেখা ছিল- ‘পুলিশ ফ্রান্সের শিশুদের ওপর দমন-পীড়ন চালাচ্ছে।’

আন্দোলন শুরু হওয়ার পর থেকে শত শত শিক্ষার্থী, পুলিশ এবং শিক্ষক আহত হয়েছেন এবং সাড়ে ৬ হাজারের বেশি মানুষকে আটক বা গ্রেপ্তার করা হয়েছে—যাদের অধিকাংশই অপ্রাপ্তবয়স্ক।

গত সোমবার পুলিশ একটি স্টান গ্রেনেড ছুড়লে ১৫ বছর বয়সী এক শিক্ষার্থী হাত হারায়। তবে এ ঘটনার পর সরকার এসব অস্ত্রের ব্যবহার সাময়িকভাবে স্থগিত করে।

এদিকে, সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, পুলিশ বাহিনীর অপকর্ম ও ক্ষমতার অপব্যবহারের ১৮টি অভিযোগের বিষয়ে অভ্যন্তরীণ তদন্ত শুরু করা হয়েছে।

ফ্রান্সের মধ্যপন্থি প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁর উত্তরসূরি নির্বাচনের লক্ষ্যে ২০২৭ সালে অনুষ্ঠেয় ভোটের মাত্র কয়েক মাস আগে এই গণঅস্থিরতা ছড়িয়ে পড়েছে। দুর্নীতিতে দণ্ডিত হওয়া সত্ত্বেও সাম্প্রতিক জনমত জরিপে উগ্র-ডানপন্থি প্রবীণ প্রার্থী মেরিন লি পেন বেশ ভালোভাবে এগিয়ে রয়েছেন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *