রাশিয়া ও ইউক্রেনের পাল্টাপাল্টি হামলায় শনিবার (২২ আগস্ট) পর্যন্ত অন্তত ১৩ নিহত হয়েছে। এদিকে রাশিয়ার হামলা বেড়ে যাওয়ায় ইউক্রেনকে নতুন করে মিসাইল প্রতিরোধী ক্ষেপণাস্ত্র দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে ফ্রান্স। খবর বার্তা সংস্থা এএফপির।
নিহতদের মধ্যে ইউক্রেনে সাতজন, রাশিয়ায় চারজন এবং রাশিয়ার দখলে থাকা ক্রিমিয়ায় দুজন রয়েছেন বলে জানা গেছে।
গত সাড়ে চার বছর ধরে চলা এই যুদ্ধে রুশ হামলায় বেসামরিক মানুষের মৃত্যুর সংখ্যা মস্কোর আগ্রাসন শুরুর কয়েক মাস পরের তুলনায় এখন সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে।
সর্বশেষ প্রাণঘাতী হামলার সময় ইউক্রেনের পূর্বাঞ্চলের ক্রিভি রিগ শহরে উদ্ধারকর্মীরা একটি আংশিক ধসে পড়া শপিং সেন্টারের ধ্বংসস্তূপে তল্লাশি চালাচ্ছিলেন। এর একদিন আগে রুশ ড্রোন হামলায় সেখানে ১৬ জন নিহত এবং শতাধিক মানুষ আহত হয়।
ফ্রান্স ও ব্রিটেনের নেতৃত্বাধীন ‘কোয়ালিশন অব দ্য উইলিং’-এর সদস্য ইউক্রেনের মিত্র দেশগুলো সোমবার বৈঠকে বসবে। রাশিয়াকে আগ্রাসন বন্ধে বাধ্য করতে মস্কোর ওপর কীভাবে আরও চাপ বাড়ানো যায়, তা নিয়ে বৈঠকে আলোচনা হবে।
এদিকে যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় ইউক্রেন ও রাশিয়ার মধ্যে সরাসরি কয়েক দফা আলোচনা হলেও কূটনৈতিক তৎপরতা এখন থমকে আছে। ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধের কারণে ওয়াশিংটনের মনোযোগ সেদিকে চলে গেছে। এদিকে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প যে সহজেই এই সংঘাতের সমাধান করা সম্ভব হবে বলে আগে দাবি করেছিলেন, বাস্তবে তা না হওয়ায় যুক্তরাষ্ট্রও হতাশ হয়েছে।
নতুন মিসাইল প্রতিরোধী ক্ষেপণাস্ত্র দেওয়ার ঘোষণা দিয়ে ফরাসি প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে তিনি জানান, রাশিয়ার আগ্রাসন ঠেকাতে ইউক্রেনকে তার আকাশ প্রতিরক্ষার জন্য প্রয়োজনীয় সব ধরনের সক্ষমতা দেওয়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
সাম্প্রতিক মাসগুলোতে রাশিয়া ইউক্রেনে, বিশেষ করে রাজধানী কিয়েভে, ব্যাপকভাবে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়ে আসছে।
অত্যন্ত দ্রুতগতির এসব ক্ষেপণাস্ত্রকে প্রতিহত করা কঠিন। লক্ষ্যবস্তুতে পৌঁছাতে এগুলোর মাত্র কয়েক মিনিট সময় লাগে। ফলে কিয়েভের বাসিন্দাদের পক্ষে সময়মতো ভূগর্ভস্থ আশ্রয়কেন্দ্রে পৌঁছানো প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে।
রাশিয়াতেও ইউক্রেনের ড্রোন হামলা
রাশিয়ার দক্ষিণাঞ্চলের একটি বাড়িতে শনিবার ইউক্রেনীয় ড্রোন হামলায় দুই শিশু নিহত এবং তাদের বাবা-মা আহত হয়েছেন বলে জানিয়েছেন ক্রাসনোদার অঞ্চলের গভর্নর ভেনিয়ামিন কোন্দ্রাতিয়েভ। সকালে ইয়েস্ক জেলায় বেসামরিক অবকাঠামো ও আবাসিক ভবনে ড্রোন হামলা চালানো হয়। এতে দুই শিশু নিহত এবং দুই ব্যক্তি আহত হয়েছেন। তিনি বলেন, আহতদের হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে।
অন্যদিকে শনিবার দুপুরে কিয়েভের দিকে একটি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়ে রাশিয়া। ওই সময় ইউক্রেনের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠকের জন্য জার্মান পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইয়োহান ভাডেফুল এবং প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি কিয়েভে ছিলেন।
শহরের পূর্ব প্রান্তের বোরিসপিল এলাকায় ওই হামলায় দুজন নিহত এবং কয়েকজন আহত হয়েছে। এক বিবৃতিতে রাশিয়ার প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় দাবি করেছে, কিয়েভের কাছে দূরপাল্লার ড্রোন পরিবহনের জন্য ব্যবহৃত ট্রাক এবং কৃষ্ণসাগর তীরবর্তী ওডেসা অঞ্চলে ইউক্রেনীয় সেনাবাহিনীর সঙ্গে যুক্ত কয়েকটি লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালানো হয়েছে। ওডেসা অঞ্চলের গভর্নর ওলেহ কিপের জানিয়েছেন, একটি বাড়ি ও শস্য সংরক্ষণাগারে দীর্ঘস্থায়ী ও সমন্বিত হামলায় তিনজন আহত হয়েছেন। আহতদের মধ্যে ১৬ বছর বয়সী এক কিশোরীও রয়েছে।
ইউক্রেনীয় কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, জাপোরিঝিয়া অঞ্চলে ধারাবাহিক হামলায় অন্তত চারজন নিহত হয়েছেন।
ক্রিভি রিগের শপিং সেন্টারে হামলা
ইউক্রেন গত কয়েক সপ্তাহ ধরে উন্নত মিসাইল প্রতিরোধী ব্যবস্থার তীব্র সংকটে রয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো যুক্তরাষ্ট্রের তৈরি প্যাট্রিয়ট ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা।
ইউক্রেনের নিজস্ব অস্ত্রব্যবস্থা রাশিয়ার নিক্ষেপ করা উচ্চগতির ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রগুলোর অনেকগুলো ঠেকাতে সক্ষম নয়।
জেলেনস্কির নিজ শহর ক্রিভি রিগে শুক্রবার বিকেলে একটি ব্যস্ত শপিং সেন্টারে রুশ ড্রোন হামলার পর এখনো তিনজন নিখোঁজ রয়েছেন বলে জানিয়েছেন আঞ্চলিক গভর্নর।
এ হামলায় এ পর্যন্ত ১৬ জন নিহত হয়েছে এবং আহত হয়েছেন ১০০ জনের বেশি।
হামলায় শপিং সেন্টারে আগুন ধরে যায়। রক্তাক্ত আহত মানুষ প্রাণ বাঁচাতে বাইরে বেরিয়ে আসার প্রায় আধা ঘণ্টা পর সেখানে দ্বিতীয় একটি ড্রোন হামলা চালানো হয়। ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট জেলেনস্কি এই দ্বৈত হামলাকে ‘অত্যন্ত নিষ্ঠুর ও জঘন্য’ বলে আখ্যা দিয়েছেন।
স্বজন ও স্থানীয় বাসিন্দারা শনিবার শপিং সেন্টারের বাইরে ঘাসের ওপর ফুল ও চিঠি রেখে একটি অস্থায়ী স্মৃতিসৌধ তৈরি করেন।
এএফপির এক সাংবাদিক জানান, তিনি সেখানে ধ্বংসপ্রাপ্ত ও আগুনে পোড়া ধাতব কাঠামোর স্তূপ দেখতে পেয়েছেন। আগুনে পুড়ে কালো হয়ে যাওয়া পণ্যভর্তি সুপারমার্কেটের তাকগুলো ধসে পড়া ছাদ ও ভেঙে যাওয়া জানালার নিচে পড়ে ছিল।
সাড়ে চার বছর ধরে চলা রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের মধ্যে সর্বশেষ এসব হামলা সংঘাতকে আরও তীব্র করে তুলেছে।
জাতিসংঘ জানিয়েছে, চলতি বছরে ইউক্রেনে বেসামরিক মানুষের মৃত্যুর সংখ্যা যুদ্ধের প্রথম কয়েক মাসের পর সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে।