কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালি দিয়ে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলের জন্য নতুন রুট নির্ধারণে ওমানের সঙ্গে সমঝোতায় পৌঁছেছে ইরান। একই সঙ্গে প্রণালিটি যৌথভাবে পরিচালনার ব্যবস্থা চূড়ান্ত করার কাজও শেষ পর্যায়ে রয়েছে বলে তেহরানের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে।
আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকদের মতে, এ সমঝোতা হরমুজ প্রণালি পুনরায় চালুর পথে একটি গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি। তবে ইরানের সরকারি সূত্রগুলো জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র যদি ইরানের গুরুত্বপূর্ণ বন্দরগুলোর ওপর আরোপিত নৌ অবরোধ প্রত্যাহার না করে, তবে পরিস্থিতি পুরোপুরি স্বাভাবিক হবে না।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল যৌথভাবে ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান শুরু করার পর থেকেই হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ মূলত তেহরানের হাতে চলে যায়। এরপর থেকে অনুমোদিত রুট ছাড়া অন্য পথে যাতায়াতকারী জাহাজের বিরুদ্ধে কড়া পদক্ষেপ নেওয়ার হুমকি দিয়ে আসছে তারা।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দাবি করেছিলেন, প্রণালি চালুর বিষয়ে ইরান ওয়াশিংটনের সঙ্গে সমঝোতা চায়। কিন্তু তেহরান তা নাকচ করে জানায়, তারা এ বিষয়ে প্রণালির বিপরীত তীরে অবস্থিত প্রতিবেশী দেশ ওমানের সঙ্গে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।
ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাকাই রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা ইরনাকে জানান, উভয় পক্ষ নতুন রুটের ভৌগোলিক স্থানাঙ্ক নির্ধারণে একমত হয়েছে। তৃতীয় কোনো পক্ষ হস্তক্ষেপ না করলে সমঝোতার প্রধান বিষয়গুলো নিয়ে দুই দেশের যৌথ বিবৃতি দ্রুতই চূড়ান্ত হবে।
তবে বাকাই স্পষ্ট করেন, এই সমঝোতা হলেও প্রণালি দিয়ে চলাচলকারী সব জাহাজের শতভাগ নিরাপত্তা নিশ্চিত হওয়া সম্ভব নয়। তিনি বলেন, হরমুজ প্রণালিকে অনিরাপদ করে তোলার ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকা এখনও বহাল রয়েছে। বিশেষ করে ইরানের বন্দরগুলোতে তাদের নৌ অবরোধ এবং আঞ্চলিক স্বার্থের বিরুদ্ধে উসকানিমূলক পদক্ষেপ প্রধান বাধা।
এই নিরাপত্তার ঝুঁকির বাস্তব প্রমাণ হিসেবে বুধবার ওমানের কুমজার থেকে নয় নটিক্যাল মাইল দক্ষিণ-পূর্বে হরমুজ প্রণালি অতিক্রমকালে একটি তেলবাহী ট্যাংকারের ক্যাপ্টেন দুটি বিকট বিস্ফোরণের শব্দ শুনেন। তবে ব্রিটেনের সামুদ্রিক নিরাপত্তা সংস্থা ইউকেএমটিও জানিয়েছে, ওই ঘটনার পর জাহাজ ও নাবিকরা নিরাপদ আছেন।
অন্যদিকে, ইয়েমেনের হুথিরা এক পৃথক বিবৃতিতে দাবি করেছে, তারা লোহিত সাগর ও এডেন উপসাগরে সৌদি আরবের দুটি তেলবাহী ট্যাংকার- ‘ওয়াফা’ ও ‘ডেইজিতে’ ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়েছে। গত মাসে সৌদির বিরুদ্ধে অবরোধ ঘোষণার পর এটি তাদের অষ্টম ও নবম হামলা। যদিও এ বিষয়ে সৌদি কর্তৃপক্ষের কোনো আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি।
উল্লেখ্য, এই যুদ্ধ শুরু হওয়ার আগে বিশ্বের মোট ব্যবহৃত তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের (এলএনজি) প্রায় এক-পঞ্চমাংশ এই হরমুজ প্রণালি দিয়েই পরিবাহিত হতো। জলপথটি বন্ধ হওয়ার পর বিশ্ববাজারে তেলের দাম কয়েক দফা বৃদ্ধি পায়, যা হোয়াইট হাউসের ওপর তীব্র রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক চাপ তৈরি করেছে।
মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স স্বীকার করেছেন, কূটনৈতিক অগ্রগতি ধীরগতির হওয়ায় ওয়াশিংটন হতাশ। ফক্স নিউজকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, ইরানের অভ্যন্তরীণ প্রশাসনিক জটিলতার কারণেই আলোচনায় বাড়তি সময় লাগছে।
বর্তমানে ইরান তাদের নিজস্ব উপকূলঘেঁষা রুট ব্যবহারের জন্য জাহাজগুলোকে উৎসাহিত করছে। অন্যদিকে ওমান উপকূল সংলগ্ন দক্ষিণাঞ্চলীয় পথটি কিছু জাহাজ ব্যবহার করলেও তা ঝুঁকিমুক্ত নয়। যুদ্ধের পর এবারই প্রথম হরমুজ প্রণালি দিয়ে যাতায়াতকারী জাহাজ থেকে নিয়মিত টোল আদায়ের নতুন কৌশল গ্রহণ করেছে তেহরান।