‘শ্রাবণের মেঘগুলো জড়ো হলো আকাশে’-এই গানের পেছনের ইতিহাস এবং কেন এখন আলোচনায়

বাঙালির মনন ও অনুভূতির সাথে প্রকৃতি এক অদ্ভুত সুতোয় গাঁথা। বিশেষ করে বর্ষাকাল মানেই মন কেমন করা এক উদাসী হাওয়া, অঝোর ধারায় বৃষ্টি এবং পুরোনো স্মৃতির রোমন্থন। বাংলা গানে বর্ষার রূপ ও মানুষের মনের কোণে জমে থাকা মেঘের না বলা কথা যেভাবে প্রকাশ পেয়েছে, তার এক অনন্য শিল্পরূপ হলো ‘শ্রাবণের মেঘগুলো জড়ো হলো আকাশে’ গানটি। নব্বইয়ের দশকে প্রকাশিত এই গানটি কেবল একটি সাধারণ আধুনিক বা ব্যান্ড গানই নয়, এটি বাংলা গানপ্রেমীদের কাছে বর্ষার এক অবিকল্প প্রতিচ্ছবি। তবে সময়ের পরিক্রমায় গানটি কেবল প্রকৃতি বা স্মৃতিকাতরতার গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ থাকেনি; সম্প্রতি দেশের একটি বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক বিউটি রাণী পালের একটি রিল ভিডিওকে কেন্দ্র করে গানটি নতুন করে আলোচনায় এসেছে। ওই রিল ভিডিওটিকে কেন্দ্র করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে যে তীব্র সাইবার বুলিংয়ের ঘটনা ঘটেছে, তা আমাদের সমাজ ও মানসিকতার অন্ধকার দিকটিকেই নতুন করে ফুটিয়ে তুলেছে, যা এই গানটির আবহকে এক ভিন্ন ও বেদনাময় সামাজিক বাস্তবতার সাথে যুক্ত করেছে।

গানটি বাংলাদেশের জনপ্রিয় ব্যান্ড ‘ডিফারেন্ট টাচ’-এর অন্যতম সেরা সৃষ্টি। পরবর্তীতে ‘শ্রাবণের মেঘ’ অ্যালবামে এটি প্রকাশিত হয় এবং ব্যান্ডটির সিগনেচার ট্র্যাকে পরিণত হয়। এই জনপ্রিয় গানটিতে প্রথম কণ্ঠ দিয়েছিলেন আলী আহমেদ বাবু। গানটির পেছনে রয়েছে এক চমৎকার ও নাটকীয় ইতিহাস। সালটি ছিল ১৯৮৭। বাংলা শ্রাবণ মাস চলছে, আর প্রায় টানা তিন-চার দিন ধরে অবিরাম বৃষ্টি ঝরে চলেছে। সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার গতি কিছুটা হলেও স্তিমিত।

ডিফারেন্ট টাচ ব্যান্ডের প্রথম অ্যালবামের জন্য তখন ১২টি গান প্রস্তুত করার কথা ছিল। ১১টি গান রেকর্ডিংয়ের জন্য তৈরি থাকলেও অ্যালবাম পূর্ণাঙ্গ করতে আরও একটি গানের ভীষণ প্রয়োজন ছিল। গানটির কথা ও সুরের দায়িত্ব ছিল ব্যান্ডের সদস্য আশরাফ বাবুর ওপর। কিন্তু বহু চেষ্টা করেও মনের মতো কোনো লিরিক্স বা সুর কিছুতেই তাঁর মাথায় আসছিল না।

এমন সময় টানা তিন-চার দিনের একটানা বৃষ্টির মধ্যে কাটল তাঁর নির্ঘুম এক রাত। ঠিক শেষ রাতের দিকে ঢাকার মালিবাগে জানালার পাশে বসে বাইরে শ্রাবণের অঝোর ধারা দেখতে দেখতে হঠাৎ করেই আশরাফ বাবুর মাথায় স্ফুরণ ঘটে। প্রকৃতির সেই রূপ আর নিজের ভেতরের সুপ্ত অনুভূতি মিলিয়ে দেখতে দেখতে তিনি লিখে ফেললেন ‘শ্রাবণের মেঘগুলো জড়ো হলো আকাশে…’ ভোররাতের দিকে গানটির পুরো কাজ শেষ হয়।

পরবর্তীতে গানটির সুর ও সঙ্গীতায়োজনে যুক্ত হন উইনিং ব্যান্ডের শেলি ও চন্দন। প্রকাশের পর থেকেই গানটি শ্রোতাদের হৃদয়ে ঝড় তোলে এবং তৎকালীন বাংলাদেশ টেলিভিশনেও এটি ব্যাপকভাবে সমাদৃত হয়।

গানের কথা

শ্রাবণের মেঘগুলো জড়ো হলো আকাশে
অঝোরে নামবে বুঝি শ্রাবণে ঝড়ায়ে
আজ কেন মন উদাসী হয়ে
দূর অজানায় চায় হারাতে 

কবিতার বই সবে খুলেছি
হিমেল হাওয়ায় মন ভিজেছে
জানালার পাশে চাপা মাধবী
বাগান বিলাসী হেনা দুলেছে
আজ কেন মন চায় হারাতে

মেঘেদের যুদ্ধ শুনেছি
সিক্ত আকাশ কেঁদে চলেছে
থেমেছে হাঁসের জল কেলী
পথিকের পায়ে হাঁটা থেমেছে
আজ কেন মন চায় হারাতে
————

ব্যান্ড: ডিফারেন্ট টাচ (১৯৯০)
অ্যালবাম: শ্রাবনের মেঘ
গীতিকার ও সুরকার: আশরাফ বাবু

শিল্পী: মেজবাহ্ রহমান

সাম্প্রতিক প্রসঙ্গ ও সাইবার বুলিং বিতর্ক

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বৃষ্টির গানের সঙ্গে নিজের হাঁটাহাটির ভিডিও দিয়ে একটি গোষ্ঠির তোপের মুখে পড়েন সিলেটের স্কুল শিক্ষক বিউটি রানী পাল। ফেসবুকে তাকে নিয়ে ট্রল-হেনস্তা করেন কেউ কেউ। এমনকি ভিডিও করার কারণে জেলা পর্যায়ের শ্রেষ্ঠ এই স্কুল শিক্ষিকার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ারও দাবি ওঠে।

বিউটি রানী পাল সিলেটের ফেঞ্চুগঞ্জ উপজেলার পিটাইটিকর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষিকা। তিনি ২০২৬ সালে জেলা পর্যায়ের শ্রেষ্ঠ শিক্ষক নির্বাচিত হন। সম্প্রতি ভাইরাল হওয়া এক ভিডিওতে দেখা যায়, ‘শ্রাবণের মেঘগুলো জড়ো হলো আকাশে’ গানের সাথে স্কুল প্রাঙ্গণে খোলা চলে হাঁটাহাঁটি করছেন বিউটি। শাড়ি পরিহিত বিউটির এই ভিডিও নিয়ে ট্রল শুরু করে একটি গোষ্ঠী।

তবে এমন পরিস্থিতিতে বিউটি পালের পাশে দাঁড়িয়েছেন তার সহকর্মীসহ নানা পেশার মানুষজন। অভিনব পন্থায় বিউটি পালকে নিয়ে ট্রলের প্রতিবাদ জানাচ্ছেন দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের শিক্ষকরা। বিউটি পালের সাথে সংহতি জানিয়ে ফেসবুকে গানের সাথে নিজেদের ভিডিও আপ করছেন তারা। শিক্ষক ছাড়াও বিভিন্ন পেশার অনেকেও ভিডিও করে এই প্রতিবাদে অংশ নেন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *