ইরান যুদ্ধ থেকে বের হওয়ার পথ খুঁজছেন ট্রাম্পের শীর্ষ জেনারেল

ইরানের সঙ্গে চলমান যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বিকল্পগুলো সীমিত হয়ে পড়ায় সংঘাত থেকে বের হওয়ার একটি ‘নিরাপদ পথ’ খুঁজছেন মার্কিন জয়েন্ট চিফস অব স্টাফের চেয়ারম্যান জেনারেল ড্যান কেইন। বিষয়টি নিয়ে তিনি প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসনের কয়েকজন শীর্ষ কর্মকর্তার সঙ্গে ব্যক্তিগতভাবে আলোচনা করছেন বলে সংশ্লিষ্ট তিনটি সূত্রের বরাতে জানিয়েছে মার্কিন গণমাধ্যম সিএনএন।

সূত্রগুলো বলছে, সংঘাত আরও বাড়ালে তা উল্টো যুক্তরাষ্ট্রের জন্য ক্ষতিকর হতে পারে। একই সঙ্গে শুধু বিমান হামলার মাধ্যমে ট্রাম্পের ঘোষিত লক্ষ্য অর্জন করাও কঠিন বলে মনে করছেন কেইন ও প্রশাসনের কয়েকজন কর্মকর্তা। খবর সিএনএনের। 

শীর্ষ কর্মকর্তাদের সঙ্গে আলোচনা

কেইন একা এই অবস্থানে নেই। তিনি সিআইএ পরিচালক জন র‍্যাটক্লিফ, পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও এবং ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্সসহ ট্রাম্প প্রশাসনের কয়েকজন গুরুত্বপূর্ণ কর্মকর্তার সঙ্গে যুদ্ধ থেকে বের হওয়ার সম্ভাব্য পথ নিয়ে আলোচনা করেছেন।

একটি সূত্রের ভাষ্য, এসব আলোচনার মূল উদ্দেশ্য হচ্ছে ট্রাম্পকে সামরিক বিকল্পগুলোর সীমাবদ্ধতা ও সম্ভাব্য ঝুঁকি সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা দেওয়া। বিশেষ করে স্থল সেনা না পাঠিয়েও যেসব সামরিক পদক্ষেপ নেওয়া যেতে পারে, সেগুলোর সম্ভাব্য ফলাফল নিয়েও কর্মকর্তারা আলোচনা করছেন।

‘বিমান শক্তিরও সীমাবদ্ধতা’

ট্রাম্প দীর্ঘদিন ধরেই ইরানে স্থল সেনা পাঠানোর ব্যাপারে অনাগ্রহ দেখিয়েছেন। তার ধারণা, বিমান হামলার মাধ্যমে ইরানকে তার শর্তে একটি চুক্তিতে যেতে বাধ্য করা সম্ভব। তবে কেইন ও প্রশাসনের অন্য কর্মকর্তারা ব্যক্তিগতভাবে মনে করছেন, এই কৌশলে কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়ার সম্ভাবনা কম।

কেইন নিজেই সম্প্রতি আইনপ্রণেতাদের এক প্রকাশ্য শুনানিতে বলেছেন, ‘বিমান শক্তির সীমাবদ্ধতা আছে’—অর্থাৎ বিমান শক্তিরও সীমাবদ্ধতা রয়েছে।

এই কারণেই জুলাইয়ের শেষ দিকে ইরানে আরও বড় ধরনের হামলার পরিকল্পনা নিয়ে কেইন ও ট্রাম্প প্রশাসনের কয়েকজন কর্মকর্তা উদ্বেগ প্রকাশ করেছিলেন। তাদের আশঙ্কা ছিল, নতুন করে সংঘাত বাড়ালে এর নেতিবাচক প্রভাব গুরুতর হতে পারে।

অস্ত্রের মজুত নিয়েও উদ্বেগ

ইরানে আরও হামলা চালানোর ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষেপণাস্ত্র ও অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ সামরিক সরঞ্জামের কমে যাওয়া মজুতও বড় উদ্বেগ হয়ে উঠেছে। কেইনের পাশাপাশি উপসাগরীয় দেশগুলোর কর্মকর্তারাও মার্কিন প্রশাসনকে সতর্ক করেছেন যে, যুক্তরাষ্ট্র সংঘাত বাড়ালে ইরানের পাল্টা হামলা ঠেকানোর মতো উন্নত বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার ঘাটতি তাদের জন্য বড় ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।

ট্রাম্প ইরানের জ্বালানি অবকাঠামোতে হামলার হুমকি দিয়ে এলেও সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো মনে করছে, এতে তেহরানকে আত্মসমর্পণে বাধ্য করার সম্ভাবনা কম। বরং এর ফলে উপসাগরীয় দেশগুলোর জ্বালানি অবকাঠামোতে ইরানের পাল্টা হামলার ঝুঁকি বাড়তে পারে।

যুদ্ধের ছয় মাস পর নতুন সংকট

প্রায় ছয় মাস ধরে চলা এই সংঘাতে ট্রাম্প প্রশাসনের জন্য সামরিকভাবে একটি সহজ সমাধান খুঁজে পাওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে। কেইন ও তার সহযোগীদের অবস্থান থেকে ইঙ্গিত মিলছে, শুধু বিমান হামলা দিয়ে ইরানকে ট্রাম্পের শর্ত মানতে বাধ্য করা সম্ভব নাও হতে পারে।

ফলে এখন ট্রাম্প প্রশাসনের সামনে বড় প্রশ্ন—সংঘাত আরও বাড়ানো, নাকি এমন একটি কূটনৈতিক পথ খোঁজা, যা প্রেসিডেন্টকে রাজনৈতিকভাবে একটি ‘প্রতীকী বিজয়’ দাবি করার সুযোগ দেবে এবং একই সঙ্গে যুদ্ধ থেকে বের হওয়ার পথ তৈরি করবে।

ট্রাম্পকে সামলেই ইরান যুদ্ধের ঝুঁকি বোঝাচ্ছেন শীর্ষ মার্কিন জেনারেল

মার্কিন জয়েন্ট চিফস অব স্টাফের চেয়ারম্যান জেনারেল ড্যান কেইন ইরান যুদ্ধ নিয়ে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে সম্পর্ক নষ্ট না করে সামরিক পদক্ষেপের ঝুঁকিগুলো তুলে ধরছেন। সূত্রগুলো বলছে, ট্রাম্পের সঙ্গে সরাসরি আলোচনার সময় তিনি সতর্কভাবে সম্ভাব্য নেতিবাচক দিকগুলো তুলে ধরলেও ব্যক্তিগত আলোচনায় বিমান হামলার সীমাবদ্ধতা সম্পর্কে আরও স্পষ্ট অবস্থান নিচ্ছেন।

কেইন ট্রাম্পের কাছাকাছি থাকার বিষয়টিকেও গুরুত্ব দিচ্ছেন। এমনকি প্রেসিডেন্টকে নিয়মিত ব্রিফ করার সুবিধার্থে হোয়াইট হাউসে একটি অফিস পাওয়ার চেষ্টাও করেছিলেন বলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বরাত দিয়ে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে।

ট্রাম্পকে একসঙ্গে দুই বার্তা

সম্প্রতি ট্রাম্প ও শীর্ষ কর্মকর্তাদের এক বৈঠকে কেইন ইরানে যুদ্ধ আরও বাড়ানোর সম্ভাব্য ক্ষতি এবং যুক্তরাষ্ট্রের কমে যাওয়া অস্ত্রের মজুত নিয়ে সতর্ক করেন। তবে একই বৈঠকে তিনি এটিও স্পষ্ট করেন—ট্রাম্প যদি অভিযান চালানোর সিদ্ধান্ত নেন, মার্কিন সামরিক বাহিনী ইরানের ওপর ‘বিপুল ক্ষয়ক্ষতি’ ঘটাতে সক্ষম।

অর্থাৎ কেইনের অবস্থান অনেকটা ভারসাম্যপূর্ণ: তিনি ট্রাম্পকে সামরিক সক্ষমতার নিশ্চয়তা দিচ্ছেন, আবার একই সঙ্গে বোঝাচ্ছেন যে সেই সক্ষমতা ব্যবহার করলেই প্রেসিডেন্টের রাজনৈতিক ও কৌশলগত লক্ষ্য অর্জিত হবে—এমন নিশ্চয়তা নেই।

ব্যক্তিগত আলোচনায় আরও সরাসরি

তবে ব্যক্তিগত পর্যায়ে কেইন আরও সরাসরি বলেছেন, এই পর্যায়ে শুধু বোমাবর্ষণ করে ট্রাম্পের ঘোষিত লক্ষ্য অর্জন করা সম্ভব হওয়ার সম্ভাবনা কম। এমনকি কিছু কর্মকর্তা মনে করেন, ট্রাম্পের সঙ্গে আলোচনার সময় কেইন যথেষ্ট দৃঢ় অবস্থান নিচ্ছেন না।

একটি সূত্রের ভাষায়, ট্রাম্পের সঙ্গে আলোচনায় কেইন ‘সংযত হওয়া’ বা নিজের বক্তব্য কিছুটা সংযত রাখছেন।

সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে অবশ্য যুদ্ধ আরও বাড়ালে এর দ্বিতীয় ও তৃতীয় পর্যায়ের প্রভাব নিয়েও কেইন বেশি সরব হয়েছেন। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ অস্ত্র ও ক্ষেপণাস্ত্রের মজুত কমে যাওয়ার বিষয়টি তিনি অন্তত দুটি বৈঠকে তুলেছেন।

যুদ্ধের আগেই অস্ত্রের মজুত নিয়ে সতর্কতা

ইরান যুদ্ধ শুরুর আগেও কেইন ও অন্যান্য মার্কিন সামরিক কর্মকর্তা ট্রাম্পকে সতর্ক করেছিলেন যে দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধ হলে যুক্তরাষ্ট্রের অস্ত্রের মজুতের ওপর চাপ পড়বে—বিশেষ করে ইসরায়েল ও ইউক্রেনকে সরবরাহ করা অস্ত্রের ক্ষেত্রে।

এখন সিনিয়র মার্কিন সামরিক কর্মকর্তারা মজুতকে বিপজ্জনকভাবে কম বলে মনে করছেন বলে একটি সূত্র জানিয়েছে। এই পরিস্থিতি ইরানের সঙ্গে আলোচনায় যুক্তরাষ্ট্রের শক্ত অবস্থান প্রদর্শনের সক্ষমতাকেও ক্ষতিগ্রস্ত করছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

অস্ত্রের ঘাটতি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে পেন্টাগন ও ইউএস সেন্ট্রাল কমান্ডও সামরিক কৌশল পুনর্মূল্যায়ন করছে। এমনকি ইরানকে চাপ দেওয়ার নতুন ও প্রচলিত নয়—এমন উপায় খুঁজতে সেন্টকমের এক শীর্ষ কর্মকর্তা সামরিক কর্মকর্তাদের কাছে নতুন ধারণা চেয়েছেন।

‘যুদ্ধের মাঝপথে বিকল্প খোঁজা কঠিন’

কর্মকর্তাদের মতে, যুদ্ধ শুরুর ছয় মাস পর নতুন করে সামরিক কৌশলের ধারণা চাওয়াটা ইঙ্গিত দিচ্ছে যে পরিস্থিতি প্রত্যাশা অনুযায়ী এগোচ্ছে না।

একজন সূত্র বলেছেন, যুদ্ধ শুরু হওয়ার আগেই এসব বিকল্প তৈরি করা উচিত ছিল; যুদ্ধের মাঝপথে এগুলো খোঁজা কঠিন।

যুদ্ধ শুরুর আগেও কেইন বড় ধরনের অভিযান নিয়ে সতর্ক করেছিলেন। তিনি তখন সম্ভাব্য অভিযানের ব্যাপকতা, জটিলতা এবং মার্কিন সেনাদের সম্ভাব্য হতাহতের ঝুঁকি তুলে ধরেছিলেন।

শেষ পর্যন্ত ‘সম্মানজনক বের হওয়ার পথ’

তবে কেইনকে ঘিরে সমালোচনাও রয়েছে। কিছু সূত্র মনে করছে, দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধ পরিচালনার ক্ষেত্রে তার অভিজ্ঞতা নিয়ে প্রশ্ন উঠতে পারে। একজন সূত্র তাকে বর্তমান সংকট সামলানোর ক্ষেত্রে ‘তার সামর্থ্যের বাইরে’ বলেও মন্তব্য করেছেন।

তবু কেইন একা নন। প্রশাসনের অনেক কর্মকর্তা ও বাইরের বিশ্লেষকের মতে, ইরানকে সামরিকভাবে চূড়ান্তভাবে পরাজিত করতে হলে বড় ধরনের স্থল অভিযান প্রয়োজন হতে পারে, যাতে হাজার হাজার মার্কিন সেনার প্রাণহানির ঝুঁকি তৈরি হবে। বর্তমানে প্রশাসনের কেউ এমন চরম পদক্ষেপের পক্ষে প্রকাশ্যে অবস্থান নিচ্ছেন না।

তাই এখন কেইনসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের মূল লক্ষ্য হচ্ছে ট্রাম্পকে এমন একটি ‘অফ-র‍্যাম্প’ বা যুদ্ধ থেকে বের হওয়ার পথ খুঁজে দিতে, যেটিকে প্রেসিডেন্ট অন্তত একটি প্রতীকী বিজয় হিসেবে মার্কিন জনগণের কাছে তুলে ধরতে পারেন। এর সম্ভাব্য প্রথম ধাপ হতে পারে হরমুজ প্রণালি পুনরায় খুলে দেওয়ার বিষয়ে একটি সমঝোতা।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *