‘পুলিশ বলে লাফ দে, পরে ছয় রাউন্ড গুলিতে আমি জ্ঞান হারিয়ে ফেলি’

২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থানে রাজধানীর রামপুরায় নির্মাণাধীন ভবনের কার্নিশে ঝুলে থাকা এক তরুণকে পুলিশের ছয়টি গুলি এবং নাদিম ও মায়া ইসলাম নামে দুজনকে হত্যাসহ তিনটি অভিযোগে সাবেক ডিএমপি কমিশনার হাবিবুর রহমানসহ পাঁচজনের বিরুদ্ধে আজ (২৮ জুন) রায় ঘোষণা করবেন আন্তর্জাতিক ট্রাইব্যুনাল।

এ মামলায় ১৩ জন সাক্ষ্য দিয়েছেন। এরমধ্যে তিনজনের জবানবন্দিতে ভবনের কার্নিশে ঝুলে থাকা এক তরুণকে পুলিশ ছয় রাউন্ড গুলির পরও অলৌকিকভাবে বেঁচে যাওয়া, ছয় বছরের শিশু বাসিত খান মুসার মাথা ভেদ করে গুলি বের হয়ে দাদী মায়া ইসলামের বুকে লেগে নিহত হওয়া এবং মসজিদ থেকে বের হওয়ার পর পুলিশের গুলিতে নাদিম নামের এক ব্যক্তি নিহতের ঘটনার মর্মান্তিক বর্ণনা উঠে এসেছে।

এরমধ্যে পুলিশের ছয় রাউন্ড গুলিতে আহত তরুণ আমির হোসেন ২০২৫ সালে ট্রাইব্যুনালে এ মামলায় দেওয়া জবানবন্দিতে বলেন, ২০২৪ সালে জুলাই আন্দোলনের সময় আমি আফতাবনগরে মামা কফিশপ নামে একটি খাবারের দোকানে চাকরি করতাম। রামপুরা থানার মেরাদিয়া এলাকায় ফুফুর সঙ্গে থাকতাম আমি। ১৯ জুলাই শুক্রবার জুমার নামাজের পর দোকান থেকে বাসার উদ্দেশে রওনা দেই। রামপুরা খালের ওপর সাঁকো পার হয়ে মেইন রাস্তায় ওঠার পর দেখতে পাই, পুলিশ ও বিজিবির সদস্যরা আন্দোলনরত ছাত্র-জনতার ওপর গুলি চালাচ্ছে। ভয়ে আমি পাশে একটি নির্মাণাধীন ভবনের চতুর্থ তলার ছাদে উঠে যাই। তিনজন পুলিশ আমার পিছে পিছে ছাদে উঠে আসে। পুলিশ আসতে দেখে আমি ছাদের সঙ্গে একটি রড ধরে ঝুলে থাকি। একজন পুলিশ আমাকে বলে, লাফ দে। আমি লাফ না দিয়ে রড ধরে ঝুলে থাকি। তখন ওই পুলিশ সদস্য আমাকে পিস্তল দিয়ে পরপর তিন রাউন্ড গুলি করে। তিনটি গুলিই আমার পায়ে বিদ্ধ হয়। তারপর সে চলে যায়। আরেকজন পুলিশ এসে পিস্তল দিয়ে আরও তিন রাউন্ড গুলি করে। সেই তিন রাউন্ড গুলিও আমার দুই পায়ে লাগে। আমি জ্ঞান হারিয়ে ফেলি। জ্ঞান ফিরে এলে আমি দেখতে পাই ফেমাস হাসপাতালে চিকিৎসাধীন আছি। ডাক্তাররা আমার পায়ের গুলিবিদ্ধ স্থানে সেলাই ও ব্যান্ডেজ করছে। খবর পেয়ে সন্ধ্যার দিকে আমার ফুফু হাসপাতালে আসেন। অবস্থার অবনতি হওয়ায় রাত ১২টার দিকে আমাকে সেখান থেকে অ্যাম্বুলেন্সে করে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হয়। ঢাকা মেডিকেলে তিন দিন ভর্তি থাকার পর যথাযথ চিকিৎসা না পেয়ে বাসায় চলে আসি এবং বনশ্রী এলাকার ফরাজী হাসপাতালে চিকিৎসা নেই। আমাকে গুলি করার ভিডিও কিছুদিন পরে ফেসবুকে ভাইরাল হয়। ওই ভিডিও দেখে কয়েকজন ছাত্র আমার বাসায় আসে এবং তারা আমাকে টঙ্গী আহসানিয়া মিশন হাসপাতালে চিকিৎসা করায়। সেখানে এক সপ্তাহ চিকিৎসা শেষে আমাকে জাতীয় হৃদরোগ হাসপাতালে নিয়ে আসে। গুলিতে আমার পায়ের রক্তনালি ছিঁড়ে যাওয়ায় আমার একটি অপারেশন করা হয়। সেখানে আমি এক মাস চিকিৎসাধীন ছিলাম।

এরপর আমাকে সাভারের সিআরপি হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। সেখানে আমি ৩-৪ মাস ফিজিওথেরাপি ও অন্যান্য চিকিৎসা নেই। এখনও মাঝে মাঝে আমাকে সেখানে যেতে হয়। আমি পায়ের আঙুল ঠিকমতো নাড়াতে পারি না। পরবর্তীতে আমি জানতে পারি যে, রামপুরা থানার ওসি, এএসআই চঞ্চল ও এসআই তরিকুল আমাকে গুলি করেছিল। আরও জানতে পারি এএসআই চঞ্চল ধরা পড়েছে। এসআই তরিকুল পালিয়ে গেছে। আমাকে যারা বিনা কারণে গুলি করেছে, আমি তাদের শাস্তি চাই। এ মামলায় একমাত্র গ্রেপ্তার আসামি রামপুরা পুলিশ ফাঁড়ির সাবেক এএসআই চঞ্চল চন্দ্র সরকার। পলাতক রয়েছেন ডিএমপির সাবেক কমিশনার হাবিবুর রহমান, খিলগাঁও জোনের সাবেক এডিসি রাশেদুল ইসলাম, রামপুরা থানার সাবেক ওসি মশিউর রহমান ও রামপুরা থানার সাবেক এসআই তারিকুল ইসলাম ভূঁইয়া।

এ ঘটনায় ভুক্তভুগী পরিবারগুলো ট্রাইব্যুনালে অভিযোগ করেন। ২০২৫ সালের ২৬ জানুয়ারি রাতে আমির হোসেনকে লক্ষ্য করে গুলি চালানো সাবেক এএসআই চঞ্চল সরকারকে খাগড়াছড়ির দীঘিনালা থেকে গ্রেপ্তার করে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউটর তানভীর হাসান জোহার নেতৃত্বাধীন ঢাকা মহানগর পুলিশের একটি দল।

২০২৫ সালের ৭ জুলাই আনুষ্ঠানিক অভিযোগ দাখিল করে প্রসিকিউশন। পরের মাসে ১০ আগস্ট তিনটি অভিযোগ আমলে নিয়ে পাঁচজনের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেন ট্রাইব্যুনাল। গত বছরের ৩১ জুলাই চিফ প্রসিকিউটরের কার্যালয়ে এ মামলার তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল করেন তদন্ত সংস্থার কর্মকর্তারা।

এর আগে ২৫ আগস্ট পলাতক আসামিদের ট্রাইব্যুনালে হাজিরের জন্য পত্রিকায় বিজ্ঞপ্তি প্রকাশের নির্দেশ দেওয়া হয়। পরে গত বছরের ১ সেপ্টেম্বর পলাতক চার আসামির পক্ষে স্টেট ডিফেন্স নিয়োগ দেন ট্রাইব্যুনাল।

২৩ অক্টোবর প্রসিকিউশনের সূচনা বক্তব্য উপস্থাপনের মাধ্যমে এ মামলার সাক্ষ্যগ্রহণ শুরু হয়। প্রথম সাক্ষী হিসেবে সাক্ষ্য দেন কার্নিশে ঝুলে থাকা গুলিবিদ্ধ আমির হোসেন। গত ১৮ সেপ্টেম্বর হাবিবুর রহমানসহ পাঁচজনের বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ গঠন করে বিচার শুরুর আদেশ দেন ট্রাইব্যুনাল-১। ওইদিন এএসআই চঞ্চল চন্দ্র সরকারের পক্ষে শুনানি করেন আইনজীবী সারওয়ার জাহান। আসামিকে অভিযোগ পড়ে শোনান তিনি। এরপর নিজেকে নির্দোষ দাবি করেন চঞ্চল। ১৬ সেপ্টেম্বর পলাতক চার আসামির পক্ষে শুনানি করেন রাষ্ট্রনিযুক্ত আইনজীবী আমির হোসেন।

মামলায় আসামিদের সর্বোচ্চ শাস্তি চেয়েছে রাষ্ট্রপক্ষ। তবে আসামিদের নির্দোষ দাবি করে ন্যায়বিচার চেয়েছেন আসামিপক্ষের আইনজীবীরা।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *