ইরানের হামলার ভয়ে চুপি চুপি ‘খাবারের ট্রাক’ থেকে ছোট বিমানে করে তুরস্ক ছেড়েছিলেন ট্রাম্প

ইরানের হামলার আশঙ্কায়, গত মাসে, তুরস্ক সফর শেষে ‘চুপি চুপি’ বিমান বদল করেছিলেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। নিরাপত্তার স্বার্থে অত্যন্ত গোপনীয় ও নাটকীয় এক পরিকল্পনার অংশ হিসেবে খাবার সরবরাহের একটি ট্রাকে লুকিয়ে পুরোনো এয়ার ফোর্স ওয়ান থেকে নেমে ছোট আকারের একটি সামরিক বিমানে উঠেছিলেন তিনি। মার্কিন এক কর্মকর্তার বরাত দিয়ে এ তথ্য জানিয়েছে সিএনএন।

ওয়াশিংটন পোস্ট প্রথম এ গোপন বিমান বদলের খবর প্রকাশ করে। পরে সিএনএনও বিষয়টি নিশ্চিত করে।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, ট্রাম্পকে হত্যার জন্য ইরানের সম্ভাব্য হুমকি মোকাবিলা এবং প্রেসিডেন্টের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতেই এই নজিরবিহীন পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছিল। তবে ঠিক কী ধরনের হুমকি পাওয়া গিয়েছিল, সে বিষয়ে বিস্তারিত জানানো হয়নি।মূলত, গত মাসে, ন্যাটো সম্মেলনে যোগ দিতে তুরস্কে গিয়েছিলেন ট্রাম্প। সফরের সময় কাতারের উপহার দেওয়া একটি নতুন বিমানেই তিনি তুরস্কে পৌঁছান। বিমানটি ভবিষ্যতে এয়ার ফোর্স ওয়ান হিসেবে ব্যবহারের জন্য প্রস্তুত করা হচ্ছে।

তবে, তুরস্ক ছাড়ার আগে হঠাৎ ঘোষণা দেওয়া হয়, ট্রাম্প নতুন বিমানটি ব্যবহার না করে পুরোনো প্রেসিডেন্টের বিমানে করে দেশ ছাড়বেন। সেসময় বিষয়টি নিরাপত্তাজনিত কারণে করা হচ্ছে বলে জানানো হয়েছিল।

কিন্তু এখন জানা যাচ্ছে, সেটিও ছিল নিরাপত্তা পরিকল্পনার অংশ, অন্তত এমনটাই দাবি করছে মার্কিন গণমাধ্যমগুলো।

তুরস্কের রাজধানী আঙ্কারার এসেনবোগা বিমানবন্দরে, পুরোনো এয়ার ফোর্স ওয়ানে ওঠার পর, ট্রাম্প গোপনে সেখান থেকে নেমে যান। খাবার সরবরাহের একটি ট্রাক ব্যবহার করে তাকে বিমান থেকে বের করে আনা হয়। এরপর তাকে ছোট আকারের একটি এয়ার ফোর্স ‘সি-৩২এ’ সামরিক বিমানে নেওয়া হয়।

পরে কাতারের উপহার দেওয়া নতুন বিমান, পুরোনো এয়ার ফোর্স ওয়ান এবং সি-৩২এ—তিনটি বিমান আলাদাভাবে যুক্তরাজ্যের উদ্দেশে রওনা হয়। সেখানে পৌঁছানোর পর ট্রাম্প আবার কাতারের দেওয়া নতুন বিমানে ওঠেন এবং সেটিতে করেই যুক্তরাষ্ট্রে ফেরেন।

সাংবাদিকদেরও রাখা হয়েছিল ‘ডিকয়’ বিমানে

ট্রাম্পের নিরাপত্তা পরিকল্পনার এই কৌশলে তার সঙ্গে সফর করা সাংবাদিক ও কর্মকর্তারাও অজান্তেই একটি ‘ডিকয়’ বা বিভ্রান্তিকর বিমানে ছিলেন বলে ধারণা করা হচ্ছে।

প্রেসিডেন্টের সঙ্গে সফর করা সাংবাদিকদের একটি দলকে নিয়মিত তার গতিবিধি অনুসরণ ও নথিবদ্ধ করার দায়িত্ব দেওয়া হয়। তাদের দেওয়া তথ্য থেকেই তুরস্ক থেকে ট্রাম্পের যাত্রার অস্বাভাবিক কিছু বিষয় সামনে এসেছে।

স্থানীয় সময় রাত ৮টা ২৬ মিনিটে ট্রাম্পকে আঙ্কারায় পুরোনো এয়ার ফোর্স ওয়ানে অবস্থান করতে দেখা যায়। ১৭ মিনিট পর, রাত ৮টা ৪৩ মিনিটে বিমানটি উড্ডয়ন করে।

তবে বিমানে থাকা সাংবাদিকদের জানানো হয়েছিল, তারা যেন প্রেস কেবিনের জানালার পর্দা বন্ধ রাখেন। প্রেসিডেন্টের নিয়মিত সফরে এমন নির্দেশনা অত্যন্ত অস্বাভাবিক বলে উল্লেখ করা হয়েছে।

পরে ট্রাম্প নিজেও সাংবাদিকদের বলেন, ‘সম্ভবত আপনারা একটি বিপজ্জনক ফ্লাইটে আছেন।’

এরপর পুরোনো এয়ার ফোর্স ওয়ানটি যুক্তরাজ্যের রয়্যাল এয়ার ফোর্স মিলডেনহল ঘাঁটিতে স্থানীয় সময় রাত ১০টা ২৯ মিনিটে অবতরণ করে।

তবে বিমান অবতরণের পর প্রেসিডেন্টকে নামানোর দৃশ্য ধারণের জন্য সাংবাদিকদের নির্ধারিত জায়গায় প্রস্তুত হতে প্রায় ২০ মিনিট সময় লেগে যায়। সাধারণত প্রেসিডেন্টের বিমান অবতরণের কয়েক মিনিটের মধ্যেই সাংবাদিকদের দল অবস্থান নেয় এবং ট্রাম্প বিমান থেকে নামার দৃশ্য ধারণ করে।

সিএনএনের পর্যালোচনা করা ভিডিওতে দেখা গেছে, সাংবাদিকদের ক্যামেরা প্রস্তুত হওয়ার আগেই বিমানের দরজা খোলা এবং প্রেসিডেন্টকে নামানোর সিঁড়িও প্রস্তুত ছিল। রানওয়েতে স্বাভাবিকের তুলনায় বেশি সংখ্যক নিরাপত্তাকর্মীকেও দেখা যায়।

সাংবাদিকদের ক্যামেরা প্রস্তুত হওয়ার প্রায় এক মিনিট পর ট্রাম্পকে পুরোনো এয়ার ফোর্স ওয়ান থেকে নামতে দেখা যায়।

এরপর রাত ১১টা ১ মিনিটে ট্রাম্পকে কাতারের উপহার দেওয়া নতুন এয়ার ফোর্স ওয়ানে উঠতে দেখা যায়। সাংবাদিকদের ধারণ করা ভিডিওতে তাকে একটি বিমান থেকে অন্য বিমানে যেতে দেখা যায়।

কেন বিমান বদল, জানেন না সাংবাদিকরাও

বিমান বদলের কারণ জানতে চাইলে ট্রাম্প সাংবাদিকদের বলেছিলেন, তুরস্কে অবস্থানরত মার্কিন সেনাদের নতুন বিমানটি ঘুরে দেখার সুযোগ করে দিতেই বিমান পরিবর্তন করা হয়েছে।

অন্য কোনো সমস্যা ছিল কি না—এমন প্রশ্নের জবাবে ট্রাম্প দ্রুত বলেন, ‘কোনো সমস্যা নেই।’

তবে জানালার পর্দা বন্ধ রাখার নির্দেশ কেন দেওয়া হয়েছিল, সে প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘কারণ সম্ভবত আপনারা একটি বিপজ্জনক ফ্লাইটে আছেন।’

ট্রাম্প আরও বলেন, ‘তারা আমাকে আমারটা বন্ধ করতে বলেনি। বললে আমিও বন্ধ করে দিতাম।’

সাংবাদিকদের উদ্দেশে রসিকতার সুরে তিনি বলেন, ‘আমি গেলে আপনারাও যাবেন, তাই তো? হয়তো একদিন আপনারা পেশা পরিবর্তন করতে চাইবেন।’

নতুন বিমানের নিরাপত্তা নিয়ে আগে থেকেই প্রশ্ন

গত এক মাস ধরে, ট্রাম্পের বিমান বদলের ঘটনা নিয়ে আলোচনার কেন্দ্রে ছিল কাতারের উপহার দেওয়া নতুন বিমানটির নিরাপত্তা সক্ষমতা।

ট্রাম্প নিজে একাধিকবার নতুন বিমানটির প্রশংসা করলেও মার্কিন কর্মকর্তাদের মধ্যে এ নিয়ে উদ্বেগ ছিল। কারণ, বিমানটি মূলত এয়ার ফোর্স ওয়ান হিসেবে তৈরি করা হয়নি; প্রেসিডেন্টের ব্যবহারের উপযোগী করতে এতে ব্যাপক পরিবর্তন আনার প্রয়োজন হয়েছে।

নতুন বিমানের নিরাপত্তা সক্ষমতা নিয়ে গণমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদনেও অসন্তুষ্ট ছিলেন ট্রাম্প বলে এর আগে জানিয়েছিল সিএনএন।

তবে এবার আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু হতে পারে আরও বড় প্রশ্ন—প্রেসিডেন্টকে নিরাপদ রাখতে কেন তার সঙ্গে থাকা সাংবাদিক ও কর্মীদের অজান্তে একটি ডিকয় বিমানে রাখা হয়েছিল এবং ঠিক কী ধরনের হুমকির কারণে এমন নজিরবিহীন নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিতে হয়েছিল।

হোয়াইট হাউসের বক্তব্য

গোপনে বিমান বদলের খবর নিয়ে হোয়াইট হাউসের মুখপাত্র স্টিভেন চিউং বলেন, কাতারের দেওয়া নতুন এয়ার ফোর্স ওয়ান অত্যাধুনিক প্রযুক্তির বিমান। প্রেসিডেন্ট ও তার কর্মীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এতে উচ্চমাত্রার নিরাপত্তা ব্যবস্থা যুক্ত করা হয়েছে।

তিনি বলেন, ‘প্রেসিডেন্ট সম্প্রতি যেমন বলেছেন, আমেরিকার অনেক শত্রুই তার ওপর নজর রাখছে। এসব হুমকি মোকাবিলায় আমাদের হাতে থাকা প্রতিটি উপায় আমরা ব্যবহার করছি।’

তুরস্ক সফর শেষে শেষ পর্যন্ত ট্রাম্প যুক্তরাষ্ট্রের জয়েন্ট বেস অ্যান্ড্রুজে পৌঁছান। স্থানীয় সময় রাত ১টা ২৩ মিনিটে তিনি এয়ার ফোর্স ওয়ান থেকে নামেন। প্রেসিডেন্টের সফরসঙ্গী সাংবাদিকদের দেওয়া নোটে বলা হয়, ট্রাম্প নেমে দ্রুত স্যালুট করেন এবং নিরাপত্তাবেষ্টিত বিশেষ গাড়ি ‘দ্য বিস্ট’-এ উঠে চলে যান।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *