ফুটবল ইতিহাসে আধিপত্য শব্দটির সমার্থক যদি কোনো দলকে করতে হয়, তবে গত তিন দশক ধরে বিশ্ব ফুটবলের মানচিত্রে ফ্রান্সের নাম সবার ওপরে থাকবে। ১৯৯৮ সালে ঘরের মাঠে প্রথম বিশ্বজয় থেকে শুরু করে ২০১৮ সালের রাশিয়ায় সোনালী ট্রফি— ফরাসি ফুটবলের জয়রথ এখন এক অনন্য মাইলফলকের সামনে দাঁড়িয়ে।
কাতার বিশ্বকাপের ফাইনালে আর্জেন্টিনার কাছে সেই মহাকাব্যিক ও যন্ত্রণাদায়ক হারের স্মৃতি ভুলে, লে ব্লুজরা এবার উত্তর আমেরিকার বিশ্বমঞ্চে পা রাখতে যাচ্ছে তাদের ১৭তম বিশ্বকাপ মিশনে। লক্ষ্য কেবল ট্রফি পুনরুদ্ধার নয়, বরং পশ্চিম জার্মানির পর ইউরোপের মাত্র দ্বিতীয় দেশ হিসেবে টানা তিনটি বিশ্বকাপের ফাইনাল খেলার এক অবিস্মরণীয় রেকর্ড গড়া।
দিদিয়ে দেশম ও একটি যুগের অবসান
ফ্রান্সের ফুটবল ইতিহাসের প্রতিটি সোনালী পাতার সঙ্গে জড়িয়ে আছেন একজন মানুষ— দিদিয়ে দেশম। ১৯৯৮ সালের বিশ্বকাপজয়ী দলের অধিনায়কত্ব করা থেকে শুরু করে ২০১৮ সালে কোচের ভূমিকায় বিশ্বজয়। কিংবদন্তি মারিও জাগালো এবং ফ্রাঞ্জ বেকেনবাওয়ারের পর ইতিহাসের মাত্র তৃতীয় ব্যক্তি হিসেবে খেলোয়াড় ও কোচ— উভয় ভূমিকায় বিশ্বকাপ উঁচিয়ে ধরার এলিট ক্লাবের সদস্য তিনি।
আসন্ন ২০২৬ বিশ্বকাপের পর দেশম যখন ফ্রান্সের কোচের দায়িত্ব থেকে সরে দাঁড়াবেন, ততদিনে এই হট সিটে তিনি টানা ১৪টি বছর পার করে দেবেন। কাতারে রানার্স-আপ হওয়ার পর, দেশমের সামনে এবার সুযোগ রয়েছে ইতিহাসের প্রথম কোচ হিসেবে টানা তিনটি বিশ্বকাপের ফাইনালে পৌঁছানোর অনন্য রেকর্ড গড়ে নিজেকে অমর করে রাখার। উত্তর আমেরিকার এই আসর শেষে একটি বর্ণাঢ্য কোচিং ক্যারিয়ারের ইতি টানার জন্য এর চেয়ে বড় মহাকাব্যিক মঞ্চ আর কিছুই হতে পারে না।
অপরাজেয় ফ্রান্স: যেভাবে নিশ্চিত হলো ২০২৬ বিশ্বকাপের টিকিট
২০২৫ সালের ১৩ নভেম্বর, প্যারিসের বিখ্যাত পার্ক দেস প্রিন্সেসে যখন রেফারির শেষ বাঁশি বাজল, তখন ইউক্রেনকে ৪-০ ব্যবধানে গুঁড়িয়ে দিয়ে ইউরোপীয় বাছাইপর্বের ‘ডি’ গ্রুপ থেকে ২০২৬ বিশ্বকাপের টিকিট নিশ্চিত করে ফেলে ফ্রান্স। সেই রাতে অধিনায়ক কিলিয়ান এমবাপ্পে জোড়া গোল করে দেশের হয়ে নিজের ৫৫তম আন্তর্জাতিক গোল পূর্ণ করেন।
বাছাইপর্বের পুরো অভিযানে দেশমের দল ছিল এক কথায় অপ্রতিরোধ্য। ৬টি ম্যাচের একটিতেও হারের মুখ দেখেনি ফ্রান্স। কেবল আইসল্যান্ডের বিরুদ্ধে ২-২ ড্রয়ে তাদের জয়রথ সাময়িকভাবে থমকেছিল।
১৬টি গোল করে গ্রুপের সবচেয়ে শক্তিশালী আক্রমণভাগ এবং মাত্র ৪টি গোল হজম করে সবচেয়ে জমাট রক্ষণভাগের প্রমাণ দিয়েছে লে ব্লুজরা। অধিনায়ক এমবাপ্পে নিজে করেছেন ৫টি গোল, আর তাকে যোগ্য সঙ্গ দিয়েছেন ২টি করে গোল করা মাইকেল অলিস ও জিন-ফিলিপ মাতেতা।
অল-স্টার স্কোয়াড
দিদিয়ে দেশম এবারও উত্তর আমেরিকার জন্য একটি গ্যালাক্টিকো বা অল-স্টার স্কোয়াড নির্বাচন করেছেন। কিলিয়ান এমবাপ্পের সাথে আক্রমণভাগে থাকছেন উসমান ডেম্বেলে, মাইকেল অলিস এবং পিএসজির বিস্ময়বালক দেজিরে দুয়ে। এছাড়া বাছাইপর্বে দারুণ ফর্মে থাকা জিন-ফিলিপ মাতেতাও ফিরেছেন দলে।
রক্ষণে ইব্রাহিমা কোনাতে, জুল কুন্দে, উইলিয়াম সালিবা, দায়ো উপামেকানোর মতো তারকারা যেকোনো দলের আক্রমণের জন্য বড় বাধা। মিডফিল্ডে এন’গোলো কান্তে, আদ্রিয়েন রাবিও, অরেলিয়েন চুয়ামেনিরা মাঝমাঠেই ভেস্তে দেবে প্রতিপক্ষের আক্রমণ।
স্কোয়াডের শক্তি ও দুর্বলতা
এমবাপ্পে, দেম্বেলে এবং বারকোলার মতো উইঙ্গারদের কারণে কাউন্টার অ্যাটাকে ফ্রান্স এই মুহূর্তে পৃথিবীর সবচেয়ে বিপজ্জনক দল। প্রতিপক্ষ আক্রমণ করতে এসে একটু জায়গা দিলেই মুহূর্তের মধ্যে গোল করার ক্ষমতা রাখেন তাঁরা।
এই স্কোয়াডের সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো এর গভীরতা। মূল একাদশের কেউ ইনজুরিতে পড়লেও বেঞ্চে এমন সব খেলোয়াড় আছেন (যেমন: চেরকি, অলিসে বা থুরাম) যারা একাই ম্যাচের মোড় ঘুরিয়ে দিতে পারেন। এছাড়াও সালিবা, কোনাতে, উপামেকানো কিংবা মাতেতার মতো খেলোয়াড়দের শারীরিক গঠন সেট-পিস (কর্নার বা ফ্রি-কিক) থেকে গোল করতে এবং ডিফেন্ড করতে ফ্রান্সকে বিশাল সুবিধা দেবে।
তবে মাঝমাঠে একজন পিওর প্লে-মেকারের অভাবে ভুগবে ফ্রান্স। কারণ, কান্তে, চুয়ামেনি বা রাবিও— এরা সবাই ডিফেন্সিভ বা বক্স-টু-বক্স মিডফিল্ডার হিসেবে সেরা। কিন্তু জিনেদিন জিদান বা পল পগবার মতো মাঝমাঠ থেকে নিখুঁত থ্রু-পাস বা খেলা নিয়ন্ত্রণ করার মতো প্রথাগত ‘প্লে-মেকার’ বা নম্বর ১০-এর কিছুটা অভাব রয়েছে এই স্কোয়াডে। ফলে প্রতিপক্ষ যদি লো-ব্লক ডিফেন্স করে, তবে মাঝমাঠ থেকে আক্রমণ তৈরিতে বেগ পেতে হতে পারে ফ্রান্সকে।
২০২৬ বিশ্বকাপের গ্রুপ সূচি
গ্রুপ পর্বে ফ্রান্সকে লড়তে হবে তিনটি ভিন্ন মহাদেশের ভিন্ন ঘরানার শক্তির বিরুদ্ধে। ১৬ জুন নিউ ইয়র্ক নিউ জার্সি স্টেডিয়ামে আফ্রিকার দেশ সেনেগালের বিপক্ষে ম্যাচ দিয়ে বিশ্বকাপ মিশন শুরু করবে ফ্রান্স। ২২ জুন ফিলাডেলফিয়া স্টেডিয়ামে তাদের প্রতিপক্ষ এশিয়ার দেশ ইরাক। এরপর ২৬ জুন বোস্টন স্টেডিয়ামে ইউরোপের দেশ নরওয়ের বিপক্ষে খেলবে গ্রুপ পর্বের শেষ ম্যাচ।
ফ্রান্সের বিশ্বকাপ জার্নি
১৯৩০ সালে উরুগুয়েতে অনুষ্ঠিত ইতিহাসের প্রথম বিশ্বকাপেই অংশ নিয়েছিল ফ্রান্স। সমুদ্রপথে দীর্ঘ ১৩ দিনের যাত্রা শেষে মেক্সিকোকে ৪-১ ব্যবধানে হারিয়েছিল তারা। যেখানে লুসিয়েন লরেন্ট বিশ্বকাপের ইতিহাসের প্রথম গোলদাতা হওয়ার গৌরব অর্জন করেন। তখন কনজারভেটরি অব মিউজিকের দায়িত্বের কারণে দলের সঙ্গে যেতে না পারা দূর নিয়ন্ত্রিত কোচ গ্যাস্টন বারোর অধীনে ফ্রান্স প্রথম রাউন্ডেই বিদায় নিলেও, তা ছিল এক ঐতিহাসিক সূচনা।
ইতিহাস ও ঐতিহ্যের আলো-ছায়া
১৯৫৮ সালে সুইডেন বিশ্বকাপে জাস্ত ফন্টেইন এবং রেমন্ড কোপার হাত ধরে প্রথমবার তৃতীয় স্থান (পোডিয়াম) অর্জন করে ফ্রান্স। এরপর ১৯৮২ ও ১৯৮৬ সালে মিশেল প্লাতিনির জাদুতে টানা দুবার শেষ চারে জায়গা করে নেয় তারা। যার মধ্যে সেভিলে পশ্চিম জার্মানির সঙ্গে সেই শ্বাসরুদ্ধকর টাইব্রেকার হার কিংবা গুয়াদালাহারায় ব্রাজিলের বিরুদ্ধে পেনাল্টি শুটআউটের জয় ফুটবল ইতিহাসে চিরস্মরণীয়।
এরপর ১৯৯৮ সালে প্রথম বিশ্বকাপ জয়ের স্বাদ পায় ফ্রান্স। এরপরের ইতিহাসটা অবশ্য হতাশায় মোড়ানো। ২০০২ সালে ডিফেন্ডিং চ্যাম্পিয়ন হিসেবে উদ্বোধনী ম্যাচেই সেনেগালের কাছে ১-০ গোলে হেরে গ্রুপ পর্ব থেকে বিদায়, ২০০৬ সালের ফাইনালে ইতালির কাছে হার কিংবা ২০১০ সালে রেমন্ড ডোমেনেকের বিরুদ্ধে খেলোয়াড়দের বিদ্রোহ ও অনুশীলন বয়কটের জেরে গ্রুপ পর্বের তলানিতে থাকার কালো ইতিহাসও রয়েছে দলটির।
দুই কিংবদন্তির রেকর্ড ভাঙার দ্বারপ্রান্তে এমবাপ্পে
২০২৬ বিশ্বকাপটি ব্যক্তিগতভাবে কিলিয়ান এমবাপ্পের জন্য ফরাসি ফুটবলের সর্বকালের সেরা হওয়ার মঞ্চ। তিনি একই সঙ্গে দুই কিংবদন্তির রেকর্ড ভাঙার সামনে দাঁড়িয়ে আছেন।
১. জাস্ত ফন্টেইনের গোলের রেকর্ড
১৯৫৮ সালের বিশ্বকাপে ফরাসি ফরোয়ার্ড জাস্ত ফন্টেইন ৬ ম্যাচে ১৩টি গোল করেছিলেন, যা আজ পর্যন্ত এক বিশ্বকাপে সর্বোচ্চ গোলের বিশ্বরেকর্ড। তবে গত দুটি টুর্নামেন্টে ১২টি গোল (২০১৮ সালে ৪, ২০২২ সালে ৮) করা এমবাপ্পের সামনে সুযোগ রয়েছে ২০২৬ বিশ্বকাপে ফন্টেইনকে ছাড়িয়ে বিশ্বমঞ্চে ফ্রান্সের সর্বকালের সর্বোচ্চ গোলদাতা হওয়ার।
২. হুগো লরিসের ম্যাচের রেকর্ড
বিশ্বকাপের মঞ্চে ২০টি ম্যাচ খেলে সাবেক অধিনায়ক ও গোলরক্ষক হুগো লরিস ফ্রান্সের হয়ে সবচেয়ে বেশি ম্যাচ খেলার রেকর্ডের মালিক। বর্তমানে ১৪টি ম্যাচ খেলা এমবাপ্পে যদি ২০২৬ বিশ্বকাপের প্রতিটি ম্যাচ খেলেন এবং ফ্রান্স যদি সেমিফাইনাল বা তার চেয়ে বেশি দূর যেতে পারে, তবে লরিসের এই রেকর্ডটিও ভেঙে যাবে ফরাসিদের এই তারকার পায়ে।
২০২৬ বিশ্বকাপে ফ্রান্সের লক্ষ্য
২০২২ সালের কাতার বিশ্বকাপের ফাইনালটি ফ্রান্সের জন্য ছিল একটি মুদ্রার এপিঠ-ওপিঠ। এমবাপ্পের হ্যাটট্রিকের অতিমানবীয় কীর্তি সত্ত্বেও পেনাল্টি শুটআউটের ট্র্যাজেডিতে জার্সিতে তৃতীয় তারকাটি যোগ করা হয়নি তাদের। তবে ২০২৬ সালে উত্তর আমেরিকার মাটিতে দিদিয়ে দেশমের এই বিদায়ী মঞ্চে, তরুণ ও অভিজ্ঞদের মিশেলে তৈরি অল-স্টার স্কোয়াডটির লক্ষ্য ফুটবলে আরেকটি ফরাসি বিপ্লব ঘটানোর।
ফ্রান্সের বিশ্বকাপ স্কোয়াড
গোলরক্ষক : মাইক মেনিয়ান, রবিন রিসার, ব্রিস সাম্বা।
ডিফেন্ডার : লুকাস দিন, মালো গুস্তো, লুকাস হার্নান্দেজ, ইব্রাহিমা কোনাতে, জুল কুন্দে, উইলিয়াম সালিবা, দায়ো উপামেকানো, ম্যাকসেন্স লাক্রোয়া, থিও হার্নান্দেজ।
মিডফিল্ডার : এন’গোলো কান্তে, মানু কোনো, আদ্রিয়েন রাবিও, অরেলিয়েন চুয়ামেনি, ওয়ারেন জায়ের-এমেরি।
ফরোয়ার্ড : ব্র্যাডলি বারকোলা, রায়ান চেরকি, ওসমান দেম্বেলে, দেজিরে দুয়ে, কিলিয়ান এমবাপ্পে, মাইকেল ওলিসে, জ্যাঁ-ফিলিপ মাতেতা, মার্কুস থুরাম ও মাগনেস আকলিউশ।