কেন যুক্তরাষ্ট্র থেকে নিজেদের ১০ বিলিয়ন ডলারের স্বর্ণ সরাল নেদারল্যান্ডস

বৈশ্বিক ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনার মধ্যে নেদারল্যান্ডস তাদের ১০ বিলিয়ন ডলারের স্বর্ণের রিজার্ভ যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডা থেকে যুক্তরাজ্যে স্থানান্তর করেছে। ডাচ কেন্দ্রীয় ব্যাংক (ডিএনবি) বুধবার (২ সেপ্টেম্বর) জানায়, গুরুতর সংকটের মধ্যে আরও ভালোভাবে প্রস্তুত থাকার জন্য তারা নিজেদের স্বর্ণের রিজার্ভ স্থানান্তর করেছে। খবর আল জাজিরার।

ডাচ কেন্দ্রীয় ব্যাংক (ডিএনবি) অবশ্য নির্দিষ্ট করে কোন সংকটের জন্য তাদের প্রস্তুত থাকতে হচ্ছে, সেটি জানায়নি। তবে যুক্তরাষ্ট্র বর্তমানে কানাডার সঙ্গে তিক্ত বাণিজ্য শুল্ক যুদ্ধে লিপ্ত রয়েছে। এ ছাড়া যুক্তরাষ্ট্র ইরানে যুদ্ধ চালাচ্ছে। সাম্প্রতিক মাসগুলোতে ভেনিজুয়েলা ও কিউবার আশপাশে অভিযান পরিচালনা করেছে দেশটি।

এ ছাড়া চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে ইউরোপ ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে উত্তেজনা বেড়েছে। এ যুদ্ধে যোগ দিতে ইউরোপীয় মিত্রদের অনীহার কারণে ট্রাম্প বিভিন্ন সময়ে অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন।

এক বিবৃতিতে ডিএনবির প্রেসিডেন্ট ওলাফ স্লাইপেন বলেন, আমাদের স্বর্ণের রিজার্ভ স্থানান্তরের মাধ্যমে আমরা এটির বিনিময়যোগ্যতা বৃদ্ধি করেছি। যদিও আমরা আশা করি এগুলো ব্যবহার করার প্রয়োজন হবে না, তবুও আমাদের শক্তিশালী স্থিতিস্থাপকতা ও প্রস্তুতি রাখতে হবে।

নেদারল্যান্ডসের রিজার্ভ স্বর্ণের পরিমাণ কত?

নেদারল্যান্ডসের ৬১২ দশমিক ৪ টন স্বর্ণের রিজার্ভ রয়েছে, যার মূল্য প্রায় ৭২ দশমিক ২ বিলিয়ন ইউরো (৮৩ দশমিক ৮ বিলিয়ন ডলার)। যখন প্রচলিত আর্থিক ব্যবস্থা অচল হয়ে পড়ে বা সংকট দেখা দেয়, তখন এগুলো নিরাপত্তা হিসেবে কাজ লাগানো যায়।

ঝুঁকি বৈচিত্র্যেরকরণের প্রচলিত কৌশলের অংশ হিসেবে বিভিন্ন দেশ নিজেদের সর্বোচ্চ নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে তাদের স্বর্ণের রিজার্ভ নানা স্থানে ছড়িয়ে রাখে।

নেদারল্যান্ডস তাদের স্বর্ণের রিজার্ভ বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে রেখেছে। এর মধ্যে রয়েছে জেইস্টে তাদের নিজস্ব ক্যাশ সেন্টার এবং যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডার কেন্দ্রীয় ব্যাংক। এখনও পর্যন্ত নেদারল্যান্ডসের রিজার্ভ স্বর্ণের ৩০ দশমিক ৮ শতাংশ জাইস্টে, লন্ডনে ১৮ দশমিক ১ শতাংশ, নিউইয়র্কে ৩১ দশমিক ৩ শতাংশ ও অটোয়ায় ১৯ দশমিক ৭ শতাংশ রয়েছে।

যুক্তরাজ্যে নেদারল্যান্ডসের স্বর্ণের রিজার্ভ স্থানান্তরের পর জেইস্টে ৩০ দশমিক ৮ শতাংশ, লন্ডনে ৩২ দশমিক ১ শতাংশ, নিউইয়র্কে ১৮ দশমিক ৫ শতাংশ ও অটোয়ায় ১৮ দশমিক ৫ শতাংশ রয়েছে।

স্বর্ণ কীভাবে সরানো হয়েছে?

২০২৫ সালের শেষ নাগাদ নেদারল্যান্ডসের রিজার্ভের স্থানান্তরিত স্বর্ণের মূল্য ছিল প্রায় ১০ দশমিক ১১ বিলিয়ন ইউরো (১১ দশমিক ৭৩ বিলিয়ন ডলার)। নেদারল্যান্ডসে গত বুধবার বিকেল ৩টা পর্যন্ত এর পরিমাণ দাঁড়ায় আনুমানিক ১০ দশমিক ৩৪ বিলিয়ন ইউরো।

দুটি উপায়ে রিজার্ভ স্বর্ণের স্থানান্তর করা হয়। প্রথমটি হলো এক জায়গায় স্বর্ণ বিক্রি করে অন্য জায়গা থেকে তা কিনে। দ্বিতীয়টি হলো স্বর্ণের বার এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় সরাসরি পরিবহণ করে।

ডিএনবির তথ্যমতে,  ব্যাংকটি স্বর্ণের রিজার্ভ স্থানান্তর প্রক্রিয়া শুরু করেছিল নিউইয়র্কে প্রায় ৫৯ টন স্বর্ণ (যার মূল্য প্রায় ৮ দশমিক ৩ বিলিয়ন ডলার) বিক্রি করে এবং তারপর লন্ডনে এ স্বর্ণ কেনার মাধ্যমে। এরপর যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডা থেকে জেইস্টে ২৭ টনেরও বেশি স্বর্ণ (যার আনুমানিক মূল্য ৩ দশমিক ৮৪ বিলিয়ন ডলার) সরাসরি স্থানান্তর করা হয় এবং আন্তর্জাতিক বাজারের মানদণ্ড পূরণকারী সমপরিমাণ স্বর্ণ জেইস্ট থেকে লন্ডনে স্থানান্তর করা হয়।

সব মিলিয়ে ২০২৫ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত নিউইয়র্ক থেকে প্রায় ১০ দশমিক ৭ বিলিয়ন ডলার মূল্যের স্বর্ণ এবং অটোয়া থেকে ১ বিলিয়ন ডলারের কিছু বেশি মূল্যের স্বর্ণ সরিয়ে নেওয়া হয়েছে।

সাম্প্রতিক স্থানান্তরের কারণে ডাচ স্বর্ণের রিজার্ভ ভৌগোলিকভাবে আরও সুষম বণ্টন হয়েছে। এখন যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডা উভয়ের কাছেই ১৮ দশমিক ৫ শতাংশ করে রয়েছে।

নেদারল্যান্ডস কেন রিজার্ভ স্বর্ণ এভাবে সরিয়েছে?

ডিএনবির তথ্যমতে, স্বর্ণ স্থানান্তর এবং তা দুটি উপায়ে করার সিদ্ধান্তটি নেওয়া হয়েছে তাদের ঝুঁকি বৈচিত্র্যকরণ কৌশলের অংশ হিসেবে।

নেদারল্যান্ডসের কেন্দ্রীয় ব্যাংক এক বিবৃতিতে জানায়, ক্রয়-বিক্রয় ও ভৌত পরিবহণের প্রক্রিয়াগুলোকে একত্রিত করার ফলে ডিএনবি এ ধরনের একটি জটিল ভৌত স্বর্ণ স্থানান্তর কার্যক্রমের সঙ্গে জড়িত ঝুঁকিগুলো বণ্টন করে নিতে সক্ষম হয়েছে। একই সঙ্গে দক্ষতা ও ব্যয়-সচেতনতাও নিশ্চিত হয়েছে।

ডিএনবি আরও জানায়, তাছাড়া ভবিষ্যতে কোনো সম্ভাব্য সংকটকালে পুনরায় স্থানান্তরের প্রয়োজন হলে এবং তৎকালীন পরিস্থিতির কারণে দুটি পদ্ধতির মধ্যে কোনো একটি অসম্ভব বলে প্রমাণিত হলে, উভয় পদ্ধতির অভিজ্ঞতাই কাজে আসবে। এটি নেদারল্যান্ডসের সংকট মোকাবিলার প্রস্তুতি বাড়ানোর প্রচেষ্টার সঙ্গে সম্পৃক্ত।

নেদারল্যান্ডস কেন যুক্তরাষ্ট্র থেকে স্বর্ণ সরিয়ে নিচ্ছে?

গত মঙ্গলবার এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে ডিএনবি বলেছে, তারা তাদের স্বর্ণ যাতে ‘সহজে লেনদেনযোগ্য’ হয় তা নিশ্চিত করতে চাইছে এবং লন্ডনকে এটি রাখার জন্য একটি নিরাপদ স্থান হিসেবে বিবেচনা করছে।

ডিএনবি বলেছে, লন্ডনে রিজার্ভ স্বর্ণের একটি বড় অংশ রাখা আস্থার প্রতীক হিসেবে স্বর্ণের কার্যকারিতাকে শক্তিশালী করে। স্বর্ণকে চূড়ান্ত রিজার্ভ সম্পদ হিসেবে দেখা হয়, কারণ এটি চরম পদ্ধতিগত ঝুঁকি মোকাবেলার জন্য বিশেষভাবে উপযুক্ত। সংকটের সময় নিউইয়র্ক ও অটোয়াতে রক্ষিত রিজার্ভ স্বর্ণ দ্রুত ও সরাসরি ব্যবহার করা সম্ভব নয়।

ডিএনবি অবশ্য ব্যাখ্যা করেনি, তারা ঠিক কোন ধরনের “পদ্ধতিগত ঝুঁকি” মোকাবিলায় ব্যবস্থা নিচ্ছে। তবে নেদারল্যান্ডস কানাডার তুলনায় যুক্তরাষ্ট্র থেকে অনেক বেশি স্বর্ণ সরিয়ে নিয়েছে। বিশ্লেষকরা ধারণা করছেন, আন্তঃআটলান্টিক সম্পর্ক নিয়ে অস্থিতিশীলতার আশঙ্কা করার একাধিক কারণ থাকতে পারে।

মিডল ইস্ট কাউন্সিল অন গ্লোবাল অ্যাফেয়ার্সের অনাবাসী সিনিয়র ফেলো ফ্রেডেরিক স্নাইডার বলেছেন, নেদারল্যান্ডস অন্যান্য দেশগুলো যে কারণে স্বর্ণ ফেরত আনছে, ঠিক সেই একই কারণে তাদের স্বর্ণ সরিয়ে নিয়েছে। জার্মানি, ফ্রান্স ও ইতালিসহ বিভিন্ন দেশে ১০ বছরেরও বেশি সময় ধরে তাদের স্বর্ণ ফেরত আনার বিষয়ে আলোচনা করছে। এর মূল উদ্দেশ্য হলো তাদের স্বর্ণ ভান্ডারের ওপর বাস্তব নিয়ন্ত্রণ লাভ করা।

ফ্রেডেরিক স্নাইডার আরও বলেন, মার্কিন প্রেসিডেন্ট হিসেবে ট্রাম্পের দ্বিতীয়বার শপথ গ্রহণের পর থেকে সেই আকাঙ্ক্ষা গতি লাভ করেছে। এমনকি যুক্তরাষ্ট্রের মিত্রদের প্রতিও ট্রাম্পের ক্রমবর্ধমান যুদ্ধংদেহী ও খামখেয়ালী আচরণ এবং ডলার, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য সম্পর্ক ও আন্তর্জাতিক পেমেন্ট ব্যবস্থাকে যুক্তরাষ্ট্রের ক্রমবর্ধমান অস্ত্রায়নের ঘটনা অনেক দেশকে অত্যন্ত উদ্বিগ্ন করে তুলেছে।

রিজার্ভ স্বর্ণ সরিয়ে নেওয়ার পেছনে অন্যান্য কারণগুলো হতে পারে বাণিজ্য যুদ্ধ, সামরিক যুদ্ধ, সম্পর্কের অবনতি এবং সম্পদ জব্দ করার ক্ষেত্রে নতুন নজির সৃষ্টি।

অন্যান্য দেশগুলো কি যুক্তরাষ্ট্র থেকে স্বর্ণ সরিয়ে নিয়েছে?

চলতি বছর যুক্তরাষ্ট্র থেকে নিজেদের স্বর্ণের রিজার্ভ সরিয়ে নেওয়া নেদারল্যান্ডসই প্রথম দেশ নয়।

জানুয়ারিতে ব্যাংক ডি ফ্রান্স প্রযুক্তিগত উন্নতি এবং আরও ভালো মুনাফার প্রত্যাশাকে কারণ দেখিয়ে প্রায় ১৭ বিলিয়ন ডলারের ১২৯ টন স্বর্ণ ফ্রান্সে ফিরিয়ে নিয়েছে। এসব স্বর্ণ ২০২৫ সালের জুলাই থেকে ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংক অব নিউইয়র্কে রাখা ছিল।

২০১৩ থেকে ২০১৭ সালের মধ্যে জার্মানি তাদের জাতীয় রিজার্ভ সুরক্ষিত করতে নিউইয়র্ক থেকে ফ্রাঙ্কফুর্টে ৬০০ টনেরও বেশি স্বর্ণ (যার মূল্য প্রায় ৭৭ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলার) স্থানান্তর করেছে।

বিশ্বের শীর্ষ স্বর্ণ মজুতকারী ১০ দেশ  

৮ হাজার ১০০ টনেরও বেশি স্বর্ণের বিশাল মজত নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র তালিকার শীর্ষে অবস্থান করছে। ইতালি, চীন ও রাশিয়া—এই তিনটি দেশের প্রত্যেকের কাছে দুই হাজার টনেরও বেশি স্বর্ণের মজুত রয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্র : ৮ হাজার ১৩৩ দশমিক ৪ টন

ইতালি : ২ হাজার ৪৫১ দশমিক ৮ টন

চীন : ২ হাজার ৩১৩ দশমিক ৪ টন

রাশিয়া : ২ হাজার ৩০৪ দশমিক ৭ টন

ভারত : ৮৮০ দশমিক ৫ টন

জাপান : ৮৪৫ দশমিক ৯ টন

পোল্যান্ড : ৫৮১ দশমিক ৬ টন

তুরস্ক : ৫৩৪ দশমিক ৮ টন

উজবেকিস্তান : ৪১৫ দশমিক ৫ টন

কাজাখস্তান : ৩৫৩ দশমিক ৫ টন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *