কলেজছাত্র ফয়জুল হত্যায় ভাইয়ের সাক্ষ্য ‘আওয়ামী সন্ত্রাসীদের সশস্ত্র অবস্থানের কারণে ছোট ভাইয়ের লাশ আনতে পারিনি’

২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সময় রাজধানীর মিরপুরে কলেজছাত্র ফয়জুল ইসলামকে (রাজন) গুলি করে হত্যার ঘটনায় আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল–২ এ সাক্ষ্য দিয়েছেন নিহতের বড় ভাই মো. রাজিব। এই মামলায় আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরসহ সাতজন আসামি পলাতক রয়েছেন।

আজ রোববার (২ আগস্ট) ২৮তম সাক্ষী হিসেবে রাজিব তার জবানবন্দি প্রদান করেন। তার সাক্ষ্য গ্রহণের মধ্য দিয়ে মামলাটির সাক্ষ্য গ্রহণ পর্ব শেষ হয়েছে। আগামী ৪ আগস্ট থেকে এই মামলায় যুক্তিতর্ক শুরু হওয়ার কথা রয়েছে।

আদালতে দেওয়া জবানবন্দিতে রাজিব জানান, তারা দুই ভাই ও এক বোন। ছোট ভাই ফয়জুল ইসলাম রাজন ঢাকা মডেল ডিগ্রি কলেজের দ্বাদশ শ্রেণির ছাত্র ছিলেন এবং পড়াশোনার পাশাপাশি একটি কসমেটিকসের দোকানে কাজ করতেন। ২০২৪ সালের ১৭ জুলাই থেকে তিনি বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে অংশ নিচ্ছিলেন। রাজিব নিজে সে সময় মিরপুর-১১ নম্বরের একটি প্রিন্টিং কারখানায় চাকরি করতেন।

ঘটনার দিনের বর্ণনা দিয়ে রাজিব বলেন, ১৯ জুলাই প্রিন্টিং কারখানায় কাজ শেষ করে তিনি কেরাণীগঞ্জের বাড়িতে যান। বাড়ি পৌঁছানোর পর তার মা জানান যে ছোট ভাইয়ের সঙ্গে কোনোভাবেই যোগাযোগ করতে পারছেন না; দুপুর ১২টার দিকে মায়ের সঙ্গে ফয়জুলের সর্বশেষ কথা হয়েছিল। তিনি আরও বলেন, সেদিন সন্ধ্যা ৬টার দিকে এক অপরিচিত নারী ফোন করে জানান ফয়জুল গুলিবিদ্ধ হয়ে মারা গেছেন। খবরটি নিশ্চিত করতে তিনি মিরপুর-৬-এ অবস্থানরত তার বোন শান্তাকে আজমল হাসপাতালে খোঁজ নিতে বলেন। পরে বোন রাত ৮টার দিকে হাসপাতালে গিয়ে ফয়জুলের মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত করেন।

হাসপাতাল থেকে নিহতের মরদেহ আনতে না পারার মর্মান্তিক বর্ণনা দিয়ে রাজিব জবানবন্দিতে বলেন, ওই সময় হাসপাতালের সামনে আওয়ামী লীগ, যুবলীগ এবং তাদের সহযোগী সংগঠনের সশস্ত্র সন্ত্রাসীরা অবস্থান করছিলেন। তাদের সশস্ত্র অবস্থানের কারণে ছোট ভাইয়ের গুলিবিদ্ধ মরদেহ সঙ্গে সঙ্গে হাসপাতাল থেকে আনতে পারেননি তারা। পরে দিবাগত রাত দেড়টার দিকে এক অপরিচিত ব্যক্তি অ্যাম্বুলেন্সে করে ফয়জুলের মরদেহ কেরাণীগঞ্জে তাদের বাড়িতে পৌঁছে দেন।

রাজিব জানান, বাড়িতে পৌঁছানোর পর ভাইয়ের বুকের ডানপাশে একটি গুলির ছিদ্র দেখতে পান। গুলিটি বুকের সামনে লেগে পিঠের দিক দিয়ে বের হয়ে গিয়েছিল। পরদিন স্থানীয় বাহেরচর কেন্দ্রীয় কবরস্থানে ফয়জুলকে দাফন করা হয়।

পরে খোঁজ নিয়ে ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বিভিন্ন সূত্রে জানতে পেরেছেন, যুবলীগের চেয়ারম্যান শেখ ফজলে শামস পরশ ও সাধারণ সম্পাদক মাইনুল হোসেন খান নিখিলের নির্দেশে আওয়ামী লীগ ও যুবলীগের সশস্ত্র সন্ত্রাসীরা তার ভাইকে হত্যা করেছেন। আদালত প্রাঙ্গণে তিনি ছোট ভাই হত্যার সুষ্ঠু বিচার দাবি করেন।

জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সময় সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের এই মামলায় আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরসহ মোট সাতজন আসামি রয়েছেন।

মামলার অন্য আসামিরা হলেন- আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিম, সাবেক তথ্য ও সম্প্রচার প্রতিমন্ত্রী মোহাম্মদ আলী আরাফাত, যুবলীগের চেয়ারম্যান শেখ ফজলে শামস পরশ, যুবলীগের সাধারণ সম্পাদক মাইনুল হোসেন খান নিখিল, ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় সভাপতি সাদ্দাম হোসেন এবং ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক শেখ ওয়ালী আসিফ ইনান।

মামলার সঙ্গে সংশ্লিষ্টরা জানান, এই মামলায় অভিযুক্ত সব আসামিই বর্তমানে পলাতক রয়েছেন। রাজিবের সাক্ষ্য শেষ হওয়ার মধ্য দিয়ে সাক্ষ্য পর্বের ইতি ঘটল এবং আগামী ৪ আগস্ট থেকে মামলাটির যুক্তিতর্ক শুরু হবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *