মধ্যবর্তী নির্বাচনে হারের আতঙ্কেই কি ৫ হাজার ডলারের প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন ট্রাম্প?

প্রচলিত রাজনৈতিক প্রচারণার নিয়মকানুন খুব একটা মানেন না ডোনাল্ড ট্রাম্প— এটা নতুন কিছু নয়। তবে তার নিজের অপ্রচলিত রাজনৈতিক কৌশলের মধ্যেও প্রতিটি মার্কিন নাগরিককে ৫ হাজার ডলার করে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি বেশ চমকপ্রদ। আগামী মধ্যবর্তী নির্বাচনে রিপাবলিকানরা জয়ী হলে এই অর্থ দেওয়ার কথা বলেছেন তিনি।

গত বুধবার (৯ সেপ্টেম্বর) টেক্সাসের ডালাসে রিপাবলিকানদের মধ্যবর্তী নির্বাচন উপলক্ষে আয়োজিত সম্মেলনের প্রথম দিনের মূল বক্তব্যে বিষয়টি সামনে আনেন ট্রাম্প। দীর্ঘ বক্তৃতার প্রায় এক ঘণ্টা পর হঠাৎ করেই ৫ হাজার ডলারের এই প্রতিশ্রুতি দেন তিনি।

এক ট্রিলিয়ন ডলারেরও বেশি অর্থের এই কর্মসূচির অর্থ কোথা থেকে আসবে বা কীভাবে তা বিতরণ করা হবে— সে বিষয়ে বিস্তারিত কিছু জানাননি ট্রাম্প। হোয়াইট হাউসও এ বিষয়ে কোনো সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা দেয়নি।

রিপাবলিকান সম্মেলনে ট্রাম্পের সমর্থকেরা ঘোষণাটি উচ্ছ্বাসের সঙ্গে গ্রহণ করলেও কঠিন নির্বাচনী লড়াইয়ে থাকা অনেক রিপাবলিকান প্রার্থী এতে দূরত্ব বজায় রাখেন। দলের কয়েকজন নেতা বিস্ময় প্রকাশের পাশাপাশি এর সমালোচনাও করেছেন।

কেন্টাকির রিপাবলিকান কংগ্রেসম্যান থমাস ম্যাসি বলেন, ভোটের বিনিময়ে ৫ হাজার ডলার দেওয়ার প্রস্তাব অপমানজনক এবং এতে মূল্যস্ফীতি বাড়তে পারে। মেইনের সিনেটর সুসান কলিন্সও বলেন, সরকারি ব্যয়ের সিদ্ধান্ত হওয়া উচিত জনগণের প্রয়োজন ও অর্থনীতির অবস্থা বিবেচনায়, নির্বাচনের ফলাফলের সঙ্গে মিলিয়ে নয়।

ডেমোক্র্যাটরা এই প্রতিশ্রুতিকে ‘ফাঁকা প্রতিশ্রুতি’ বলে আখ্যা দিয়েছে। আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, নির্বাহী আদেশের মাধ্যমে এত বিপুল অর্থ ব্যয়ের অনুমোদন দেওয়া কঠিন হতে পারে। তবে ট্রাম্প মনে করেন, এ জন্য কংগ্রেসের অনুমোদন প্রয়োজন নাও হতে পারে।

রক্ষণশীল রিপাবলিকানদের অনেকে এমন ব্যয়ের বিরোধিতা করতে পারেন। সাবেক কংগ্রেসম্যান বব গুড এই প্রস্তাবকে ‘সমাজতান্ত্রিক ভোট কেনার পরিকল্পনা’ বলে আখ্যা দিয়েছেন।

তারপরও ডালাসের সম্মেলন দেখিয়েছে, রিপাবলিকান পার্টির ওপর ট্রাম্পের প্রভাব এখনও প্রবল। প্রচলিত রক্ষণশীল নীতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক সিদ্ধান্তেও এর আগে দলীয় আইনপ্রণেতাদের নিজের অবস্থানের দিকে টেনে এনেছেন তিনি।

ভোটারদের অর্থ দেওয়ার প্রতিশ্রুতি ট্রাম্পের জন্য অবশ্য নতুন নয়। বাণিজ্য শুল্ক থেকে পাওয়া অর্থের মাধ্যমে প্রতিটি নাগরিককে ২ হাজার ডলার দেওয়ার কথা বলেছিলেন তিনি। ইলন মাস্কের প্রস্তাব করা ডিওজিই সাশ্রয় থেকে ৫ হাজার ডলার দেওয়ার পরিকল্পনাও বাস্তবায়িত হয়নি।

তবে শিশুদের জন্য ‘ট্রাম্প সেভিংস অ্যাকাউন্ট’ চালু করে সরকারিভাবে ১ হাজার ডলার দেওয়ার ব্যবস্থা করেছেন তিনি। এছাড়া যুক্তরাষ্ট্রের ২৫০তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে সামরিক সদস্যদের ১ হাজার ৭৭৬ ডলার করে দেওয়া হয়েছে।

তাহলে ৫ হাজার ডলারের এই নতুন প্রতিশ্রুতি কি নভেম্বরে বড় ধরনের পরাজয়ের আশঙ্কায় ট্রাম্পের রাজনৈতিক উদ্বেগের বহিঃপ্রকাশ?

মধ্যবর্তী নির্বাচনে প্রেসিডেন্টের নাম ব্যালটে না থাকলেও ভোটাররা সাধারণত এটিকে ক্ষমতাসীন প্রেসিডেন্টের কাজের ওপর এক ধরনের গণভোট হিসেবে দেখেন। আর ইতিহাস বলছে, এমন নির্বাচনে ক্ষমতাসীন দলের জন্য লড়াইটা প্রায়ই কঠিন হয়।

নির্বাচনের আর দুই মাসেরও কম সময় বাকি। এরই মধ্যে ট্রাম্পের জনপ্রিয়তা ঐতিহাসিকভাবে নিচের দিকে রয়েছে। ইরানের সঙ্গে তার যুদ্ধও ক্রমেই অজনপ্রিয় হয়ে উঠছে। এর প্রভাব পড়ছে জ্বালানি দামে এবং বাড়ছে জীবনযাত্রার ব্যয়।

ভোটারদের কাছে এখনও জীবনযাত্রার ব্যয় অন্যতম প্রধান ইস্যু। জো বাইডেনের সময় কোভিড-পরবর্তী সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে মূল্যস্ফীতি কমলেও তা এখনও বেশ চড়া।

এ অবস্থায় নির্বাচনের আগে হঠাৎ করে ৫ হাজার ডলার দেওয়ার মতো বড় প্রতিশ্রুতি সামনে আনা কি ট্রাম্পের রাজনৈতিক ‘আতঙ্কের’ ইঙ্গিত— এমন প্রশ্ন উঠছে। বিশেষ করে তার ঘনিষ্ঠ অনেক মিত্রও ঘোষণাটির আগে এ বিষয়ে অবগত ছিলেন না বলে জানা গেছে।

তবে ট্রাম্পের রাজনৈতিক সাফল্যের অন্যতম বৈশিষ্ট্যই হলো প্রচলিত রাজনৈতিক রীতিনীতি ভেঙে নতুন কৌশল সামনে আনা। তার সর্বশেষ এই কৌশলও সফল হতে পারে— তবে তার জন্য প্রথমে ভোটারদের বিশ্বাস করতে হবে, তিনি সত্যিই তাদের হাতে ৫ হাজার ডলারের চেক তুলে দিতে পারবেন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *