কিছু ম্যাচ শুধু ফুটবলের ৯০ মিনিট নয়, তার চেয়েও অনেক বেশি কিছু! কিছু ম্যাচ হয়ে ওঠে একটি যুগের শেষ অধ্যায়ের সম্ভাব্য মঞ্চ। টরন্টো স্টেডিয়ামে পর্তুগাল ও ক্রোয়েশিয়ার মুখোমুখি লড়াই ঠিক তেমনই এক ম্যাচে। কারণ এটি শুধু শেষ ষোলোর টিকিটের লড়াই নয়, দেখা যেতে পারে বিশ্ব ফুটবলের দুই কিংবদন্তি ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো অথবা লুকা মদরিচের শেষ বিশ্বকাপ উপস্থিতিও। যার দল তার হারবে তার ক্যারিয়ারেরও ইতি!
এই ঐতিহাসিক সম্ভাবনাই ম্যাচটির চাহিদাকে নিয়ে গেছে আকাশচুম্বী পর্যায়ে। কানাডার টরন্টোতে অনুষ্ঠেয় শেষ ৩২-এর ম্যাচের কিছু টিকিট অনলাইনে পুনর্বিক্রয় বাজারে ৩০ হাজার কানাডিয়ান ডলারেরও বেশি দামে বিক্রি হতে দেখা গেছে। টিকিট বিক্রির ওয়েবসাইটগুলোতে হাজার হাজার ডলারের বিনিময়ে আসন পাওয়ার সুযোগ থাকলেও সবচেয়ে কম দামের একক টিকিটও ছাড়িয়ে গেছে ২ হাজার ৬০০ ডলার।
বাংলাদেশি মুদ্রায় হিসাব করলে ৩০ হাজার কানাডিয়ান ডলার ২৬ লাখ টাকারও বেশি। একটি ম্যাচ মাঠে বসে দেখার জন্য দর্শককে গুনতে হচ্ছে বিস্ময়কর অঙ্কের টাকা!
অথচ বিশ্বকাপের মূল টিকিট বিক্রির সময় ফিফার মাধ্যমে এই ম্যাচের টিকিটের দাম ছিল ৩৩৫ থেকে ৮৭৫ ডলারের মধ্যে। কিছু প্ল্যাটফর্মে সবচেয়ে কম দামের একক টিকিটও বিক্রি হয়েছে ২ হাজার ৬০০ ডলারের বেশি দামে। অথচ বিশ্বকাপের শুরুতে ফিফার অফিসিয়াল বিক্রির সময় এই ম্যাচের টিকিটের দাম ছিল ৩৩৫ থেকে ৮৭৫ ডলারের মধ্যে। ৩০ হাজার থেকে ৭৫ হাজার টাকার মধ্যে।
কিন্তু সময় যত এগিয়েছে, ততই বেড়েছে চাহিদা। ম্যাচের গুরুত্ব, দুই দলের সমর্থকদের আবেগ এবং দুই মহাতারকার সম্ভাব্য শেষ বিশ্বকাপ-সব মিলিয়ে টিকিট বাজারে তৈরি হয়েছে অস্বাভাবিক পরিস্থিতি।
কনজিউমার চয়েস সেন্টারের পলিসি পরিচালক ডেভিড ক্লেমেন্টের মতে, এই ম্যাচের চাহিদা বাড়ার পেছনে দুটি বড় কারণ রয়েছে। প্রথমত, টরন্টো অঞ্চলে পর্তুগিজ ও ক্রোয়েশিয়ান বংশোদ্ভূত মানুষের বড় একটি সম্প্রদায় রয়েছে। ফলে দুই দেশের সমর্থকদের জন্য এই ম্যাচ শুধু একটি খেলা নয়, নিজেদের সংস্কৃতি ও আবেগের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা একটি মুহূর্ত।
দ্বিতীয় কারণটি আরও বিশেষ। ক্লেমেন্টের মতে, এটি হতে পারে দুই দেশের সর্বকালের সেরা খেলোয়াড়দের শেষ বিশ্বকাপ ম্যাচ। পর্তুগাল যদি হেরে যায়, তাহলে সম্ভাবনা রয়েছে এটি হবে ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদোর শেষ বিশ্বকাপ ম্যাচ। একইভাবে ক্রোয়েশিয়ার বিদায় মানে গ্রেট লুকা মদরিচের বিশ্বকাপ অধ্যায়েরও শেষ হতে পারে।
রোনালদো ও মদরিচ-দুজনই শুধু নিজ নিজ দেশের তারকা নন, তারা একটি প্রজন্মের প্রতীক! রোনালদোর গোল, নেতৃত্ব ও দীর্ঘ ক্যারিয়ার তাকে বিশ্ব ফুটবলের অন্যতম সেরা খেলোয়াড়ের কাতারে নিয়ে গেছে। অন্যদিকে মদরিচ ছোট একটি দেশ ক্রোয়েশিয়াকে বিশ্ব ফুটবলের বড় মঞ্চে প্রতিষ্ঠিত করেছেন। ২০১৮ বিশ্বকাপে তার নেতৃত্বে ক্রোয়েশিয়ার ফাইনালে ওঠা ছিল ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম অনুপ্রেরণাদায়ক গল্প।
তাই টরন্টোর এই ম্যাচের গুরুত্ব শুধু টুর্নামেন্টের কাঠামোর মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। এটি হতে পারে এমন এক মুহূর্ত, যেখানে কোটি দর্শক প্রত্যক্ষ করবেন দুই কিংবদন্তির বিদায়ের দৃশ্য।
তবে টিকিটের অস্বাভাবিক দামের কারণে তৈরি হয়েছে বিতর্কও! অন্টারিও সরকার চলতি বছরের শুরুতে ফেস ভ্যালুর চেয়ে বেশি দামে টিকিট পুনর্বিক্রয় নিষিদ্ধ করে আইন পাস করেছে। আইন কার্যকর হলেও বিশ্বকাপের এই ম্যাচের ক্ষেত্রে সেই নিয়ম বাস্তবায়ন নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। কারণ পুনর্বিক্রয় প্ল্যাটফর্মগুলো বলছে, একজন বিক্রেতা আসলে কত দামে টিকিট কিনেছিলেন সেটি যাচাই করা কঠিন।
টিকিট বিক্রির প্ল্যাটফর্মগুলো যুক্তি দিচ্ছে, কঠোর নিয়ন্ত্রণের কারণে বাজার পুরোপুরি বন্ধ করা সম্ভব নয়। বরং এতে অনিয়ন্ত্রিত মাধ্যমে টিকিট বিক্রি বাড়তে পারে, যেখানে প্রতারণার ঝুঁকি আরও বেশি। ডেভিড ক্লেমেন্টও মনে করেন, শুধু আইন করলেই সমস্যার সমাধান হবে না, কার্যকর প্রয়োগ প্রয়োজন।
তার মতে, উচ্চমূল্যের টিকিট মূলত চাহিদার প্রতিফলন। তিনি এই ম্যাচের তুলনা করেছেন টরন্টোতে বড় কোনো বৈশ্বিক তারকার কনসার্টের সঙ্গে। কারণ রোনালদো ও মদরিচকে নিয়ে এমন একটি বিশ্বকাপ নকআউট ম্যাচ ভবিষ্যতে আর কখনো দেখা যাবে কি না, তার নিশ্চয়তা নেই।
পর্তুগাল-ক্রোয়েশিয়ার এই লড়াই তাই এক ধরনের ‘ওয়ান টাইম ইভেন্ট’। একজন দর্শক হয়তো শুধু একটি ফুটবল ম্যাচ দেখতে যাচ্ছেন না, তিনি দেখতে যাচ্ছেন ইতিহাসের একটি সম্ভাব্য শেষ অধ্যায়।
৩ জুলাই বাংলাদেশ সময় ভোর ৫টায় টরন্টো স্টেডিয়ামে শুরু হবে এই মহারণ। জয়ী দল যাবে শেষ ষোলোতে, পরাজিত দলের বিশ্বকাপ শেষ হয়ে যাবে। কিন্তু ফল যাই হোক, রোনালদো-মদরিচের উপস্থিতি এই ম্যাচকে ইতোমধ্যেই দিয়ে ফেলেছে বিশ্বকাপের অন্যতম স্মরণীয় লড়াইয়ের মর্যাদা!
এসএন/কে