গাজা যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর প্রথমবারের মতো পশ্চিম তীর এবং মধ্য গাজার পৌরসভা নির্বাচনে আজ শনিবার (২৫ এপ্রিল) ভোট দিয়েছেন ফিলিস্তিনিরা। তবে ভোটারদের উপস্থিতি ছিল বেশ কম এবং রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতার ক্ষেত্রটিও ছিল সীমিত। খবর বার্তা সংস্থা এএফপির।
রামাল্লাহ-ভিত্তিক কেন্দ্রীয় নির্বাচন কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, ইসরায়েল-অধিকৃত পশ্চিম তীরে প্রায় ১৫ লাখ এবং গাজার দেইর এল-বালাহ এলাকায় ৭০ হাজার নিবন্ধিত ভোটার রয়েছেন।
ভোটগ্রহণের শুরুর দিকে পশ্চিম তীরের এল-বিরেহ এবং গাজার দেইর এল-বালাহ এলাকায় ভোটারদের উপস্থিতি ছিল খুবই কম। নির্বাচন কমিশন জানিয়েছে, সকালের শেষ ভাগ পর্যন্ত ভোটার উপস্থিতির হার ছিল মাত্র ১৫ শতাংশ, যা দুপুর ১টা নাগাদ বেড়ে দাঁড়ায় ২৪.৫৩ শতাংশে। এএফপি-র একজন সাংবাদিক জানিয়েছেন, পশ্চিম তীরের বিভিন্ন এলাকায় ভোটকেন্দ্রগুলো প্রায় ফাঁকা ছিল। এখানে বিদেশি কূটনীতিকরা ভোটগ্রহণ প্রক্রিয়া পর্যবেক্ষণ করছিলেন।
ফিলিস্তিনি সংবাদ সংস্থা ওয়াফা’র বরাত দিয়ে প্রেসিডেন্ট মাহমুদ আব্বাস এল-বিরেহ এলাকায় ভোট দেওয়ার পর সাংবাদিকদের বলেন, ‘স্থানীয় এবং আন্তর্জাতিক পর্যায়ের অনেক চ্যালেঞ্জ থাকা সত্ত্বেও আমরা গণতন্ত্রের চর্চা করতে পেরে অত্যন্ত আনন্দিত।’
৫৫ বছর বয়সী ভোটার খালিদ ঈদ এএফপি-কে বলেন, তিনি কাউন্সিল গঠনে পরিবর্তনের আশা করছেন। তিনি বলেন, ‘আমরা পুরো পরিস্থিতির পরিবর্তন করতে পারব না, তবে আমরা মানুষ পরিবর্তনের আশা করছি… যারা হয়তো আগের চেয়ে ভালো করবে এবং সমাজের উন্নয়নে সাহায্য করবে।’
তবে এই নির্বাচনের সময় নিয়ে কেউ কেউ প্রশ্ন তুলেছেন। দুরা আলকারা গ্রামের ব্যবসায়ী জিয়াদ হাসান বলেন, ‘আমরা এই সময়ে নির্বাচন চাইনি—যুদ্ধ পরিস্থিতির মধ্যে নয়, কেননা পশ্চিম তীরে বসতি স্থাপনকারীদের হামলা অব্যাহত আছে। এই সিদ্ধান্ত আমাদের ওপর চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে, তাই আমরা গ্রাম কাউন্সিলের জন্য একটি প্রশাসনিক সংস্থা নির্বাচন করতে বাধ্য হচ্ছি।’
সাম্প্রতিক মাসগুলোতে ইসরায়েলি বসতি স্থাপনকারীদের হামলা বৃদ্ধি পাওয়া একটি প্রধান উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। রামুন গ্রামের সাবেক মেয়র ৬৮ বছর বয়সী আবেদ জাবাইয়েহ বলেন, ‘প্রধান বিষয় হলো ইহুদি বসতি স্থাপনকারীদের হাত থেকে নিরাপত্তা। এজন্যই আমাদের নতুন মুখ দরকার, এমন তরুণ দরকার যারা আমাদের অধিকারের জন্য লড়াই করবে।’
এই নির্বাচনে অধিকাংশ প্রার্থীর তালিকা প্রেসিডেন্ট আব্বাসের ধর্মনিরপেক্ষ-জাতীয়তাবাদী ফাতাহ আন্দোলনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট অথবা স্বতন্ত্র প্রার্থীদের নিয়ে গঠিত।
ইউরোপীয় ইউনিয়নের অভিনন্দন
ফাতাহ-র প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বি এবং গাজার শাসক দল হামাস এই নির্বাচনে অংশ নেয়নি। অনেক পৌরসভায় ফাতাহ-সমর্থিত প্রার্থীর বিপরীতে লড়ছেন পপুলার ফ্রন্ট ফর দ্য লিবারেশন অব প্যালেস্টাইন (পিএফএলপি)-এর মতো ছোট দলগুলোর সমর্থিত স্বতন্ত্র প্রার্থীরা।
পৌর কাউন্সিলগুলো মূলত পানি, পয়নিষ্কাশন এবং স্থানীয় অবকাঠামো তদারকি করে, তবে তারা কোনো আইন প্রণয়ন করতে পারে না। ২০০৬ সাল থেকে প্রেসিডেন্ট বা সংসদীয় নির্বাচন স্থগিত থাকায় এই কাউন্সিলগুলোই এখন ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষের অধীনে থাকা সর্বশেষ গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার একটি হয়ে দাঁড়িয়েছে। বর্তমানে এই ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষ দুর্নীতি, স্থবিরতা এবং বৈধতা হ্রাসের কারণে ব্যাপক সমালোচনার মুখে রয়েছে। পশ্চিমা ও আঞ্চলিক দাতারা ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষকে আর্থিক ও কূটনৈতিক সহায়তা দেওয়ার শর্ত হিসেবে স্থানীয় শাসনব্যবস্থায় সংস্কারের দাবি জানিয়ে আসছিল। ইউরোপীয় ইউনিয়ন এই ভোটকে ব্যাপক গণতন্ত্রীকরণ এবং স্থানীয় শাসনব্যবস্থা শক্তিশালী করার পথে একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে অভিহিত করেছে।
ফিলিস্তিনিদের দৃঢ় সংকল্প
নির্বাচন কমিশন এএফপি-কে জানিয়েছে, পশ্চিম তীরে রাত ৭টায় ভোটগ্রহণ শেষ হলেও দেইর এল-বালাহ এলাকায় বিকেল ৫টায় ভোটগ্রহণ বন্ধ করা হয়, যাতে যুদ্ধবিধ্বস্ত গাজায় বিদ্যুৎহীন অবস্থায় দিনের আলোতেই ভোট গণনা করা যায়।
গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী (এই তথ্যকে জাতিসংঘ নির্ভরযোগ্য মনে করে), দুই বছরের যুদ্ধে গাজার বিশাল এলাকা ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে এবং ৭২হাজারেরও বেশি মানুষ নিহত হয়েছে। সেখানকার অবকাঠামো, পয়নিষ্কাশন এবং স্বাস্থ্য খাত কোনোমতে টিকে আছে।
২০০৭ সাল থেকে হামাসের নিয়ন্ত্রণে থাকার পর গাজায় এটিই প্রথম ভোট। কায়রোর আল-আজহার বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞানী জামাল আল-ফাদি বলেন, ‘যুদ্ধ-পরবর্তী কোনো জনমত জরিপ না থাকায় ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষ তাদের সাফল্য বা ব্যর্থতা যাচাই করার জন্য দেইর এল-বালাহ এলাকায় এই নির্বাচনের আয়োজন করেছে।’ এমন একটি এলাকা হিসেবে দেইর এল-বালাহকে বেছে নেওয়া হয়েছে যেখানে বাসিন্দাদের খুব বেশি উচ্ছেদ হতে হয়নি।
ভোট দেওয়ার পর ২৪ বছর বয়সী মোহাম্মদ আল-হাসাইনা বলেন, এই নির্বাচন অনেকাংশে প্রতীকী হলেও এটি মানুষের বেঁচে থাকার ইচ্ছার বহিঃপ্রকাশ। তিনি বলেন, ‘আমরা একটি শিক্ষিত জাতি এবং আমাদের লক্ষ্য দৃঢ়। আমরা একটি নিজস্ব রাষ্ট্র পাওয়ার যোগ্য। আমরা চাই বিশ্ব আমাদের এই যুদ্ধের ভয়াবহতা কাটিয়ে উঠতে সাহায্য করুক। অনেক যুদ্ধ হয়েছে—এখন গাজা পুনর্গঠনের কাজ করার সময়।’