বদলে যাওয়া বিশ্বকাপের সাফল্য ও ব্যর্থতার গল্প

একদিকে ইতিহাসের সবচেয়ে বড় বিশ্বকাপ। অন্যদিকে, সবচেয়ে আলোচিত আসরগুলোর একটি। নতুন দেশগুলোর স্বপ্নপূরণ যেমন ছিল, তেমনি ছিল ৪৮ দলের নতুন ফরম্যাট, ভিএআর বিতর্ক, বাধ্যতামূলক হাইড্রেশন বিরতি, রাজনৈতিক টানাপোড়েন ও বাণিজ্যিকীকরণ নিয়ে প্রশ্ন। শেষ পর্যন্ত ফাইনালে আর্জেন্টিনাকে হারিয়ে বিশ্বচ্যাম্পিয়নের মুকুট পরে স্পেন। ট্রফির লড়াই শেষ হলেও আলোচনা থামেনি। বরং বিশ্বকাপ শেষ হওয়ার পর আরও জোরালো হয়েছে একটি প্রশ্ন, ফুটবল কি সত্যিই এগিয়ে গেল, নাকি বদলে গেল শুধু আয়োজনের ধরন?

এবারের বিশ্বকাপের সবচেয়ে বড় পরিবর্তন ছিল দলসংখ্যা ৩২ থেকে ৪৮ এ উন্নীত হওয়া। এর ফলে কেপ ভার্দে, কুরাসাও, জর্ডান ও উজবেকিস্তানের মতো দেশগুলো প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপের মঞ্চে নিজেদের তুলে ধরার সুযোগ পায়। বিশেষ করে কেপ ভার্দে পুরো টুর্নামেন্টে নিজেদের সামর্থ্যের প্রমাণ দিয়েছে।

আফ্রিকার দেশটি স্পেন ও উরুগুয়ের মতো পরাশক্তির বিপক্ষে পয়েন্ট আদায় করে তারা নকআউট পর্বে ওঠে। পরে আর্জেন্টিনাকেও অতিরিক্ত সময় পর্যন্ত কঠিন লড়াই উপহার দেয়। ছোট দলগুলোর এমন পারফরম্যান্স প্রমাণ করেছে। বিশ্বকাপের দরজা আরও দেশের জন্য খুলে দেওয়ার সিদ্ধান্ত পুরোপুরি অযৌক্তিক ছিল না।

তবে সমালোচনার জায়গাও কম ছিল না। ১০৪টি ম্যাচের দীর্ঘ সূচিতে গ্রুপ পর্ব থেকে বিদায় নেয় মাত্র ১৬টি দল। ফলে অনেক ম্যাচেই প্রতিদ্বন্দ্বিতার তীব্রতা কমে যায়। আবার আটটি তৃতীয় হওয়া দল নকআউট পর্বে ওঠায় কিছু ম্যাচে ড্র করাই দুই দলের জন্য যথেষ্ট হয়ে দাঁড়ায়। এতে গ্রুপ পর্বের রোমাঞ্চ কিছুটা ম্লান হয়েছে বলে মনে করেন অনেক বিশ্লেষক।

বিতর্কের আরেকটি বড় কারণ ছিল বাধ্যতামূলক তিন মিনিটের হাইড্রেশন বিরতি। ফিফা এটিকে খেলোয়াড়দের সুরক্ষার জন্য প্রয়োজনীয় বললেও অনেকের মতে, এটি সম্প্রচারকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য বিজ্ঞাপন দেখানোর অতিরিক্ত সুযোগ তৈরি করেছে। একই সঙ্গে বিরতির সময় কোচদের কৌশলগত নির্দেশনা অনেক ম্যাচের গতিপথও বদলে দিয়েছে।

অবশ্য কিছু পরিবর্তন ইতিবাচক প্রভাবও ফেলেছে। ফিফার রেফারিং প্রধান পিয়েরলুইজি কলিনার উদ্যোগে সময় নষ্ট কমাতে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া হয়। থ্রো ইন, গোলকিক ও বদলি দ্রুত সম্পন্ন হওয়ায় ম্যাচে কার্যকর খেলার সময় বেড়েছে। আগের বিশ্বকাপে বল খেলায় ছিল ম্যাচের ৫৭ দশমিক ৪ শতাংশ সময়, এবার তা বেড়ে হয়েছে ৬০ দশমিক ৪ শতাংশ। অর্থাৎ দর্শকরা আগের তুলনায় বেশি সময় ফুটবল উপভোগ করার সুযোগ পেয়েছেন।

ভিএআরও ছিল আলোচনার কেন্দ্রে। গ্রুপ পর্বে প্রযুক্তিটির ব্যবহার তুলনামূলক সফল হলেও নকআউট পর্বে একাধিক সিদ্ধান্ত বিতর্কের জন্ম দেয়। বিশেষ করে মিসরের বিপক্ষে আর্জেন্টিনার ম্যাচে বাতিল হওয়া গোল নিয়ে ব্যাপক সমালোচনা হয়। তবু একটি বিষয় স্পষ্ট, সিদ্ধান্ত নিতে আগের তুলনায় অনেক কম সময় লেগেছে, যা ভিএআরের অন্যতম ইতিবাচক দিক।

মাঠের বাইরের বিতর্কও কম ছিল না। ভিসা জটিলতা, ইরানকে ঘিরে রাজনৈতিক টানাপোড়েন, ফ্লোরিয়ান বালোগানের নিষেধাজ্ঞা স্থগিত হওয়া এবং টিকিটের উচ্চমূল্য পুরো টুর্নামেন্টজুড়েই আলোচনায় ছিল। তবু এসব বিতর্ক দর্শকদের আগ্রহে ভাটা ফেলতে পারেনি। স্টেডিয়ামগুলো প্রায় পূর্ণ ছিল। কোয়ার্টার ফাইনাল পর্যন্ত ৯৯ দশমিক ৭ শতাংশ আসন পূর্ণ ছিল এবং ৬৫ লাখের বেশি দর্শক মাঠে বসে খেলা উপভোগ করেছেন।

সব মিলিয়ে এবারের বিশ্বকাপ শুধু নতুন এক চ্যাম্পিয়নের জন্মই দেয়নি, ফুটবলের ভবিষ্যৎ নিয়েও অনেক গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে এনে দিয়েছে। ফাইনালে আর্জেন্টিনাকে হারিয়ে স্পেন বিশ্বচ্যাম্পিয়নের মুকুট জিতে নিয়েছে। সেই সাফল্যের পাশাপাশি ৪৮ দলের বিশ্বকাপ বিশ্ব ফুটবলের পরিধি বাড়িয়েছে। নতুন দেশগুলোকে স্বপ্ন দেখিয়েছে এবং জন্ম দিয়েছে অসংখ্য নতুন গল্পের।

তবে প্রতিযোগিতার মান, বাণিজ্যিকীকরণ, প্রযুক্তির ব্যবহার ও রাজনৈতিক প্রভাব নিয়ে বিতর্কও সমানতালে চলেছে। তাই এই বিশ্বকাপকে শুধু স্পেনের শিরোপা জয়ের জন্য নয়, বদলে যাওয়া বিশ্ব ফুটবলের নতুন বাস্তবতার প্রতীক হিসেবেও মনে রাখা হবে। ভবিষ্যতের বিশ্বকাপ কোন পথে এগোবে, তার অনেকটাই নির্ধারণ করবে এই আসরের শিক্ষা ও অভিজ্ঞতা।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *