এনসিপিতে অস্থিরতা, কী করছেন দলছুট নেতারা

জুলাই আন্দোলন থেকে গড়ে ওঠা রাজনৈতিক দল জাতীয় নাগরিক পার্টি-এনসিপিতে সম্পৃক্ত বেশিরভাগ নেতাকর্মীই তারুণ্যের প্রতিনিধি। বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনেও রাজপথে তাদের সক্রিয় ভূমিকা ছিল। প্রতিষ্ঠার এক বছরের মাথায় জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশগ্রহণ করে প্রত্যাশার বাইরে সাফল্য পেয়েছে দলটি। ২৯টি আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে ৬টি আসনে জয়লাভ এবং ২টি সংরক্ষিত আসন নিয়ে সংসদে সরব উপস্থিতি রয়েছে এনসিপির। তবে সম্প্রতি দলটির ভেতরে এক ধরনের অস্থিরতা বিরাজ করছে বলে রাজনৈতিক মহলে আলোচনা হচ্ছে। চলছে বহিষ্কার ও পদত্যাগের ঘটনাও। যারা চলে গেছেন বা বহিষ্কার হয়েছেন, তারাই-বা কে কী করছেন, এমন কৌতূহলও আছে রাজনৈতিক অঙ্গনে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এনসিপির কয়েকজন নেতা বাংলা ট্রিবিউনকে জানান, ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের আগে-পরে যারা দল ছেড়ে চলে গেছেন, তারা আরেকটি প্ল্যাটফর্ম গড়তে চান। মূলত মতাদর্শগত জায়গা থেকেই এমন পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে। প্রশ্ন উঠেছে, চলে যাওয়া নেতাদের ফিরিয়ে আনার ব্যাপারে কোনও উদ্যোগ নেওয়া হবে কিনা? আর সেসব নেতার বর্তমান রাজনৈতিক অবস্থানই-বা কী? এ নিয়েও বিতর্ক হচ্ছে।

জানতে চাইলে এনসিপির সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক সামান্তা শারমিন বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘‘কতিপয় নেতার দল থেকে সরে যাওয়ার কারণ ব্যাখ্যা দেবেন দলীয় হাইকমান্ড। আবার তাদের ফিরিয়ে আনার চেষ্টা হচ্ছে কিনা, তাও তারাই বলতে পারবেন। তবে আমার পর্যবেক্ষণ হলো—অনেকে দলে আসেন এক ধরনের আদর্শ ধারণ করে। আসার পর এর ব্যত্যয় দেখলে তো তাদের জন্য থাকা কঠিন হয়ে পড়ে।’’

তিনি বলেন, ‘‘আমার মনে হয় মতাদর্শগত কারণে অনেকে সরে গেছেন। আবার এটাও ঠিক যে কেউ কেউ হয়তো এসেছিলেন নিজেদের স্বার্থসিদ্ধির জন্য। কিন্তু তা অর্জন করতে পারেননি বলে শেষ পর্যন্ত তারা টিকে থাকতে পারেননি।’’

পদত্যাগ-বহিষ্কার অব্যাহত

এনসিপি থেকে বড় ধরনের পদত্যাগের ঘটনা ঘটে ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচনের আগে। মূলত জামায়াতের সঙ্গে জোট গঠনের সিদ্ধান্তের কারণে কেন্দ্র থেকে তৃণমূল পর্যন্ত পদত্যাগের হিড়িক পড়ে তখন। এ বিষয়ে অনেকে ফেসবুকে স্ট্যাটাস দিয়ে জানান— মতাদর্শগত কারণে তারা এ দলের সঙ্গে সম্পর্কের ইতি টানতে চান। তখন কয়েকজন দলে থাকলেও নিষ্ক্রিয় হয়ে যান। আবার একই কারণ দেখিয়ে নির্বাচনের পরেও সরে গেছেন কেউ কেউ।

কেন্দ্রীয় নেতাদের মধ্যে পদত্যাগ করেন যুগ্ম আহ্বায়ক পদে থাকা ডা. তাজনূভা জাবিন, ডা. খালেদ সাইফুল্লাহ, হাসান আলী, যুগ্ম সদস্য সচিব ডা. তাসনিম জারা, মুশফিক উস সালেহীন, যুগ্ম মুখ্য সমন্বয়ক খান মুহাম্মদ মুরসালীন, আইসিটি সেলের প্রধান ফরহাদ আলম ভূঁইয়া, সদস্য আল আমিন আহমেদ টুটুল, দক্ষিণাঞ্চলের যুগ্ম প্রধান সংগঠক ইমান সৈয়দ, কৃষক বিষয়ক মুখ্য সমন্বয়ক  আজাদ খান ভাসানী এবং সর্বশেষ গত ১৮ মে বিকালে পদত্যাগের ঘোষণা দেন দলের ঢাকা মহানগর উত্তরের সদস্য সচিব সর্দার আমিরুল ইসলাম। তবে মধ্যরাতে পাল্টা বিজ্ঞপ্তি দিয়ে তাকে বহিষ্কারের কথা জানায় এনসিপি।

অপরদিকে গত ১৫ মে চট্টগ্রাম মহানগর আহ্বায়ক কমিটি ঘোষণার দেড় ঘণ্টার মাথায় সংবাদ সম্মেলনে প্রথমে চার শীর্ষ নেতা পদত্যাগের ঘোষণা দেন। শীর্ষ নেতাদের বিরুদ্ধে পদ বাণিজ্য, মামলা বাণিজ্য ও নারী কেলেঙ্কারির অভিযোগ এনে সরে যাওয়ার ঘোষণা দেন এই নেতারা। এর পরদিন ১৬ মে সকালে আরও ১৮ জনসহ মোট ২২ জন একই সিদ্ধান্তের কথা জানান।

এর আগে গত ৯ মার্চ  দলের আদর্শিক অবস্থানের সঙ্গে মতের অমিলের কথা উল্লেখ করে পদত্যাগের ঘোষণা দেন রাঙামাটি উপজেলার জুরাছড়ি উপজেলা এনসিপির আহ্বায়ক অসিম চাকমাসহ ৮৭ নেতাকর্মী। এর বাইরেও বেশ কয়েকটি জেলার নেতারা দল থেকে চলে যাওয়ার ঘোষণা দেন।

পদত্যাগের পাশাপাশি প্রতিষ্ঠার ১৫ মাসে শৃঙ্খলা ভঙ্গের দায়ে বেশ কয়েকজন নেতাকে বহিষ্কার করেছে  এনসিপি।

এর মধ্যে ২০২৫ সালের ৫ নভেম্বর কেন্দ্রীয় সংগঠক মুনতাসীর মাহমুদকে দল থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে। সর্বশেষ গত ১৬ মে দলীয় শৃঙ্খলা ভঙ্গ এবং সংবেদনশীল ও গুরুত্বপূর্ণ তথ্য গোপনের মতো গুরুতর অপরাধের অভিযোগে দলের চট্টগ্রাম মহানগর কমিটির সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক মনজুর এলাহী কাশ্মিরকে বহিষ্কার করেছে দলটি। এর বাইরেও জেলা, মহানগর ও উপজেলা পর্যায়ে বহিষ্কারের খড়গে পড়েন বেশ কয়েক নেতা।

কী করছেন চলে যাওয়া নেতারা

এনসিপি থেকে বের হয়ে যাওয়ার পর প্রত্যেক নেতাই জানিয়েছিলেন, তাদের নতুন কোনও রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্মে দেখা যাবে। সে অনুযায়ী কেউ কেউ বিভিন্ন প্ল্যাটফর্মে সক্রিয় রয়েছেন। আবার কেউবা নতুন রাজনৈতিক মঞ্চ তৈরির কাজ করছেন বলে জানিয়েছেন।

এনসিপির যুগ্ম আহ্বায়ক ডা. খালেদ সাইফুল্লাহ ও তার স্ত্রী দলের যুগ্ম সদস্য সচিবের পদ থেকে ইস্তফা দেওয়া ডা. তাসনিম জারা এখন পর্যন্ত কোনও দলে যোগ দেননি। যোগ দেবেন কিনা তাও জানা যায়নি। তাসনিম জারা গত নির্বাচনে ঢাকা-৯ আসন থেকে স্বতন্ত্র প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে প্রায় অর্ধলাখের মতো ভোট পেয়েছিলেন।  

নির্বাচনের পর গত ৭ মার্চ সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের তথ্য উপদেষ্টা মাহফুজ আলমের উদ্যোগে ‘অলটারনেটিভস’ নামে একটি নতুন রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্মের আত্মপ্রকাশ ঘটে। ১৭ সদস্যের ন্যাশনাল অর্গানাইজিং কমিটিতে স্থান পান এনসিপি থেকে পদত্যাগ করা তিন নেতা। এর মধ্যে তাজনূভা জাবীন ও হাসান আলী এনসিপির সাবেক যুগ্ম আহ্বায়ক এবং ইমান সৈয়দ দলটির দক্ষিণ অঞ্চলের সাবেক যুগ্ম প্রধান সংগঠক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছিলেন। এ বিষয়ে জানতে চাইলে তাজনূভা জাবীন সম্প্রতি বাংলা ট্রিবিউনকে জানান, তারা অলটারনেটিভসকে সামনে রেখে কাজ করছেন। ইতোমধ্যে তাদের ২২টির বেশি জেলা কমিটি গঠন হয়েছে।

আর শৃঙ্খলা ভঙ্গের দায়ে গত বছরের অক্টোবরে প্রথমে প্রাথমিক ও ৫ নভেম্বর স্থায়ী অব্যাহতি পান কেন্দ্রীয় সংগঠক ও নোয়াখালী অঞ্চলের তত্ত্বাবধায়ক মুনতাসীর মাহমুদ। পরবর্তীকালে গত ১১ ডিসেম্বর নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজ থেকে এনসিপি নেতাদের সমালোচনা করে পোস্ট দেন। এ সময় তিনি তৃণমূল এনসিপি গঠন করবেন বলে জানান। এ নিয়ে অনুসারীদের নিয়ে রাজধানীতে কয়েকটি মিছিলও করেছেন। শেষ পর্যন্ত তিনি আর সামনে এগোয়নি। যদিও ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচনে ‘ছড়ি’ প্রতীক নিয়ে ঢাকা-১২ আসন থেকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন। অবশ্য মুনতাসীর মাহমুদ দাবি করেন— শেষ পর্যন্ত তিনি  প্রতিদ্বন্দ্বিতা না করে জামায়াতের বর্তমান এমপি সাইফুল আলম খান মিলনের পক্ষে কাজ করেছেন।

বুধবার (২০ মে) বাংলা ট্রিবিউনকে তিনি বলেন, ‘‘জুলাই আন্দোলনের প্রতিনিধিত্বকারী দল হিসেবে এনসিপির প্রতি দেশের মানুষের এক ধরনের প্রত্যাশা ছিল। তাই অনেকে তাদের সঙ্গে যুক্ত হয়েছিলেন। তবে তারা অনেক ক্ষেত্রে আশা ভঙ্গ করেছেন।’’  মুনতাসীর জানান, সে সময় শীর্ষ কয়েকজন নেতার অনিয়ম-দুর্নীতির প্রতিবাদ করায় আমাকে শোকজ নোটিশ দেওয়া হয়। পরে আমিও আর সে দলে থাকার প্রয়োজনীয়তা অনুভব করিনি। সবার আগে বাংলাদেশকে ধারণ করা তরুণদের নিয়ে নতুন প্ল্যাটফর্ম গঠনের কাজ চলছে বলে তিনি জানান।

নির্বাচনের আগে চলতি বছরের ১ জানুয়ারি এনসিপির যুগ্ম সদস্য সচিব ও মিডিয়া সেলের সম্পাদক পদসহ দল থেকে পদত্যাগ করেন মুশফিক উস সালেহীন। তিনিও জামায়াতের সঙ্গে জোট করা নিয়ে মতাদর্শগত বিরোধ থেকে সরে যান বলে জানা গেছে।

বাংলা ট্রিবিউনকে তিনি জানান, আপাতত কোনও রাজনৈতিক দলে যুক্ত হননি। তবে দুই জোটের বাইরে তারা বিকল্প রাজনৈতিক মঞ্চ প্রতিষ্ঠার কাজ করছেন। এটি অনেকটাই এগিয়েছে। মূলত আমাদের মতো তরুণদের মধ্যে ক্লিন ইমেজধারীদের নিয়েই এ পরিকল্পনা। শিগগিরই এ ব্যাপারে চূড়ান্ত রূপরেখা জানানো হবে বলে জানান মুশফিক উস সালেহীন।

শীর্ষ নেতৃত্বের দৃষ্টিভঙ্গি

বিভিন্ন সময় এনসিপি থেকে চলে যাওয়া বা বহিষ্কৃত নেতাদের দলে ফিরিয়ে আনা হবে কিনা সম্প্রতি এ ধরনের আলোচনা চলছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক নেতা জানান, প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকে থাকা নেতাদের চলে যাওয়া নিয়ে ভাবছে শীর্ষ নেতৃত্ব। তাই তাদের ব্যাপারে এক ধরনের উদার দৃষ্টিভঙ্গি রয়েছে। তারা চাইলে ফিরে আসতে পারবেন।

এ বিষয়ে এনসিপির যুগ্ম আহ্বায়ক অ্যাডভোকেট জাবেদ রাসিন বুধবার (২০ মে) বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘‘এ ধরনের কেউ যদি ফিরে আসতে চান, তাদের জন্য আমাদের দরজা সব সময় খোলা। তবে আমাদের পক্ষ থেকে কাউকে ফিরিয়ে আনার বিষয়ে কোনও উদ্যোগ নেওয়া হয়নি।’’

এসএন/পিডিকে

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *