জাতীয় দলের আকাশি-সাদা জার্সিতে টানা দুই দশকেরও বেশি সময় পার করার পর লিওনেল মেসির বর্ণাঢ্য আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের এই বিদায়ী ম্যাচটি বিশ্ব ফুটবলে গভীর আবেগঘন মুহূর্তের জন্ম দিয়েছে। বিশেষ এই ঐতিহাসিক ম্যাচটি উপভোগ করতে এখন গোটা বিশ্বের ফুটবলপ্রেমীরা অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছেন।
তবে পর্দার পেছনের চাঞ্চল্যকর তথ্য বলছে, এই বিদায়ী আয়োজনটি শুরুতে একদমই সানন্দে মেনে নেননি খোদ মেসি। তার মনে বড় একটি প্রশ্ন ও ক্ষোভের জন্ম হয়েছিল—এই ম্যাচটি কি আদতে তাকে সম্মান জানানোর জন্য, নাকি কেবল তার নাম ভাঙিয়ে কোটি কোটি টাকা ব্যবসা করার কোনো ফন্দি?
বুয়েনস আইরেসের এস্তাদিও মনুমেন্তালে বেনিনের বিপক্ষে ম্যাচটি দিয়েই জাতীয় দলের জার্সিতে নিজের ২০৮তম ও জীবনের শেষ আন্তর্জাতিক ম্যাচে মাঠে নামছেন মেসি।
এর আগে নিউ জার্সিতে অনুষ্ঠিত ২০২৬ সালের বিশ্বকাপ ফাইনালে স্পেনের বিপক্ষে হেরে রানার্সআপ হওয়ার হতাশাজনক অভিজ্ঞতার পরই ৩৯ বছর বয়সী এই কিংবদন্তি ফুটবলার জাতীয় দল থেকে সরে দাঁড়ানোর কঠিন সিদ্ধান্ত নেন। ফাইনালে নিজের সেরাটা দিতে না পারার আক্ষেপ নিয়ে অশ্রুসিক্ত চোখে সেদিন মাঠ ছেড়েছিলেন তিনি।
বাবার গুরুতর অসুস্থতা এবং পরবর্তীতে তার মৃত্যুর শোকে সময়টা এমনিতেই মানসিকভাবে ভীষণ কঠিন পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যাচ্ছিলেন মেসির। দেশের জন্য নিজের পুরো ক্যারিয়ারে সর্বস্ব উজাড় করে দেওয়ার পরও আন্তর্জাতিক ফুটবল থেকে এভাবে বিদায় নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়াটা যে কতটা যন্ত্রণাদায়ক ছিল, তা তিনি নিজেই বিভিন্ন সময় স্বীকার করেছেন।
অবসর ঘোষণার সেই আবেগঘন মুহূর্তে মেসি বলেছিলেন, ‘আমি সত্যি বলছি, আমি সবসময় আমার সর্বোচ্চটা দিয়েছি—শুধু শেষ কয়েক বছর নয়, যখন আমরা সব ট্রফি জিতলাম, তার আগের দিনগুলোতেও। আমি সবসময় লড়াই করেছি এবং এই দেশের জার্সির জন্য মাঠে নিজের সবটুকু নিংড়ে দিয়েছি, কেবল আপনাদের একটু আনন্দ দিতে আর একজন আর্জেন্টাইন হিসেবে আপনাদের বুক ফুলিয়ে গর্বিত করতে।’
এদিকে বিশ্বখ্যাত ইতালীয় সংবাদমাধ্যম ‘গাজেত্তা দেল্লো স্পোর্টস’-এর এক চাঞ্চল্যকর প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, বেনিনের বিপক্ষে এই বিশেষ বিদায়ী প্রীতি ম্যাচটি খেলার ব্যাপারে শুরুতে ভীষণ অনিচ্ছুক ছিলেন লিওনেল মেসি। তার কাছে মনে হয়েছিল, আর্জেন্টিনা ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন (এএফএ) তার দীর্ঘদিনের খ্যাতি ও নামকে ব্যবহার করে শেষ মুহূর্তে মোটা অঙ্কের অর্থ হাতিয়ে নেওয়ার এক বাণিজ্যিক ফাঁদ পাতছে।
গাজেত্তার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ‘মেসি নিজে এই সম্মাননা ম্যাচটির পক্ষে কোনোভাবেই ছিলেন না। তার দৃষ্টিতে এটি ছিল মূলত এএফএ-র একটি বাণিজ্যিক সুযোগ, যেখানে তার নাম বিক্রি করে তারা পকেটে মিলিয়ন মিলিয়ন ডলার পুরতে চেয়েছিল।’
শুধু মেসিই নন, প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে যে আর্জেন্টিনা দলের প্রধান কোচ লিওনেল স্কালোনিও এই বিদায়ী আয়োজনের পুরো ধরন ও প্রক্রিয়া নিয়ে বেশ সংশয়ে ছিলেন। যেভাবে পুরো আয়োজনটি দাঁড় করানো হচ্ছিল, তা নিয়ে কোচের মনেও নানা প্রশ্ন ও অসন্তোষ ছিল।
তবে নানা বিতর্ক, আলোচনা-সমালোচনা এবং বাণিজ্যিক হিসাব-নিকাশ সত্ত্বেও শেষ পর্যন্ত এই ম্যাচটিতে খেলতে রাজি হন মেসি। জানা গেছে, এই আন্তর্জাতিক বিরতিতে ঘরের মাঠে যথাক্রমে বলিভিয়া, বুরকিনা ফাসো ও বেনিনের বিপক্ষে মোট তিনটি প্রীতি ম্যাচ খেলার পরিকল্পনা ছিল। আর শেষ পর্যন্ত বেনিনকেই মেসির বিদায়ী ম্যাচের চূড়ান্ত প্রতিপক্ষ হিসেবে বেছে নেওয়া হয়।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, ‘মেসির বিদায়ী ম্যাচের ঐতিহাসিক এই মঞ্চে মাঠে থাকার সুযোগ পাওয়ায় বেনিন দল এতটাই উচ্ছ্বসিত ছিল যে, তারা কোনো ধরনের ম্যাচ ফি ছাড়াই এই ম্যাচ খেলতে রাজি হয়েছে।’
সাধারণত ফিফা প্রীতি ম্যাচ খেলতে নামলে বেনিনের মতো দলগুলোর বেশ বড় অঙ্কের আর্থিক পারিশ্রমিক নেওয়ার কথা ছিল। কিন্তু এএফএ একটি বিশেষ কলম্বিয়ান এজেন্সির মাধ্যমে এমন একটি দল খুঁজে বের করার বন্দোবস্ত করেছিল, যারা ম্যাচ খেলার জন্য কোনো আর্থিক দাবি জানাবে না।
সব মিলিয়ে এই বাণিজ্যিক হিসাব-নিকাশ ও নানান জটিলতার কারণে চারপাশের পরিবেশ কিছুটা ভিন্ন মনে হলেও, এস্তাদিও মনুমেন্তালের গ্যালারিতে উপস্থিত হতে যাওয়া প্রায় ৮৫ হাজার দর্শকের জন্য এটি হতে যাচ্ছে এক অবিস্মরণীয় ও অশ্রুসিক্ত রাত।
আর্জেন্টিনার ২০২২ বিশ্বকাপজয়ী সোনালী দল এবং তাদের পরিবারের সদস্যরা স্বশরীরে স্টেডিয়ামে উপস্থিত থেকে তাদের পরম আরাধ্য অধিনায়ককে শেষ বিদায় জানাবেন। একই সঙ্গে এই ম্যাচের মাধ্যমেই নতুন প্রজন্মের ফুটবলারদের কাঁধে দেশের জার্সি ও সাফল্যের বড় দায়িত্ব তুলে দিয়ে জাতীয় দলের এক বর্ণাঢ্য অধ্যায়ের চিরতরে ইতি টানছেন মেসি।
মেসিকে ঘিরে দল সাজিয়ে বিশ্বজয় করা কোচ লিওনেল স্কালোনি আজকের এই একই ম্যাচে আর্জেন্টিনা দলের ৩৮ বছর বয়সী নির্ভরযোগ্য সহ-অধিনায়ক নিকোলাস ওতামেন্দিকেও জাতীয় দল থেকে রাজকীয় বিদায় জানাবেন।