বিশ্বকাপের গল্প সাধারণত লেখা হয় ট্রফি, গোল আর উৎসবকে ঘিরে! কিন্তু প্রতিটি বিশ্বকাপেরই আরেকটি অদৃশ্য অধ্যায় থাকে, যেখানে আলো নিভে যায় নিঃশব্দে। গ্যালারির করতালি থেমে গেলে, ক্যামেরার ফ্ল্যাশ নিভে গেলে আর জাতীয় সংগীতের শেষ সুর মিলিয়ে গেলে কিছু জার্সি চিরতরে হারিয়ে যায় আন্তর্জাতিক ফুটবলের মঞ্চ থেকে। ২০২৬ বিশ্বকাপও তার ব্যতিক্রম নয়। ফুটবলের একাধিক কিংবদন্তি এই আসরেই জাতীয় দলের জার্সিকে শেষবারের মতো বিদায় জানিয়ে রেখে গেলেন স্মৃতি, আবেগ আর এক একটি যুগের সমাপ্তির গল্প!
জার্মানির গোলবারের অবিচল প্রহরী ম্যানুয়েল নয়ারের বিদায় ছিল তিক্ত, কিন্তু অনুতাপহীন। ২০১০ সালে বিশ্বকাপ অভিষেকের পর ২০১৪ সালে জার্মানিকে বিশ্বচ্যাম্পিয়ন করার অন্যতম নায়ক ছিলেন তিনি।
ইউরো ২০২৪-এর পর আন্তর্জাতিক ফুটবল ছাড়ার সিদ্ধান্ত নিলেও বিশ্বকাপের আগে আবার জাতীয় দলে ফিরে আসেন। শেষ পর্যন্ত প্যারাগুয়ের বিপক্ষে পেনাল্টি শুটআটে বিদায়ের মধ্য দিয়ে শেষ হয় তার বিশ্বকাপ অধ্যায়। নিজের ২৩তম ও শেষ বিশ্বকাপ ম্যাচ শেষে নয়ারের কণ্ঠে ছিল আক্ষেপ নয়, বরং তৃপ্তি-ফিরে আসার সিদ্ধান্তে তার কোনো অনুশোচনা নেই।
ব্রাজিলিয়ান ফুটবলের ‘রাজপুত্র’ নেইমারের বিদায় ছিল আরও আবেগঘন। ২০১৪ বিশ্বকাপে দুর্দান্ত সূচনা করা এই ফরোয়ার্ডের ক্যারিয়ারজুড়ে বিশ্বকাপ ছিল অপূর্ণতার গল্প। ২০২৬ আসরেও চোট তাকে পুরোপুরি ছন্দে থাকতে দেয়নি। নরওয়ের বিপক্ষে ব্রাজিলের বিদায়ের ম্যাচে মাত্র ৫৫ মিনিট খেলেই শেষ হয়ে যায় তার বিশ্বকাপ যাত্রা। ম্যাচ শেষে আন্তর্জাতিক ফুটবলকে বিদায় জানিয়ে নেইমার স্মরণ করেন নিজের শুরুর দিনগুলো। যুক্তরাষ্ট্রের মেটলাইফ স্টেডিয়ামেই জাতীয় দলের পথচলা শুরু হয়েছিল, আর সেখানেই শেষ হলো তার আন্তর্জাতিক অধ্যায়!
আর্জেন্টিনার রক্ষণভাগের নির্ভরতার নাম নিকোলাস ওতামেন্দিও বিদায় নিয়েছেন বিশ্বমঞ্চ থেকেই। ২০১০ সালে বিশ্বকাপে অভিষেকের পর ২০২২ সালে কাতারে আর্জেন্টিনার শিরোপা জয়ের পুরো অভিযানে ছিলেন দলের অন্যতম ভরসা। মার্চেই অবসরের ঘোষণা দেওয়া এই ডিফেন্ডার ২০২৬ বিশ্বকাপে একটি ম্যাচ ছাড়া প্রায় সবগুলোতেই খেলেছেন। বিদায়ের আগে তিনি জানিয়ে দেন, এরপর থেকে বিশ্বকাপ তিনি দেখবেন একজন সাধারণ সমর্থক হিসেবে। নিজের শেষ ম্যাচে লিওনেল মেসির দেওয়া সম্মানও তার বিদায়কে আরও স্মরণীয় করে তোলে।
আফ্রিকার ফুটবলে এক যুগের প্রতীক সাদিও মানেও ২০২৬ বিশ্বকাপেই জাতীয় দলকে বিদায় জানান। সেনেগালকে প্রথম আফ্রিকা কাপ অব নেশনস জেতানোর নায়ক এবং দেশটির ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম সেরা এই ফরোয়ার্ড শেষ ষোলো থেকে বিদায়ের পর আবেগঘন বার্তায় বলেন, দেশের পতাকার জন্য নিজের সর্বস্ব উজাড় করে দিয়েছেন তিনি। জাতীয় দলের জার্সির প্রতি সেই দায়বদ্ধতাই ছিল তার বিদায়ের সবচেয়ে বড় পরিচয়।
আলজেরিয়ার হয়ে দীর্ঘ এক যুগের বেশি সময় ধরে নেতৃত্ব দেওয়া রিয়াদ মাহরেজের আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারও শেষ হয়েছে এই বিশ্বকাপে। ২০১৪ সালের পর আবার বিশ্বকাপ খেলতে তাকে অপেক্ষা করতে হয়েছে ১২ বছর। অস্ট্রিয়ার বিপক্ষে জোড়া গোল করেও শেষ পর্যন্ত দলকে এগিয়ে নিতে পারেননি। সুইজারল্যান্ডের কাছে হারের পর বিদায়বেলায় মাহরেজ বলেন, ছোটবেলা থেকেই আলজেরিয়ার জার্সি গায়ে খেলার স্বপ্ন দেখতেন তিনি। আফ্রিকান ফুটবল কনফেডারেশনও তাকে ধন্যবাদ জানিয়ে বলেছে, তিনি এমন স্মৃতি রেখে গেছেন যা সময় কখনো মুছে ফেলতে পারবে না।
মেক্সিকোর কিংবদন্তি গোলরক্ষক গিলিয়ার্মো ওচোয়ার বিদায়ও ছিল আবেগে মোড়া। ২০১৪ বিশ্বকাপে ব্রাজিলের বিপক্ষে দুর্দান্ত পারফরম্যান্সের মাধ্যমে বিশ্বজুড়ে পরিচিতি পাওয়া এই গোলকিপার ২০২৬ বিশ্বকাপে খুব বেশি খেলার সুযোগ পাননি। তবে চেক প্রজাতন্ত্রের বিপক্ষে শেষ কয়েক মিনিটের জন্য মাঠে নামতেই পুরো স্টেডিয়াম যেন দাঁড়িয়ে সম্মান জানিয়েছে তাকে। ম্যাচ শেষে কোচ হাভিয়ের আগিরে ওচোয়াকে বিশ্বমানের কিংবদন্তি বলে অভিহিত করেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ওচোয়াও জাতীয় দলের হয়ে খেলাকে জীবনের সবচেয়ে বড় অর্জন হিসেবে উল্লেখ করেন।
শুধু এই তারকারাই নন, ২০২৬ বিশ্বকাপ আন্তর্জাতিক ফুটবলের ইতি টানার মঞ্চ হয়ে উঠেছে আরও কয়েকজন পরিচিত মুখের জন্য। চেক প্রজাতন্ত্রের স্ট্রাইকার প্যাট্রিক শিক, ইকুয়েডরের ইতিহাসের সর্বোচ্চ গোলদাতা ইনার ভ্যালেন্সিয়া, অস্ট্রিয়ার অভিজ্ঞ ফরোয়ার্ড মার্কো আর্নাউতোভিচ, স্কটল্যান্ডের প্রবীণ গোলরক্ষক ক্রেগ গর্ডন এবং আইভরি কোস্টের মিডফিল্ডার জাঁ মাইকেল সেরিও বিশ্বকাপের পরই জাতীয় দলের জার্সি তুলে রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।
বিশেষ করে ইনার ভ্যালেন্সিয়া বিশ্বকাপে টানা ছয় গোল করার অনন্য কীর্তি রেখে বিদায় নিয়েছেন। অন্যদিকে দুই দশকের বেশি সময় ধরে স্কটল্যান্ডের গোলবার আগলে রাখা ৪৩ বছর বয়সী ক্রেগ গর্ডন শেষবারের মতো গ্লাভস খুলে রেখে শেষ করেছেন আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ার। আইভরি কোস্টের মাঝমাঠের প্রাণভোমরা জাঁ মাইকেল সেরিওও আফ্রিকান ফুটবলে নিজের সোনালি অধ্যায়ের ইতি টেনেছেন!
বিশ্বকাপ তাই শুধু নতুন নায়কের জন্ম দেয় না, বিদায় জানায় পুরোনো কিংবদন্তিদেরও। ২০২৬ সালের আসর শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ফুটবল হারিয়েছে এমন কিছু নাম, যারা দীর্ঘদিন ধরে বিশ্বমঞ্চকে আলোকিত করেছেন নিজেদের প্রতিভা, নেতৃত্ব ও অবিস্মরণীয় মুহূর্ত দিয়ে। আগামী বিশ্বকাপে নতুন মুখেরা হয়তো আলো ছড়াবেন, কিন্তু নয়ার, নেইমার, মানে, মাহরেজ কিংবা ওচোয়াদের মতো তারকাদের বিদায়ের আবেগ বিশ্বকাপের ইতিহাসে দীর্ঘদিন ধরে স্মরণীয় হয়ে থাকবে!
এসএন/পিডিকে