‘২০২৪ সালের ২০ জুলাই। রাজধানীর যাত্রাবাড়ি এলাকার রায়েরবাগে সন্ধ্যার সময় পুলিশ ছাত্র-জনতার ওপর এলোপাতারি গুলি ছোড়ে। পানি শোধনাগারে কাজ করা আব্দুল রহমান জিসান গুলি থেকে বাঁচতে বিদ্যুতের খুঁটির আড়ালে আশ্রয় নেয়। এ সময় কয়েক রাউন্ড গুলি তার পাশের দেয়ালে বিদ্ধ হয়। গুলি থেমে গেছে ভেবে মাথা বের করে উঁকি দিয়ে দেখাই তার জন্য কাল হলো। আরেকটা গুলি এসে তার কপালে ঢুকে মাথার পেছন দিয়ে বের হয়ে যায়। মহূর্তেই একটি পরিবারের সব স্বপ্ন শেষ! পরিবারের একমাত্র ছেলে সন্তান ছিল জিসান। জিসানের স্ত্রীও স্বামীর মৃত্যুর যন্ত্রণা সইতে না পেরে এক সপ্তাহ পর আত্মহত্যা করে নিজেকে শেষ করে দেয়’, কথাগুলো বলছিলেন জুলাই গণঅভ্যুত্থানে শহীদ জিসানের সুদান প্রবাসী বাবা বাবুল সরকার। কথা বলার সময় তিনি বারবার কান্নায় ভেঙ্গে পড়েন।
আজ রোববার (২ আগস্ট) বিকেলে যাত্রাবাড়ির নবী টাওয়ারের কনফারেন্স রুমে জুলাই গণঅভ্যুত্থানে শহীদ পরিবার ও আহতদের নিয়ে আয়োজিত গণশুনানিকালে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটরের কাছে বাবুল সরকার এসব কথা বলেন।
একইভাবে গণশুনানিতে শহীদ মিরাজের বাবা আবদুর রব বলেন, চারদিকে কাঁদানে গ্যাসের শেল, রাবার বুলেট ও গুলির শব্দে পুরো এলাকা যেন কেঁপে কেঁপে উঠছিল। তার ভাষায়, সেই দৃশ্য ছিল ‘কিয়ামতের আলামতের’ মতো। তিনি নিজের হাতে অনেকগুলো মরদেহ বহন করেছেন বলেও জানান।
গণশুনানিতে জুলাই আন্দোলনে শহীদ মিরাজের বাবা বলেন, গণআন্দোলনে যোগ দিয়ে তার ছেলে মিরাজ আর জীবিত ফিরে আসেনি। যাত্রাবাড়ি থানার পাশের একটি গলিতে গুলিবিদ্ধ হয়ে পড়ে ছিল তার লাশ।
শুনানি শেষে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর মো. আমিনুল ইসলাম শহীদ পরিবারকে সান্তনা দিয়ে বলেন, ‘আপনাদের মতো আমরাও ব্যথিত। জুলাই গণঅভ্যুত্থানে রাজধানীর যাত্রাবাড়ীতে সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের ঘটনাগুলোকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে দ্রুত তদন্ত শেষ করে বিচার কার্যক্রম সম্পন্ন করা হবে।’
এ সময় উপস্থিত ছিলেন প্রসিকিউটর শহীদুল ইসলাম, প্রসিকিউটর মইনুল করিম, ঢাকা মহানগর দক্ষিণ বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম-আহ্বায়ক নবী উল্লাহ নবী, যাত্রাবাড়ী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. রাজু, বিএনপি নেতা ফেরদৌস হোসেন রনি প্রমুখ।
চিফ প্রসিকিউটর আমিনুল ইসলাম বলেন, যাত্রাবাড়ীর ঘটনাগুলোকে জুলাই আন্দোলনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মামলাগুলোর একটি হিসেবে দেখা হচ্ছে। এসব মামলার তদন্ত দ্রুত শেষ করে যত দ্রুত সম্ভব বিচার সম্পন্ন করতে ট্রাইব্যুনাল কাজ করছে। তিনি সংশ্লিষ্ট পুলিশ কর্মকর্তাদের উদ্দেশে বলেন, থানায় থাকা তদন্ত প্রতিবেদনগুলো দ্রুত আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের তদন্ত সংস্থার কাছে হস্তান্তরের ব্যবস্থা করতে হবে, যাতে সব তদন্ত একই সংস্থার মাধ্যমে সম্পন্ন করা যায়।
শহীদ ও আহতদের পরিবারের সদস্যদের উদ্দেশে মো. আমিনুল ইসলাম বলেন, হতাশ হওয়ার কোনো কারণ নেই। প্রত্যেক শহীদ ও আহত পরিবারের ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে ট্রাইব্যুনাল সর্বোচ্চ আন্তরিকতার সঙ্গে কাজ করছে। তিনি ভুক্তভোগী পরিবারগুলোর প্রতি তদন্তে সহযোগিতার আহ্বান জানিয়ে বলেন, যাদের কাছে ভিডিও ফুটেজ, ছবি, তথ্য বা অন্য কোনো সাক্ষ্য-প্রমাণ রয়েছে, সেগুলো তদন্ত কর্মকর্তাদের কাছে জমা দিলে বিচার প্রক্রিয়া আরও দ্রুত এগিয়ে নেওয়া সম্ভব হবে।
চিফ প্রসিকিউটর জানান, গণমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদন ও ভিডিও ফুটেজ ইতোমধ্যে একাধিক মামলার তদন্ত ও বিচার কার্যক্রমে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। বিশেষ করে আবু সাঈদ হত্যা মামলায় একটি টেলিভিশন চ্যানেলের ভিডিও ফুটেজ বিচার কার্যক্রম ত্বরান্বিত করতে সহায়ক হয়েছে।
চিফ প্রসিকিউটর গণমাধ্যমকর্মীদের উদ্দেশে বলেন, জুলাই হত্যাকাণ্ড-সংক্রান্ত যেকোনো ভিডিও ফুটেজ বা তথ্য ট্রাইব্যুনালের তদন্ত সংস্থার কাছে দিলে তা বিচারিক প্রক্রিয়ায় গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ হিসেবে ব্যবহৃত হতে পারে।
এ সময় স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও রাজনৈতিক নেতাকর্মীদের প্রতিও তদন্তে সহযোগিতার আহ্বান জানিয়ে চিফ প্রসিকিউটর বলেন, যার কাছে যে তথ্য, সাক্ষ্য বা প্রমাণ রয়েছে, তা ট্রাইব্যুনালের কাছে পৌঁছে দিয়ে বিচার প্রক্রিয়াকে সহায়তা করা উচিত।
গণশুনানিতে জুলাই গণঅভ্যুত্থানে শহীদদের পরিবারের সদস্য ও আহত ব্যক্তিরা তাদের অভিজ্ঞতা, ক্ষয়ক্ষতি, বিচার প্রত্যাশা এবং রাষ্ট্রের কাছে বিভিন্ন দাবি-দাওয়া তুলে ধরেন। উপস্থিত কর্মকর্তারা তাদের বক্তব্য মনোযোগ দিয়ে শোনেন এবং ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়ার আশ্বাস দেন।
চিফ প্রসিকিউটরের কার্যালয়ের উদ্যোগে আয়োজিত এ গণশুনানিতে বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ, ভুক্তভোগী পরিবার এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা অংশ নেন। আয়োজকদের মতে, ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর বক্তব্য সরাসরি শুনে বিচারিক প্রক্রিয়ার জন্য প্রয়োজনীয় তথ্য সংগ্রহে এ গণশুনানি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। গণশুনানিতে বক্তব্য দিতে গিয়ে শহীদ পরিবারের সদস্যরা কান্নায় ভেঙে পড়েন। তারা দ্রুত বিচার, দোষীদের শাস্তি এবং ভুক্তভোগী পরিবারগুলোর নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দাবি জানান।
স্বামীর মৃত্যুর যন্ত্রণা সইতে না পেরে আত্মহত্যা শহীদ জিসানের স্ত্রীর
‘২০২৪ সালের ২০ জুলাই। রাজধানীর যাত্রাবাড়ি এলাকায় রায়েরবাগে সন্ধ্যার সময় পুলিশ ছাত্র-জনতার ওপর এলোপাতারি গুলি ছোড়ে। পানি শোধনাগারে কাজ করা আব্দুল রহমান জিসান গুলি থেকে বাঁচতে বিদ্যুতের খুঁটির আড়ালে আশ্রয় নেয়। কয়েক রাউন্ড গুলি তার পাশের দেয়ালে বিদ্ধ হয়। গুলি থেমে গেছে ভেবে মাথা বের করে উঁকি দিয়ে দেখাই তার জন্য কাল হলো। আরেকটা গুলি এসে তার কপালে ঢুকে মাথার পেছন দিয়ে বের হয়ে যায়। মহূর্তেই এক পরিবারের সব স্বপ্ন শেষ! পরিবারের একমাত্র ছেলে সন্তান ছিল জিসান। জিসানের স্ত্রীও স্বামীর মৃত্যুর যন্ত্রণা সইতে না পেরে এক সপ্তাহ পর আত্মহত্যা করে নিজেকে শেষ করে দেয়,’ কথাগুলো বলছিলেন শহীদ জিসানের সুদান প্রবাসী বাবা বাবুল সরকার। কথা বলার সময় তিনি বারবার কান্নায় ভেঙ্গে পড়েন।
শহীদ জিসানের বাবা মো. বাবুল সরকার আবেগাপ্লুত কণ্ঠে বলেন, ‘আমার ছেলে আব্দুর রহমান জিসান ২০ জুলাই সন্ধ্যা ৬টার দিকে যাত্রাবাড়ীর রায়েরবাগ এলাকায় গুলিবিদ্ধ হয়ে শহীদ হয়। গোলাগুলি থেমেছে মনে করে সে উঁকি দিলে একটি গুলি তার কপাল ভেদ করে চলে যায়। আমি চাই, আমার সন্তানসহ জুলাই গণঅভ্যুত্থানে নিহত প্রায় ১৪০০ শহীদ ও ৩০ হাজার আহতের ঘটনায় পূর্ণ বিচার হোক।’ বাবুল সরকার আরও জানান, তিনি সুদানে কর্মরত ছিলেন। তার ছেলে আন্দোলনে অংশ নিয়ে ২০ জুলাই শহীদ হন। ২২ জুলাই সন্ধ্যায় তার দাফন সম্পন্ন হয়। তিনি অভিযোগ করেন, এখনো পরিবারটি নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন। বাবুল সরকার বলেন, ‘এ হত্যাকাণ্ডের জন্য শেখ হাসিনার ফাঁসি কার্যকর করতে হবে। ডিবি হারুন, মনিরুলকে কেন আনা যাচ্ছে না? দ্রুত তদন্ত শেষ করে দায়ীদের বিচারের আওতায় আনার দাবি জানাচ্ছি।’
‘সবার সন্তান আসে আমার মিরাজ কেন ফিরে না?’
‘সবার সন্তান তাদের মায়ের বুকে ফিরে গেল। আমার সন্তান আমার বুকে এল না ২৯ বছর বয়স ছিল তার। কী অপরাধ ছিল আমার মিরাজের? দেশকে ভালোবেসে প্রতিবাদ করতে গিয়ে তার জীবন দিয়ে গেছে।’ কান্নাজড়িত কণ্ঠে কথাগুলো বলছিলেন জুলাই গণঅভ্যুত্থানে শহীদ মিরাজ হোসেনের বাবা আবদুর রব।
গণশুনানিতে ছেলের শেষ দিনের স্মৃতি তুলে ধরে আবদুর রব বলেন, মিরাজরা ১১ বন্ধু সেদিন আন্দোলনে ছিল। ৫ আগস্ট সকালে তারা মাতুয়াইল মেডিকেল থেকে আন্দোলনকে সফল করার জন্য যাত্রাবাড়ির দিকে যায়। তিনি নিজেও সেদিন ঘটনাস্থলের কাছাকাছি ছিলেন।
সেদিনের পরিস্থিতি বর্ণনা করতে গিয়ে আবদুর রব বলেন, ‘চারদিকে কাঁদানে গ্যাসের শেল, রাবার বুলেট ও গুলির শব্দে পুরো এলাকা যেন কেঁপে কেঁপে উঠছিল। তার ভাষায়, সেই দৃশ্য ছিল ‘কিয়ামতের আলামতের’ মতো। তিনি নিজের হাতে অনেকগুলো মরদেহ বহন করেছেন বলেও জানান।
শহীদ মিরাজের বাবা বলেন, তার ছেলে যাত্রাবাড়ি থানার পাশের একটি গলিতে গুলিবিদ্ধ হয়ে পড়ে ছিল।
কান্নাজড়িত কণ্ঠে মিরাজের বাবা বলেন, ‘২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থানে ৫ আগস্টের আগে ও পরে আমরা যারা সন্তান হারিয়েছি, কেউ বাবা হারিয়েছি, কেউ মা হারিয়েছি, আপনারা দেখেছেন আমার ছেলে মিরাজসহ তারা ছিল ১১ জন, আগস্ট মাসের সেই সকালে তারা সব বন্ধুরা মিলে আন্দোলনকে বেগবান করতে কী করা যায় তা নিয়ে বুদ্ধি করে মাতুয়াইল মেডিকেল হাসপাতাল থেকে ধীরে ধীরে এগিয়ে যায় যাত্রাবাড়ির দিকে… তখন সময় বিকেল সাড়ে ৩টা-পৌণে ৪টা…আমি ছিলাম কাছাকাছি এলাকায়। চারিদিকে সাইরেন..টিয়ারশেল..রাবার বুলেট.. বৃষ্টির মতো গুলি চলছিল.. সেদিন যাত্রাবাড়ি থানাটা থরথর করে ভূমিকম্পের মতো কাঁপছিল.. আমি দেখেছি রাস্তায় পড়ে থাকা মানুষ..কোনোটা জীবিত..কোনোটা মৃত… নিজের হাতে আমি.. আমি মিরাজ হত্যার বিচার চাই হত্যাকারীদের ফাঁসি চাই।’
‘সন্তান হারানোর কষ্ট ভাষায় প্রকাশ করার মতো নয়’
গণশুনানিতে শহীদ পারভেজের মা কানিজ ফাতেমা কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, ‘৫ আগস্ট আমার ছেলে পারভেজ শহীদ হয়। সন্তান হারানোর কষ্ট ভাষায় প্রকাশ করার মতো নয়। আমি শুধু চাই, আমার ছেলের হত্যার বিচার যেন হয়।’
‘বাবার কাঁধে সন্তানের লাশ বহন করার মতো কষ্ট পৃথিবীতে আর কিছু নেই’
শহীদ শাহাদাত হোসেন শাওনের বাবা মো. বাসির আলম বলেন, ‘বাবার কাঁধে সন্তানের লাশ বহন করার মতো কষ্ট পৃথিবীতে আর কিছু নেই। আমরা এই শোক নিয়ে বেঁচে আছি। যারা আমাদের সন্তানদের হত্যা করেছে, তাদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি চাই।’
‘আমার বুক খালি হয়ে গেছে’
শহীদ সোহেল রানার মা রাশেদা বেগম বলেন, ‘আমার বুক খালি হয়ে গেছে। আমি আমার সন্তান হত্যার বিচার চাই। আর কোনো মাকে যেন এভাবে সন্তান হারাতে না হয়।’
‘সব শহীদদের হত্যার বিচার চাই’
বরিশালের বাসিন্দা হলেও ধোলাইপাড়ে বসবাসকারী শহীদ মো. শাকিবের মা হেলেনা জানান, ১৮ জুলাই তার ছেলে শাকিব গুলিতে নিহত হয়। তিনি বলেন, ‘আমার সন্তানের মতো সব শহীদদের হত্যার বিচার চাই।’
রোববারের গণশুনানিতে মোট ১০৭ জন অংশ গ্রহণ করেছেন এবং যাত্রাবাড়ি এলাকায় ৮৫ জন শহীদ হয়েছেন বলে জানান চিফ প্রসিকউটর।