‘নেপালে খেলা নেই, বাংলাদেশে খেলে সংসার চলছে’

ফর্টিস ক্লাবের অনুশীলন চলছে। মাঠে সতীর্থদের ব্যস্ততা, চারপাশে নতুন মৌসুমের প্রস্তুতির তোড়জোড়। সেই ব্যস্ততার মাঝেও কখনও কখনও আনমনা হয়ে যান এরিক বিস্তা। কারণ, চোখের সামনে বাংলাদেশের ফুটবলের প্রস্তুতি দেখলেও নিজের দেশ নেপালের ফুটবলের কথা মনে পড়লেই মনটা বিষণ্ন হয়ে যায়।

বাংলাদেশসহ দক্ষিণ এশিয়ার বেশ কয়েকটি দেশ আসন্ন ফিফা উইন্ডোর ম্যাচ সামনে রেখে প্রস্তুতি শুরু করেছে। কোথাও চলছে অনুশীলন, কোথাও আন্তর্জাতিক ম্যাচের পরিকল্পনা। অথচ নেপালে যেন সবকিছু থমকে আছে। আন্তর্জাতিক ম্যাচ খেলা তো দূরের কথা, ফিফার নিষেধাজ্ঞার পর কার্যত অল নেপাল ফুটবল ফেডারেশনের (এএনএফএ) কোনো কার্যক্রমই যে নেই। শুধু আন্তর্জাতিক ফুটবল নয়, দেশটিতে তিন বছর ধরে হচ্ছে না ঘরোয়া লিগও।

এসব ভাবলে মন খারাপ হয় এরিকের। পরে অবশ্য বাংলাদেশে নিজের ব্যস্ততার কথা মনে করে স্বস্তি খুঁজে নেন ২৬ বছর বয়সী এই মিডফিল্ডার। নিজ দেশে নেই লিগ, নেই আন্তর্জাতিক ম্যাচ। সেই জায়গায় বাংলাদেশে টানা দুই মৌসুম খেলার সুযোগ পেয়েছেন। মাঠে নামছেন, আয় করছেন, পরিবার-সংসার চালাতে পারছেন, এটাকেই এখন নিজের সৌভাগ্য মনে করেন কাঠমান্ডুতে জন্ম নেওয়া এই ফুটবলার।

এবার বাংলাদেশের ঘরোয়া ফুটবলে সাফ কোটায় সর্বোচ্চ ১৪ জন নেপালি ফুটবলার জায়গা করে নিয়েছেন। নেপালের বাইরে এর আগে একসঙ্গে এত বেশি ফুটবলার খেলেননি। গত মৌসুমে বাংলাদেশের ঘরোয়া ফুটবলে খেলেছেন ৯জন নেপালি। এবার সংখ্যাটা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৪-তে।

ফর্টিস ক্লাবে অনুশীলনের ফাঁকে এরিকের সঙ্গে কথা হচ্ছিল নেপালি ফুটবলারদের এই বাড়তি উপস্থিতি নিয়ে। তার চোখে, এর পেছনে বড় ভূমিকা রেখেছে সাফ কোটা। বাংলা ট্রিবিউনকে এরিক বলছিলেন, ‘আসলে সাফ কোটা আমাদের সুযোগটা করে দিয়েছে। তানাহলে এতো নেপালি ফুটবলারের এখানে সুযোগ পাওয়া কঠিন ছিল। তবে আমরা এখানে সাফ বা স্থানীয় কোটায় খেললেও একজন বিদেশি খেলোয়াড় হিসেবে নিজেদের দেখি। আমরা মনে করি আমরা ভালো খেলতে পারলে সামনের দিকে আরও সুযোগ তৈরি হবে। গতবার ভালো করার কারণে এবার কিন্তু খেলোয়াড় বেড়েছে।’

কথা বলতে বলতে এরিকের মুখে ফুটে উঠে হতাশার ছাপও। টানা ছয় বছর ধরে নেপাল জাতীয় দলের হয়ে খেলছেন তিনি। কিন্তু নিজের দেশের ফুটবলের বর্তমান পরিস্থিতি তার কাছে বেদনার।

এরিক বললেন, ‘আজ তিন বছর হলো নেপালে লিগ হয় না। তার ওপর ফিফার নিষেধাজ্ঞার কারণে আন্তর্জাতিক ম্যাচও বন্ধ। আসন্ন ফিফা উইন্ডোতে সবাই ম্যাচ খেলার প্রস্তুতি নিচ্ছে আর আমাদের বসে থাকতে হচ্ছে। সামনে ঢাকায় সাফ ফুটবলও আছে। সেখানেও খেলা হবে কিনা জানি না। এটা আমাদের জন্য হতাশার।’

একদিকে জাতীয় দলের জার্সি গায়ে মাঠে নামার অপেক্ষা, অন্যদিকে নিজ দেশের লিগ বন্ধ। এমন পরিস্থিতিতে অনেক নেপালি ফুটবলারই দীর্ঘ সময় বসে থাকছেন। এরিকদের জন্য তাই বাংলাদেশে খেলার সুযোগটা শুধু ফুটবলীয় ক্যারিয়ারের বিষয় নয়, জীবিকারও বড় অবলম্বন।

বাংলাদেশে খেলে পরিবার-সংসার চালাতে পারছেন, এটা ভেবেই খুশি এরিক। নেপালের ফুটবলাররা এখানে মাসে প্রায় ১ হাজার ৫০০ থেকে ২ হাজার ৫০০ ডলার পারিশ্রমিক পান। এরিকের কাছে সেটি কম নয়। বরং নিজ দেশের বর্তমান বাস্তবতায় এই আয় অনেক বড় স্বস্তির।

জীবিকার প্রসঙ্গে এরিক জানালেন, ‘নেপালে খেলা নেই। ফুটবলার হিসেবে জীবিকা নির্বাহ করা কঠিন। সেই জায়গায় বাংলাদেশ খেলে সংসার চলছে। খুশি বলতে পারেন। এখানে খেলে যা পাই তা নেপালের টাকায় রুপান্তরিত করে ভালোই আসে। কেননা নেপালে ৫-৬ মাস লিগ হতো। আর এখানে ৭-৮ মাস। তাই আয়ও বেশি। এটা দিয়ে সংসার ভালোই চলে।’

শুধু পারিশ্রমিক নয়, ফুটবলের দিক থেকেও বাংলাদেশের ঘরোয়া লিগকে এগিয়ে রাখছেন এরিক। নেপালে লিগের পরিধি, মাঠ ও বিদেশি খেলোয়াড়ের মানের সঙ্গে বাংলাদেশের তুলনা টানলেন তিনি।

বাংলাদেশ ও নেপালের ফুটবলের পরিকাঠামো নিয়ে এরিকের মূল্যায়ন,‘আমাদের ওখানে যখন লিগ হয় শুধু কাঠমান্ডুভিত্তিক তিনটি মাঠে। তাও আবার সিঙ্গেল লিগ পদ্ধতিতে। বিদেশি খেলোয়াড় আসে আফ্রিকা থেকে, খুব উঁচুমানের নয়। তবে আমাদের ফুটবলারদের ব্যক্তিগত মান ভালো। বাংলাদেশের লিগের মান এগিয়ে। হোম অ্যান্ড অ্যাওয়ে ভিত্তিক হয়। পারিশ্রমিকও বেশ ভালো। বিদেশি ফুটবলাদের মান ভালো। ভালো একাধিক ক্লাব রয়েছে। স্থানীয়দের মানও প্রায় সমান।’

বাংলাদেশে এরিকের পথচলাও খুব বেশি দিনের নয়। গত মৌসুমে খেলেছেন ব্রাদার্স ইউনিয়নের হয়ে। এবার ঠিকানা বদলে ফর্টিস এফসিতে যোগ দিয়েছেন। তবে ক্লাব বদলালেও বাংলাদেশের প্রতি তার টানটা একই রকম। ঢাকার ব্যস্ততা, যানজট কিংবা খাবার কোনোটিই এখন আর খুব একটা অচেনা লাগে না তার কাছে। বরং ঢাকাকে অনেকটা দ্বিতীয় বাড়ির মতোই মনে হয়। কাঠমান্ডুর যানজট দেখতে দেখতে ঢাকার জ্যামও এখন সয়ে গেছে। খাবার নিয়েও নেই কোনো সমস্যা।

সব মিলিয়ে বাংলাদেশ এখন এরিকের পছন্দের তালিকার ওপরের দিকে। তবে শুধু নিজের ভালো থাকা নয়, তার চোখে আরও বড় একটি স্বপ্নও আছে। পারফরম্যান্স দিয়ে বাংলাদেশে নেপালি ফুটবলারদের সংখ্যা ভবিষ্যতে আরও বাড়াতে চান তিনি। একই লক্ষ্য হিমালয়ের দেশের বাকি ফুটবলারদের। 

এসএন/পিডিকে

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *