‘তিস্তাত পানি বাড়লেও হামার বিপদ, নামি গ্যাইলেও বিপদ’

তিস্তা নদী মানেই তিস্তাপাড়ের মানুষের জন্য এক নিত্য দুর্ভোগের নাম। নদীতে পানি বাড়লেই তলিয়ে যায় ঘরবাড়ি, দেখা দেয় বন্যা পরিস্থিতি; আর পানি কমতে শুরু করলেই শুরু হয় তীব্র নদীভাঙন। এই দুইয়ের কষাঘাতে বছরের পর বছর ধরে চরম কষ্টে জীবনযাপন করছেন রংপুর অঞ্চলের তিস্তাপাড়ের হাজার হাজার মানুষ। লালমনিরহাট, রংপুর, নীলফামারী, কুড়িগ্রাম ও গাইবান্ধা— এই পাঁচ জেলার ওপর দিয়ে প্রবাহিত ক্ষ্যাপাটে তিস্তা নদী হাজারও পরিবারের কান্নার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। প্রতিদিনের জীবনযুদ্ধে টিকে থাকাই এখন এই এলাকার বাসিন্দাদের মূল চ্যালেঞ্জ।

লালমনিরহাট সদর উপজেলার পশ্চিম হরিণচড়া গ্রামের কৃষক আব্দুল বাকি আকুতি প্রকাশ করে জানান, গতকাল সকাল থেকে রাত পর্যন্ত তিস্তা নদীর পানি অস্বাভাবিকভাবে বৃদ্ধি পাওয়ায় তাঁদের বসতবাড়িতে নদীর পানি ঢুকে পড়ে। ফলে পরিবার-পরিজন ও গবাদিপশু নিয়ে চরম বিপাকে পড়েছেন তাঁরা।

আজ বৃহস্পতিবার (৬ আগস্ট) সকাল থেকে পানি কমতে শুরু করেছে। তবে গ্রাম প্লাবিত হওয়ায় গতকাল বিকেলেই তারা গবাদি পশু নিয়ে নিরাপদ আশ্রয়ে চলে এসেছেন। তিনি জানান, জমিতে লাগানো রোপা আমন ধানের চারা পানিতে তলিয়ে গেছে। ৪-৫ দিনের মধ্যে খেত থেকে নদীর পানি নেমে না গেলে ধান গাছের ক্ষতি হবে।

এই কৃষকের ভাষায়, ‘হামরাগুলা তিস্তাপাড়োত কষ্ট করি বাঁচি আছি। হামারগুলার কষ্টের শ্যাষ আর নাই। তিস্তাত পানি বাড়লেও হামার কষ্ট আর পানি নামি গ্যাইলেও হামারগুলার কষ্ট। পানি বাড়লে বান হয় আর পানি নামি গ্যালি নদীভাঙন শুরু হয়। হামারগুলার খালি বিপদ আর বিপদ।’

গঙ্গাচড়া উপজেলার চর নেহালি গ্রামের কৃষক আকবর আলী জানান, গতরাতে তার বাড়িতে হাঁটু পানি ছিল। ফলে তারা বাড়িঘর ছেড়ে নিরাপদে চলে এসেছেন। আজ সকাল থেকে পানি কমছে। তবে আবারও তিস্তায় পানি বাড়তে পারে বলে ধারণা তার।

আকবর আলী বলেন, গেল দেড় মাস ধরে তিস্তা নদীর পানি ওঠানামা করছে। পানি একটু বাড়লেই তিস্তাপাড়ে বন্যা দেখা দেয় আর পানি নেমে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে দেখা দেয় ভাঙন। গেল এক মাসে তাদের গ্রামে প্রায় ২০০টি বসতভিটা নদীভাঙনের শিকার হয়েছে।

আকবর আলী বলেন, ‘হামার বাড়িটাও নদীর কাচারোত পড়ি গ্যাইছে। এইবার ভাঙন শুরু হইলে বাস্তুভিটাটা আর বাঁচা যাবার নয়। ১০ শতক বাস্তুভিটার জমিকোনাই মোর শ্যাষ সম্বল।’

কালীগঞ্জের শৈলমারী চরের কৃষক হযরত আলী বলেন, বুধবার সকাল থেকে রাত পযর্ন্ত নদীর পানিতে তাদের গ্রাম প্লাবিত হয়েছে। প্রত্যেক বাড়িতে ঘরের ভেতর নদীর পানি। গ্রামের সবগুলো রাস্তাঘাট পানিতে তলিয়ে গেছে। আজ সকাল থেকে পানি কমতে শুরু করেছে। তিনি বলেন, ‘তিস্তাত অল্প এ্যাকনা পানি বাড়লে হামারগুলার বাড়িঘরোত পানি ঢুকি যায়। পানি বাড়লে হামার এত্যি (এদিকে) বান হয় আর পানি কমি গ্যাইলে ভাঙন হয়। বান আর ভাঙনোত পড়ি হামরাগুলা প্রতনিয়িত জমি হারবার নাইকছি। হামারগুলার কপালোত সুখ আর নাই।’

পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) জানায়, বৃহস্পতিবার সকাল ৬টায় লালমনিরহাটের তিস্তা ব্যারেজ ডালিয়া পয়েন্টে তিস্তার পানি রেকর্ড করা হয় ৫২ দশমিক ১০ মিটার যা বিপৎসীমার (৫২.১৫ মিটার) ৫ সেন্টিমিটার নিচে। সকাল ৯টায় এ পয়েন্টে আরও ২ সেন্টিমিটার পানি হ্রাস পায়।

রংপুরের কাউনিয়া ও গাইবান্ধার তারাপুর পয়েন্টেও তিস্তার পানি বিপৎসীমার নিচে দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। তবে গতকাল সকালে ডালিয়া পয়েন্টে তিস্তার পানি বিপৎসীমার ১৩ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছিল।

পাউবো রংপুর অঞ্চলের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী আহসান হাবীব বলেন, গতকাল তিস্তার পানি বিপৎসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হলেও আজ সকালে পানি কমে বিপৎসীমার নিচে দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। তিস্তার পানি কমা অব্যাহত রয়েছে। উজানে ভারত থেকে পাহাড়ি ঢলের পানি না আসলে তিস্তার পানি বাড়বে না। তিনি বলেন, ‘এভাবেই গেল দেড় মাস ধরে তিস্তার পানি ওঠানামা করছে। তিস্তাপাড়ে সাধারণত ফ্লাশ ফ্লাড হয়ে থাকে। বন্যা পরিস্থিতি দেখা দিলে সর্বোচ্চ ২৪ ঘণ্টার মধ্যে পানি নেমে যায়।’

চলতি বছরে রংপুর অঞ্চলের তিন দফা বন্যায় ৫ শতাধিক বসতবাড়ি নদীগর্ভে বিলীন এবং ফসলের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে বলে জানান তিনি।

কৃষি বিভাগের হিসাব অনুযায়ী, রংপুর অঞ্চলের ৫ জেলা রংপুর, লালমনিরহাট, কুড়িগ্রাম, গাইবান্ধা ও নীলফামারীতে তৃতীয় দফায় স্বল্পমেয়াদি বন্যায় ৯ হাজার ৬০০ হেক্টর জমিতে বিভিন্ন ফসল ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

এ ব্যাপারে রংপুর কৃষি অঞ্চলের অতিরিক্ত পরিচালক সিরাজুল ইসলাম বলেন, যেসব কৃষক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন, তাদের তালিকা করে প্রণোদনা দেওয়া হবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *