ভাগ্য বদলের আশা নিয়ে আফ্রিকা মহাদেশ থেকে অবৈধভাবে ইউরোপে প্রবেশের নতুন পথ হয়ে উঠেছে ‘সেউতা’ নামের একটি ছিটমহল। উত্তর আফ্রিকায় অবস্থিত স্পেনের নিয়ন্ত্রণাধীন এই ছিটমহলে প্রতিবেশী দেশ মরক্কো থেকে বিপুল সংখ্যক অভিবাসী সীমান্ত ভেঙে ঢুকে যাচ্ছে। জোর করে প্রবেশের এই চেষ্টার সময় পানিতে ডুবে ও পদদলিত হয়ে অন্তত ১৮ জন মারা গেছে বলে জানিয়েছে স্থানীয় কর্তৃপক্ষ। খবর আলজাজিরার।
শুক্রবার (৩১ জুলাই) বিভিন্ন সূত্র থেকে পাওয়া তথ্যে জানা গেছে, গত ১০ দিনে দেড় থেকে দুই হাজার মানুষ সেউতাতে প্রবেশ করেছে। সেউতার স্থানীয় সরকার এ খবর জানার পরপরই, রাতারাতি আরও হাজারো অভিবাসী সীমান্ত অতিক্রম করেছে।
সিভিল গার্ড অফিসারদের প্রতিনিধিত্বকারী একটি স্থানীয় শ্রমিক সমিতির নেতা রশীদ সবিহি বার্তা সংস্থা অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসকে (এপি) জানিয়েছেন, যে ১৮ জন মারা গেছেন তাদের অনেকেই ডুবে মারা গেছেন। তবে সেখানকার তারাজাল নামক সৈকতের ঢেউ-রোধক বেড়া পার হওয়ার সময় পদদলিত হয়েও কয়েকজন নিহত হয়েছেন। তিনি এই অবস্থাকে একটি ‘গুরুতর মানবিক সংকট’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন।
পরিস্থিতির ভয়াবহতায় আঞ্চলিক প্রেসিডেন্ট জেসুস ভিভাস গতকাল বৃহস্পতিবার সেখানে ‘মানবিক ও সামাজিক জরুরি অবস্থা’ ঘোষণা করেন এবং সীমান্তের নিয়ন্ত্রণ পুনরুদ্ধার করতে মাদ্রিদ থেকে সৈন্য পাঠানোর আহ্বান জানান।
তবে স্পেনের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জাতীয় জরুরি অবস্থা ঘোষণার দাবি প্রত্যাখ্যান করে জানিয়েছে যে, এমন পদক্ষেপে অভিবাসন সংকটের বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত নয়। পরে অবশ্য দেশটির স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ঘোষণা করে যে, সীমান্ত শক্তিশালী করতে সশস্ত্র বাহিনী ৬০ জন সেনা পাঠাবে।
বৃহস্পতিবারের বিভিন্ন ফুটেজে দেখা গেছে, ভূখণ্ডটিতে প্রবেশ করার সময় কিছু অভিবাসী ‘ভিভা এস্পানিয়া’ (স্পেন দীর্ঘজীবী হোক) বলে চিৎকার করছিলেন। তাদের অনেকেই মরক্কো থেকে বাতাস ভরা ভেলা বা টিউবে চড়ে জলপথ পাড়ি দিয়ে এখানে এসেছিলেন।
অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস জানায়, দলবদ্ধ লোকজনকে ডেউরোধক বেড়া পেরিয়ে স্থানীয় রাস্তায় হেঁটে যেতে দেখা গেছে। স্পেনের রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা ইএফই জানিয়েছে, লোকজন বেড়া ডিঙ্গিয়ে স্থলপথে সীমান্ত অতিক্রম করছে।
অভিবাসী অধিকার কর্মী জাকারিয়া জারোকি বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে জানিয়েছেন, অভিবাসীদের এই অস্বাভাবিক ভিড় ২০২১ সালের মে মাসের ঘটনার মতো। ওই সময় কয়েকদিনের মধ্যে প্রায় ১০ হাজার মরক্কো ও সাব-সাহারান যুবক এলাকাটিতে প্রবেশ করেছিল।
জারোকি বলেন, ‘আমরা কথা বলার পরও পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেছে।’ তিনি আরও জানান, সীমান্ত অতিক্রম করার আশায় মানুষ এখনো মরক্কোর ফনিদেক শহরে ভিড় করছে।
উত্তর আফ্রিকার আরেক স্বায়ত্তশাসিত স্প্যানিশ শহর মেলিলার পাশাপাশি সেউতা হলো আফ্রিকার সাথে ইউরোপীয় ইউনিয়নের একমাত্র স্থল সীমান্ত। এই দুটি শহরেই প্রায়শই ইউরোপে প্রবেশ করতে চাওয়া মানুষের সীমান্ত পার হওয়ার চেষ্টা করতে জড়ো হতে দেখা যায়।
জুলাই মাসের শুরুর দিকে, স্পেনের সুপ্রিম কোর্ট রায় দিয়েছিল যে, সেউতা বা মেলিলায় পৌঁছানোর চেষ্টাকালে সমুদ্রে বাধা পাওয়া বা আটক হওয়া অভিবাসীদের মরক্কোতে ফেরত পাঠানো যাবে না।
গার্ডিয়া সিভিলের একজন মুখপাত্র রয়টার্সকে বলেন, সুপ্রিম কোর্টের রায়ের পর থেকে এটি একটি ধীরগতির প্রবাহ ছিল, কিন্তু পরিস্থিতি হঠাৎ বিস্ফোরক রূপ নিয়েছে।
স্পেনের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, তারা এই অবৈধ অনুপ্রবেশ মোকাবিলায় মরক্কোর সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করছে। তারা মানব পাচারকারী নেটওয়ার্কগুলোকে সুপ্রিম কোর্টের রায়ের সুযোগ নিয়ে অবৈধ অভিবাসনে উৎসাহ দেওয়ার জন্য দায়ী করেছে।
পরিস্থিতি মূল্যায়নের জন্য স্পেনের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ফার্নান্দো গ্র্যান্ডে-মারলাস্কা শিগগির সেউতা সফর করবেন বলে আশা করা হচ্ছে।