অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে বাংলাদেশের ঐতিহাসিক জয়

শক্তি-সামর্থ্য, অতীত ইতিহাস, টেস্ট ক্রিকেটের ঐতিহ্য, আইসিসি র‌্যাঙ্কিং ও সাম্প্রতিক পারফরম্যান্স—সব বিচারেই বাংলাদেশের চেয়ে যোজন যোজন এগিয়ে অস্ট্রেলিয়া। এমনকি বিশ্বসেরা দলগুলোও ক্যাঙ্গারুদের মাটিতে খেলতে গিয়ে দিশেহারা হয়ে পড়ে। তবে ইতিহাস গড়তে হলে অতীতের সব রেকর্ডই যে পেছনে ফেলে আসতে হয়, বাংলাদেশ ঠিক তা-ই করে দেখাল। টানা চারদিন অসিদের অহংকার চূর্ণ করে দাপুটে ক্রিকেট উপহার দিয়েছে টাইগাররা।

ম্যাচের তৃতীয় দিনেই নাজমুল হোসেন শান্তর দল পাচ্ছিল জয়ের সুবাস। চতুর্থ দিনে জয়টা কত দ্রুত ধরা দেয়, সেটাই ছিল দেখার বিষয়। ঐতিহাসিক জয়ের ক্ষুধায় উন্মুখ মেহেদী হাসান মিরাজ ও হাসান মাহমুদরা কোনো আত্মতুষ্টিতে ভোগেননি, বরং অসিদের ছুঁড়ে দেওয়া সব চ্যালেঞ্জ দারুণভাবে মোকাবিল করে অনবদ্য এক পারফরম্যান্স উপহার দিয়েছেন। আর তাতেই ধরা দিল ঐতিহাসিক সাফল্য—অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে প্রথম টেস্ট জয়ের ইতিহাস লিখল বাংলাদেশ।

আজ শনিবার (১৬ আগস্ট) জয়ের জন্য বাংলাদেশের সামনে লক্ষ্য ছিল ৫৭ রানের। ১৪.২ ওভারে ১ উইকেট হারিয়েই সেই লক্ষ্যে পৌঁছে যায় বাংলাদেশ। বাংলাদেশ জয় তুলে নিয়েছে ৯ উইকেটে।

এর আগে নিজেদের প্রথম ইনিংসে ১৯৮ রানে অলআউট হয়েছিল অস্ট্রেলিয়া। বিপরীতে, নিজেদের প্রথম ইনিংসে বাংলাদেশ করেছিল ৪২৬ রান। এরপর নিজেদের দ্বিতীয় ইনিংসে অস্ট্রেলিয়া তুলতে পেরেছিল ২৮৪ রান।

সহজ জয়ের লক্ষ্যে নেমে শুরুতেই ধাক্কা খেয়েছিল বাংলাদেশ। কোনো রান না করেই ফিরে যান আগের ইনিংসে সেঞ্চুরি করা ওপেনার তানজিদ হাসান তামিম। জস হ্যাজলউডের বলে বোল্ড হয়ে ফেরেন তিনি।

সেই ধাক্কা বড় হতে দেননি আরেক ওপেনার সাদমান ইসলাম আর মুমিনুল হক। দ্বিতীয় উইকেটে ৭৫ বলে ৫৩ রানের অপরাজিত জুটিতে বাংলাদেশকে জয়ের বন্দরে নিয়ে যান এই দুজন। সাদমান অপরাজিত থাকেন ৪২ বলে ২৫ রানে আর মুমিনুল ৩৯ বলে ৩০ রানে।

এর আগে ৬ উইকেট হাতে রেখে ১৬১ রান নিয়ে চতুর্থ দিনের খেলা শুরু করেছিল অস্ট্রেলিয়া। আগের দিন শেষ বিকেলে জুটি গড়ে অসিদের রক্ষা করা ক্যামেরন গ্রিন আর অ্যালেক্স ক্যারির কাঁধে দায়িত্ব ছিল সকালটা পার করার। তবে সেই সুযোগ দেননি মিরাজ। দিনের সপ্তম ওভারেই ক্যারিকে উইকেটের পেছনে লিটন দাসের ক্যাচ বানিয়ে ফেরান। ৭২ বলে ৩০ রান করে ক্যারি ফিরলে ভাঙে ৫৬ রনানের জুটি।

পরের দুই ব্যাটারকেও সুযোগ দেননি মিরাজ। বেউ ওয়েবস্টার উইকেটে এসে দেখেশুনে শুরু করেছিলেন। কিন্তু বাংলাদেশের জন্য হুমকি হওয়ার আগেই তাকে সাজঘরের পথ দেখান মিরাজ। ২১ বলে ৫ রান করা ওয়েভস্টারের স্টাম্প ভেঙে দেন এই টাইগার অলরাউন্ডার।

এরপর রাজ্য জয়ের দায়িত্ব নিয়ে উইকেটে আসেন অধিনায়ক প্যাট কামিন্স। প্রথম ইনিংসের মতো এই ইনিংসেও তাকে সফল হতে দেননি মিরাজ। ৩২ বলে ৮ রান করা কামিন্সকে ফিরিয়েছেন সাদমান ইসলামের ক্যাচ বানিয়ে।

এরপর ক্যামেরনের গ্রিনের সঙ্গে কিছুটা প্রতিরোধ গড়েন মিচেল স্টার্ক। বিরতি থেকে ফিরে তাকে আর সেই সুযোগ দেয়নি বাংলাদেশ। তাসকিন আহমেদের দারুণ এক ডিলিভারিতে পরাস্ত হয়েছেন তিনি। উইকেটের পেছনে লিটন দাসের হাতে ক্যাচ দিয়ে ৩৪ বলে ১৮ রান করে ফিরেছেন তিনি। এতে ভাঙে ৭৭ বলে ৪৩ রানের জুটি।

বাকিদের যাওয়া-আসার ভিড়ে একপ্রান্ত আগলে রেখে গতকাল থেকে লড়াই করে যাচ্ছিলেন ক্যামেরন গ্রিন। অস্ট্রেলিয়ানদের আশার প্রদ্বীপ হয়ে থাকা এই অলরাউন্ডার ডারউইন টেস্টে একমাত্র অস্ট্রেলিয়ার হিসেবে তুলে নেন সেঞ্চুরিও। তবে আর তাকে বেশি দূল যেতে দেননি হাসান মাহমুদ। ইনিংসের ৯৩তম ওভারে গ্রিনকে বোল্ড করে ফেরান তিনি। ফেরার আগে ২০১ বলে ১০৪ রানেআসে গ্রিনের ব্যাট থেকে।

এরপর আর বেশি সময় অপেক্ষা করতে হয়নি বাংলাদেশকে। দুই ওভার পরই অস্ট্রেলিয়ার কফিনে শেষ পেরেক ঠুকে দেন মিরাজ। শেষ ব্যাটার হিসেবে নাথান লায়নকে এলবিডব্লিউয়ের ফাঁদে ফেলে ফেরান মিরাজ। ২৭ বলে ১৫ রান করেন লায়ন।

লায়নকে ফেরানোর মাধ্যমে ফাইফার তুলে নেন মিরাজ। হাসান মাহমুদের পর দ্বিতীয় বাংলাদেশি বোলার হিসেবে অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে ফাইফার তুলে নিলেন তিনি। এই ম্যাচেই অস্ট্রেলিয়ার প্রথম ইনিংসে প্রথম বাংলাদেশি হিসেবে অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে ফাইফার তুলেছিলেন হাসান।

সংক্ষিপ্ত স্কোর

অস্ট্রেলিয়া (প্রথম ইনিংস) : ৫৩ ওভারে ১৯৮/১০ (হেড ২২, ওয়েদেরল্ড ২৩, লাবুশেন ১, স্মিথ ৭১, গ্রিন ১৩, কেয়ারি ১৯, ওয়েবস্টার ১২, কামিন্স ৯, স্টার্ক ১, লায়ন ৭, হেইজেলউড ৪*; তাসকিন ১৬-২-৫৫-২, হাসান মাহমুদ ১৭-৩-৫৫-৬, ইবাদত ১১-২-৩৯-২, মিরাজ ৪-০-১২-০, তাইজুল ৫-০-২৪-০)

বাংলাদেশ (প্রথম ইনিংস) : ১৩৮ ওভারে ৪২৬/১০ (সাদমান ২০, তামিম ১০১, মুমিনুল ৪৯, শান্ত ৮৪, মুশফিক ৩৬, লিটন ০, মিরাজ ৬৫, হাসান ১৪, তাইজুল ১৭, ইবাদত ৭, তাসকিন ১৪*; স্টার্ক ২৬-৩-৭৯-২, হ্যাজলউড ২৮-৩-৮৯-৬, গ্রিন ১০-২-৩৪-০, কামিন্স ২৭-৪-৭৫-১, লায়ন ৩১-৪-১০২-১, ওয়েবস্টার ১০-১-২৮-০, হেড ২-০-৪-০, লাবুশেন ৪-১-৪-০

অস্ট্রেলিয়া (দ্বিতীয় ইনিংস) : ৯৫.১ ওভারে ২৮৪/১০ (ওয়েদারাল্ড ০, হেড ১৭, লাবুশেন ৩১, স্মিথ ৪৪, ক্যারি ৩০, ওয়েবস্টার ৫, কামিন্স ৮, স্টার্ক ১৮, গ্রিন ১০৪, লায়ন ১৫, হ্যাজলউড ০*; তাসকিন ১৮-৩-৬৬-‘, হাসান ১৯-৩-৫৬-৩, ইবাদত ৮-০-৩৮-০, তাইজুল ১৭-১-৫১-১, মিরাজ ৩৩.১-৬-৬৬-৫)

বাংলাদেশ (দ্বিতীয় ইনিংস) : ১৪.২ ওভারে ৫৭/১ (তামিম ০, সাদমান ২৫*, মুমিনুল ৩০*; স্টার্ক ৪-০-১৫-০, হ্যাজলউড ৩-১-৫-১, লায়ন ৫-০-২৩-০, ওয়েবস্টার ২.২-০-১২-০

ম্যাচ : বাংলাদেশ ৯ উইকেটে জয়ী

ম্যাচ সেরা : হাসান মাহমুদ

সিরিজ : দুই ম্যাচ সিরিজে বাংলাদেশ ১-০ ব্যবধানে এগিয়ে

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *