মহিপাল হত্যাযজ্ঞের ২ বছর : ন্যায়বিচার নিয়ে শঙ্কায় স্বজনরা

ফেনীর মহিপালে জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সময় ছাত্র-জনতার ওপর হামলার ঘটনায় হওয়া সাতটি হত্যা ও ১৫টি হত্যাচেষ্টাসহ মোট ২২টি মামলার বিচার কার্যক্রম এগোতে শুরু করলেও ন্যায়বিচার নিয়ে শঙ্কা কাটছে না নিহতদের স্বজন ও আহতদের। মামলাগুলোতে কয়েকশ অভিযুক্ত গ্রেপ্তার হলেও বেশিরভাগই জামিনে মুক্তি পেয়েছে।

অন্যদিকে হামলার মূল পরিকল্পনাকারী ও প্রকাশ্যে অস্ত্র হাতে গুলি চালানোর অভিযোগে অভিযুক্ত অনেকেই এখনও ধরাছোঁয়ার বাইরে। ফলে ঘটনার দুই বছর পরও ভুক্তভোগী পরিবারগুলোর মধ্যে হতাশা ও উৎকণ্ঠা বাড়ছে।

যদিও মামলার অগ্রগতি নিয়ে বাদীপক্ষের আইনজীবী, রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী ও পুলিশের বক্তব্যে কিছুটা ভিন্নতা রয়েছে। তবে পুলিশ বলছে, তদন্তে কোনো ধরনের পক্ষপাত করা হয়নি; ভিডিও ফুটেজ, আলামত ও সাক্ষ্য-প্রমাণের ভিত্তিতেই অভিযোগপত্র দাখিল করা হয়েছে।

২০২৪ সালের জুলাইয়ে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন একপর্যায়ে একদফা আন্দোলনে রূপ নেয়। ছাত্র-জনতার টানা আন্দোলনের মুখে ৫ আগস্ট দেশ ছেড়ে পালিয়ে যান তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। রাজধানীর পাশাপাশি ফেনীতেও আন্দোলন তীব্র আকার ধারণ করে।

সরকার পতনের আগের দিন, ৪ আগস্ট দুপুরে ফেনী শহরের মহিপাল এলাকায় আন্দোলনরত ছাত্র-জনতার ওপর আওয়ামী লীগ, ছাত্রলীগ, যুবলীগ ও সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীরা প্রকাশ্যে গুলি ও হামলা চালায় বলে অভিযোগ ওঠে। ওই ঘটনায় ঘটনাস্থলেই সাতজন নিহত হন। গুলিবিদ্ধ ও হামলায় আহত হন অসংখ্য আন্দোলনকারী। পরবর্তী সময়ে নিহতদের স্বজন ও আহতরা সাতটি হত্যা এবং ১৫টি হত্যাচেষ্টার মামলা করেন।

দুই বছর পেরিয়ে গেলেও সেই রক্তাক্ত দিনের ক্ষত আজও বয়ে বেড়াচ্ছেন নিহতদের স্বজনরা। তাদের অভিযোগ, প্রকাশ্যে অস্ত্র হাতে হামলাকারীদের ভিডিও ফুটেজ থাকলেও অনেক মূল আসামি এখনও গ্রেপ্তার হয়নি। ফলে বিচার প্রক্রিয়া নিয়ে তাদের মধ্যে অনিশ্চয়তা ও হতাশা বাড়ছে।

নিহত সরোয়ার জাহান মাসুদের মা বিবি কুলসুম কণ্ঠে বলেন, আমার ছেলে হত্যা মামলায় এত বেশি আসামি দেওয়ার প্রয়োজন ছিল না। দিনের আলোয় ঘটনাটি ঘটেছে। কার হাতে অস্ত্র ছিল, কে গুলি চালিয়েছে—সবই বিভিন্ন ভিডিও ফুটেজে স্পষ্ট দেখা যায়। সেসব ফুটেজ বিশ্লেষণ করে প্রকৃত হামলাকারীদের আসামি করা হলে বিচার আরও শক্ত ভিত্তির ওপর দাঁড়াত। কিন্তু একজন মা হিসেবে আজও আমি দেখতে পাচ্ছি, যারা আমার ছেলেকে হত্যা করেছে, তাদের অনেকেই প্রকাশ্যে ঘুরে বেড়াচ্ছে।

আমার ছেলে যে স্বপ্ন আর প্রত্যাশা নিয়ে জীবন দিয়েছিল, সেই স্বপ্ন এখনও পূরণ হয়নি। বরং অনেক ক্ষেত্রে মনে হয় দেশ আরও অনিশ্চয়তার দিকে যাচ্ছে। একটি মশার কামড়েই মানুষ যন্ত্রণা অনুভব করে। আর আমার ছেলের বুকে চারটি গুলি লেগেছিল। সেই যন্ত্রণা সে কীভাবে সহ্য করেছে, তা ভাবলেও বুকটা ফেটে যায়। আসলে গুলিগুলো শুধু আমার ছেলের বুকে লাগেনি, আমার বুকেও লেগেছে। গত দুই বছর ধরে সেই ক্ষত নিয়েই বেঁচে আছি। একজন মা হিসেবে আমার একটাই দাবি-যারা আমার ছেলেকে হত্যা করেছে, তাদের দ্রুত গ্রেপ্তার করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির আওতায় আনা হোক।

আন্দোলনে নিহত ওয়াকিল আহম্মদ শিহাবের মা মাহফুজা আক্তার বলেন, আমার ছেলে তো কোনো ছোট শিশু ছিল না; সে ছিল ১৯ বছরের একজন স্বপ্নবাজ তরুণ ছিল। কিন্তু সন্তান যত বড়ই হোক, মায়ের কাছে সে সবসময় ছোটই থাকে। রাতে ঘুমাতে যাওয়ার সময় যখন মনে হয় আমার ছেলে আর কোনো দিন ফিরে আসবে না, তখন সেই শূন্যতা ভাষায় প্রকাশ করা সম্ভব নয়। পৃথিবীর কোনো মা-ই এই কষ্ট কাউকে বোঝাতে পারবেন না। আজ যারা রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্বে আছেন, তারা যেন ভুলে না যান, এই পরিবর্তনের পেছনে আমাদের সন্তানদের আত্মত্যাগ রয়েছে। তারা রাজপথে না নামলে, জীবন না দিলে আজকের এই পরিবর্তন আসত না। সরকারের কাছে আমার অনুরোধ, শহীদ পরিবারগুলোকে শুধু সহানুভূতি জানানো নয়, ন্যায়বিচারও নিশ্চিত করতে হবে। আমরা সরকারের কাছ থেকে বিভিন্ন ধরনের সহযোগিতা পেয়েছি, কিন্তু এখনও আমার ছেলে হত্যার বিচার পাইনি। আমাদের সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি হবে প্রকৃত অপরাধীদের বিচার।

এদিকে, সেদিনের আন্দোলনে আহত অনেকেই দুই বছর পরও স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে পারেননি। কেউ স্থায়ীভাবে কর্মক্ষমতা হারিয়েছেন, কেউ দৃষ্টিশক্তি হারিয়েছেন, আবার কেউ এখনও শরীরে গুলি নিয়ে প্রতিনিয়ত যন্ত্রণা সহ্য করছেন। তাদের দাবি, হামলাকারীদের গ্রেপ্তার ও অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার না হওয়ায় এখনও নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন তারা।

জুলাইযোদ্ধা ফেনী জেলা কমিটির সদস্য সচিব নাসির উদ্দিন বলেন, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ট্রাংক রোডে আমার দুই পায়ে গুলি লাগে। দীর্ঘ চিকিৎসার পরও আজ পর্যন্ত সেই ক্ষত পুরোপুরি সেরে ওঠেনি। হাঁটাচলা করতেও কষ্ট হয়। ঘটনার পর আমি নিজেই একটি মামলা করেছি। কিন্তু প্রকাশ্যে যারা অস্ত্র হাতে গুলি চালিয়েছে, তাদের অনেকেই এখনও গ্রেপ্তার হয়নি। এতে শহীদ পরিবার ও আহতদের মধ্যে আতঙ্ক কাজ করছে। আমরা আশঙ্কা করছি, এসব অস্ত্র আবারও কোনো না কোনো সময় আমাদের বিরুদ্ধেই ব্যবহার হতে পারে। তাই প্রশাসনের কাছে আমাদের অনুরোধ, দ্রুত অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার এবং প্রকৃত অপরাধীদের আইনের আওতায় এনে আমাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হোক।

জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) ফেনী জেলা শাখার যুগ্ম সদস্য সচিব মুহাইমিন তাজিম বলেন, গণঅভ্যুত্থানে যারা অংশ নিয়েছেন, আহত হয়েছেন কিংবা শহীদ হয়েছেন, তাদের সবার মূল দাবি ছিল ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা। কিন্তু দুই বছর পরও সেই প্রত্যাশা পুরোপুরি পূরণ হয়নি। বিচারহীনতার এই সংস্কৃতি অব্যাহত থাকলে ভবিষ্যতে আবারও স্বৈরাচার বা ফ্যাসিবাদী শক্তি মাথাচাড়া দিয়ে উঠতে পারে। তাই শুধু মামলা করাই যথেষ্ট নয়, দ্রুত ও নিরপেক্ষ বিচার নিশ্চিত করাই এখন সবচেয়ে বড় প্রয়োজন।

এনসিপির জেলা শাখার যুগ্ম সদস্য সচিব (দপ্তর) ওমর ফারুক বলেন, ২০২৪ সালের ৪ আগস্ট মহিপালে পুলিশ, বিজিবি ও ম্যাজিস্ট্রেটের উপস্থিতিতে ছাত্রলীগ, যুবলীগ ও আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের হামলায় ঘটনাস্থলেই সাতজন নিহত হন। তাদের আত্মত্যাগের মধ্য দিয়ে যে গণঅভ্যুত্থান সফল হয়েছিল, সেই অভ্যুত্থানের চেতনাকে এখন বাস্তবে রূপ দেওয়াই সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। আমরা এমন একটি বাংলাদেশ চেয়েছিলাম, যেখানে সাম্য, ন্যায়, ইনসাফ ও বৈষম্যহীন সমাজব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত হবে। সেই লক্ষ্য পূরণে জুলাইয়ের চেতনার বাস্তবায়নের বিকল্প নেই।

মহিপালের সেই নারকীয় হত্যাযজ্ঞের স্মৃতি এখনও শিহরণ জাগায় বলে মন্তব্য করেন সেদিনের আন্দোলনের অন্যতম সংগঠক বিএনপিনেতা ও জেলা জজ আদালতের রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী (পিপি) মেজবাহ উদ্দিন ভুইয়া।

পিপি মেজবাহ উদ্দিন  বলেন, জুলাই বিপ্লবের মূল লক্ষ্য ছিল বৈষম্য দূর করা, ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা এবং দেশে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করা। কিন্তু অত্যন্ত দুঃখজনক হলেও সত্য, দীর্ঘ সময় পেরিয়ে গেলেও এসব হত্যাকাণ্ডের বিচার এখনও শেষ করা যায়নি। বর্তমান সরকারের কাছে আমাদের প্রত্যাশা, যারা আইনের শাসন, গণতন্ত্র ও মানুষের ভোটাধিকার প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে শহীদ হয়েছেন, তাদের পরিবারের সদস্যরা যেন দ্রুত ন্যায়বিচার পায়। কোনো শহীদ পরিবার যেন বিচার থেকে বঞ্চিত না হয়, সে বিষয়ে সরকারকে কার্যকর ও দৃঢ় পদক্ষেপ নিতে হবে।

পিপি মেজবাহ উদ্দিন খান আরও বলেন, ফেনীতে দায়ের হওয়া সাতটি হত্যা মামলার মধ্যে ছয়টির অভিযোগপত্র আদালতে দাখিল করেছে পুলিশ। এর মধ্যে পাঁচটি হত্যা মামলার বিচারিক কার্যক্রম ইতোমধ্যে শুরু হয়েছে। বাকি মামলাগুলোর তদন্ত ও বিচারিক প্রক্রিয়াও দ্রুত এগিয়ে নেওয়ার চেষ্টা চলছে।

পুলিশ সুপার প্রত্যুষ কুমার মজুমদার জানান, বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনকে কেন্দ্র করে জেলায় সাতটি হত্যা ও ১৫টি হত্যাচেষ্টার মামলা হয়েছে। এর মধ্যে ছয়টি হত্যা ও আটটি হত্যাচেষ্টার মামলায় অভিযোগপত্র আদালতে জমা দেওয়া হয়েছে। অন্য মামলাগুলোর তদন্তও শেষ পর্যায়ে রয়েছে।

পুলিশ সুপার বলেন, এসব মামলার মোট এজহার নামীয় দুই হাজার ৫০৫ জনকে আমাসি করা হয়েছে। তাদের মধ্য থেকে এক হাজার ১৯২ জনকে আটক করা হয়েছে। জুন পর্যন্ত ৮৬৫ জন জামিনে রয়েছে। তবে এসব মামলায় তদন্তে কোনো ধরনের পক্ষপাত করা হয়নি। ভিডিও ফুটেজ, সাক্ষ্য-প্রমাণ ও অন্যান্য আলামতের ভিত্তিতেই অভিযোগপত্র দেওয়া হয়েছে। বিচারিক প্রক্রিয়ায় যেন কোনো নিরপরাধ ব্যক্তি হয়রানির শিকার না হন এবং প্রকৃত অপরাধীরা যেন আইনের আওতায় আসে, সে বিষয়টি সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে দেখা হয়েছে।

তবে ভুক্তভোগী পরিবারগুলোর দাবি, মহিপালে ছাত্র-জনতার ওপর হামলার ঘটনায় করা সাতটি হত্যা ও ১৫টি হত্যাচেষ্টার মামলায় ঘুরেফিরে একই ব্যক্তিদের আসামি করা হয়েছে। তাদের মতে, ঘটনাস্থলের অসংখ্য ভিডিও ফুটেজ বিশ্লেষণ করলে হামলায় সরাসরি অংশ নেওয়া ব্যক্তিদের সহজেই শনাক্ত করা সম্ভব।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *