উচ্চ রক্তচাপ বা হাইপারটেনশনকে ‘নীরব ঘাতক’ বলা হয়, কারণ এটি অনেক সময় কোনো দৃশ্যমান লক্ষণ ছাড়াই ধীরে ধীরে হৃদ্যন্ত্র, মস্তিষ্ক, কিডনি ও রক্তনালীর মারাত্মক ক্ষতি করতে পারে।
দক্ষিণ এশিয়াসহ বিশ্বের কোটি কোটি মানুষ প্রতিদিন চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী রক্তচাপের ওষুধ সেবন করেন এবং খাবারে অতিরিক্ত লবণ কমানোর চেষ্টা করেন।
তবুও অনেকের ক্ষেত্রে রক্তচাপ ১৪০/৯০ মিমি পারদের নিচে নামতে চায় না। এমন পরিস্থিতিতে অনেকেই বংশগত কারণ বা ওষুধের কার্যকারিতাকে দায়ী করলেও বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই জীবনযাত্রার কিছু সাধারণ ভুল অভ্যাস রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে বড় বাধা হয়ে দাঁড়ায়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে শুধু ওষুধ খাওয়াই যথেষ্ট নয়। প্রতিদিনের খাদ্যাভ্যাস, ঘুম, মানসিক চাপ, শারীরিক কার্যকলাপ এবং সঠিক নিয়মে রক্তচাপ পরিমাপ—এসব বিষয়ও সমান গুরুত্বপূর্ণ। জীবনযাত্রায় ছোট ছোট পরিবর্তন আনতে পারলে ওষুধের কার্যকারিতা বাড়ে এবং দীর্ঘমেয়াদে হৃদ্যন্ত্র ও রক্তনালীর স্বাস্থ্য ভালো রাখা সম্ভব হয়।
দৈনন্দিন জীবনের ৫ ভুলে বাড়ে রক্তচাপ
প্রক্রিয়াজাত ও প্যাকেটজাত খাবারের অতিরিক্ত সোডিয়াম
রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে না থাকার অন্যতম কারণ হলো প্রক্রিয়াজাত ও প্যাকেটজাত খাবারের অতিরিক্ত সোডিয়াম। অনেকেই মনে করেন শুধু কাঁচা লবণ খাওয়া বন্ধ করলেই ঝুঁকি কমে যায়। কিন্তু বাস্তবে পাউরুটি, ইনস্ট্যান্ট নুডুলস, প্যাকেটজাত স্যুপ, আচার, সস, চিপস, পাপড় ও বিভিন্ন ধরনের প্রক্রিয়াজাত খাবারে প্রচুর পরিমাণে সোডিয়াম থাকে। এসব খাবার শরীরে অতিরিক্ত পানি ধরে রাখে, ফলে রক্তনালীর ওপর চাপ বেড়ে যায় এবং রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে রাখা কঠিন হয়ে পড়ে। তাই খাবারের পুষ্টিগুণের লেবেল দেখে সোডিয়ামের পরিমাণ যাচাই করার পরামর্শ দেন বিশেষজ্ঞরা।
পটাশিয়ামের ঘাটতি
এ ছাড়া শরীরে পটাশিয়ামের ঘাটতিও রক্তচাপ বৃদ্ধির একটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ হতে পারে। পটাশিয়াম কিডনির মাধ্যমে অতিরিক্ত সোডিয়াম শরীর থেকে বের করে দিতে সাহায্য করে এবং রক্তনালীর পেশিকে শিথিল রাখে। তাই প্রতিদিনের খাদ্যতালিকায় শাকসবজি, ফলমূল ও পূর্ণশস্য রাখার পরামর্শ দেওয়া হয়। তবে যাদের কিডনির সমস্যা রয়েছে, তারা চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া অতিরিক্ত পটাশিয়াম গ্রহণ করবেন না।
নিয়মিত রক্তচাপ মাপলেও সঠিক নিয়ম না মানা
অনেক মানুষ বাড়িতে ডিজিটাল মেশিনে নিয়মিত রক্তচাপ মাপলেও সঠিক নিয়ম না মানার কারণে ভুল ফলাফল পান। সিঁড়ি ভেঙে ওঠার পরপরই, মানসিক চাপের মধ্যে কিংবা পা ক্রস করে বসে রক্তচাপ মাপলে স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি রিডিং আসতে পারে। সঠিক ফল পাওয়ার জন্য রক্তচাপ মাপার আগে অন্তত পাঁচ মিনিট বিশ্রাম নেওয়া, পিঠে সাপোর্ট দিয়ে বসা, পা মেঝেতে সমানভাবে রাখা এবং হাত হৃদ্যন্ত্রের সমান উচ্চতায় রাখার পরামর্শ দেওয়া হয়। পাশাপাশি রক্তচাপ মাপার সময় কথা বলা বা মোবাইল ব্যবহার না করাই ভালো।
দীর্ঘদিনের মানসিক চাপ
বিশেষজ্ঞদের মতে, দীর্ঘদিনের মানসিক চাপও উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে বড় বাধা। কর্মক্ষেত্রের চাপ, পারিবারিক সমস্যা বা দীর্ঘস্থায়ী উদ্বেগের কারণে শরীরে কর্টিসল ও অ্যাড্রেনালিনের মতো স্ট্রেস হরমোনের নিঃসরণ বেড়ে যায়। এসব হরমোন হৃদ্স্পন্দন বাড়িয়ে দেয় এবং রক্তনালী সংকুচিত করে, ফলে রক্তচাপ দীর্ঘ সময় উঁচু থাকে। তাই নিয়মিত ব্যায়াম, ধ্যান, পর্যাপ্ত বিশ্রাম এবং মানসিক চাপ কমানোর অভ্যাস গড়ে তোলার পরামর্শ দেওয়া হয়।
রাতে পর্যাপ্ত ঘুম না হওয়া
রাতে পর্যাপ্ত ঘুম না হওয়াও উচ্চ রক্তচাপের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ। গভীর ঘুমের সময় স্বাভাবিকভাবেই রক্তচাপ কিছুটা কমে যায়, যা হৃদ্যন্ত্র ও রক্তনালীকে বিশ্রাম নেওয়ার সুযোগ দেয়। কিন্তু নিয়মিত ছয় ঘণ্টার কম ঘুম হলে এই স্বাভাবিক প্রক্রিয়া ব্যাহত হয়। ফলে স্নায়ুতন্ত্র অতিরিক্ত সক্রিয় থাকে এবং দীর্ঘমেয়াদে রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে সমস্যা দেখা দেয়। তাই প্রতিদিন পর্যাপ্ত ও মানসম্মত ঘুম নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্বারোপ করছেন বিশেষজ্ঞরা।
বিশেষজ্ঞদের মতে, উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে শুধু ওষুধের ওপর নির্ভর করলে চলবে না। স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস, নিয়মিত শারীরিক ব্যায়াম, মানসিক চাপ নিয়ন্ত্রণ, পর্যাপ্ত ঘুম এবং চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী নিয়মিত রক্তচাপ পর্যবেক্ষণ—এসব বিষয় একসঙ্গে অনুসরণ করলেই ভালো ফল পাওয়া সম্ভব। ওষুধ সেবনের পরও দীর্ঘদিন রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে না এলে চিকিৎসকের পরামর্শ নিয়ে প্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষা করানো উচিত।
সূত্র: এনডিটিভি লাইফ
এসএন/পিডিকে