জার্মানিকে হতাশায় ডুবিয়ে প্যারাগুয়ের নায়ক অরল্যান্ডো গিল দলের সঙ্গে জয় উদযাপন করছেন। ছবি : এএফপি
পুরো ম্যাচে নায়ক ছিলেন তিনি। জার্মানির একের পর এক আক্রমণ রুখে দিয়ে প্যারাগুয়েকে নিয়ে এসেছিলেন টাইব্রেকারে। সেখানে যেনো নিজেকেই ছাড়িয়ে গেলেন প্যারাগুয়ের গোলরক্ষক অরল্যান্ডো গিল। জার্মানদের দুটি শট আটকে দিলেন তিনি। ‘ওয়ান ম্যান আর্মি’ হিসেবে উত্তর আমেরিকার দেশটির নায়ক বনে গেলেন গিল। জার্মানির স্বপ্ন ভেঙে প্যারাগুয়েকে নিয়ে গেলেন শেষ ষোলোতে।
মঙ্গলবার (৩০ জুন) বাংলাদেশ সময় রাত আড়াইটায় যুক্তরাষ্ট্রের বোস্টন স্টেডিয়ামে শেষ ৩২- এর ম্যাচে মুখোমুখি হয়েছে জার্মানি আর প্যারাগুয়ে। মূল ম্যাচ ১-১ গোলে ড্র হওয়ায় খেলায় গড়ায় টাইব্রেকারে। সেখানে জার্মানিকে ৪-৩ গোলে হারিয়ে শেষ ষোলোতে জায়গা করে নিয়েছে প্যারাগুয়ে। বিশ্বকাপে এই প্রথম টাইব্রেকারে হারল জার্মানি। এর আগের চারবারই তারা ছিল সফল দল। অন্যদিকে ২০১০ সালের পর আবার টাইব্রেকার জিতল প্যারাগুয়ে।
টাইব্রেকারেও নাটকীয়তার কোনো কমতি ছিল না। জার্মানির হয়ে প্রথম টাইব্রেকার শট নিতে আসে কাই হাভার্টজ। বামপ্রান্তে ঝাপিয়ে পড়ে তার দুর্বল শট সহজেই আটকে দেন গিল। প্যারাগুয়ের মরিসিও কোনো ভুল করেননি। তিনি বল জালে জড়িয়ে দেন। দ্বিতীয় শটে কোনো ভুল করেননি জশুয়া কিমিখ। পরে নয়্যারকে বোকা বানান প্যারাগুয়ে অধিনায়ক গুস্তাভো গোমেস।
তৃতীয় শট নিতে এসে ডান দিকে মারেন জামাল মুসিয়ালা। সেদিকেই ঝাঁপান গিল। তবে অল্পের জন্য নাগাল পাননি ২৬ বছর বয়সী কিপার। পরে শট নিতে এসে চমৎকার নিচু শটে ডান দিকে মেরে নয়্যারকে পরাস্ত করেন মাতিয়াস গালারজা।
চতুর্থ শট নেওয়া নিক ভোল্টেমেডের শটও আটকে দেন গিল। ফলে প্যারাগুয়ের সামনে সুযোগ আসে জিতে যাওয়ার। কিন্তু আন্তোনিও সানাব্রিয়া ডান পাশ দিয়ে বাইরে মারলে বাড়ে তাদের অপেক্ষা। পঞ্চম শটে কোনো ভুল করেননি নাদিয়েম আমিরি। তবুও পঞ্চম শটে গোল করলেই জিতে যেত প্যারাগুয়ে। কিন্তু ফাবিয়ান বালবুয়েনা বাম দিকে শট নিলে সেদিকেই ঝাঁপিয়ে ঠেকিয়ে দেন নয়্যার। ফলে খেলা গড়ায় ষষ্ঠ শটে।
ষষ্ঠ শট নিতে এসে জার্মানির হয়ে ষষ্ঠ শট নিতে আসা জনাথন তাহ কে রাজ্যের চাপ চেপে ধরেছিল। বল গ্যালারিতে উড়িয়ে মারেন তিনি। পরের শট নিতে এসে প্যারাগুয়ের হোসে মারিয়া কানালে গোল করার সঙ্গে সঙ্গে বাঁধভাঙা উল্লাসে মেতে ওঠে প্যারাগুয়ে। আর হতাশার কালো মেঘ চেপে বসে জার্মান শিবিরে।
এই এক গোলেই ইতিহাস গড়েন এনসিসো। বিশ্বকাপের নকআউটে প্যারাগুয়ের হয়ে প্রথম গোল করলেন তিনি। এর আগে চার বিশ্বকাপের নকআউট পর্বে পাঁচ ম্যাচ খেললেও কোনো গোল দিতে পারেনি উত্তর আমেরিকার দেশটি। ১-০ ব্যবধানে এগিয়ে থেকে বিরতিতে যায় প্যারাগুয়ে।
বিরতির পর গোল পেয়ে আত্মবিশ্বাসী হয়ে ওঠা প্যারাগুয়ে লড়াই করে সমানে সমান। দ্বিতীয় গোলের সুযোগও পেয়েছিল তারা। তবে এ যাত্রায় জার্মানিকে রক্ষা করেন নয়্যার। জসুয়া কিমিখের ব্যাক পাস গোলরক্ষকের কাছে পৌঁছানোর আগেই গোলমুখে প্লেসিং শট নিয়েছিলেন হুলিও এনসিসো। পা দিয়ে সেটি আটকে দেন নয়্যার।
ম্যাচের ৫৩তম মিনিটে দৃষ্টি নন্দন গোলে জার্মানিকে সমতায় ফেরান হাভার্টজ। বামপ্রান্তে বল পেয়ে কিছুটা এগিয়ে বক্সের অনেকটা দূরে থেকে বক্সের মধ্যে ক্রস বাড়িয়েছিলেন হাভার্টজ। সেটি কাউকে খুঁজে না পেলেও দূরের পোস্ট দিয়ে জালে জড়ায় বল। গোলরক্ষকের এখানে কিছুই করার ছিল না।
ম্যাচের ৭৮তম মিনিটে জার্মানিকে হতাশ করে প্যারাগুয়েকে ম্যাচে রাখেন গোলরক্ষক অরল্যান্ডো গিল। ডি-বক্সের মধ্যে বাড়ানো ফ্লোরিয়ান ভির্টজের ক্রস খুঁজে নিয়েছিল হাভার্টজকে। জার্মান ফরোয়ার্ড লাফিয়ে উঠে দারুণ হেড করেছিলেন। তবে আরও দারুণভাবে সেটি আটকে দেন গোলরক্ষক গিল।
গোলের জন্য মরিয়া জার্মানি এরপরও সমানতালে আক্রমণ চালিয়ে গেছে। জমাট রক্ষণে সেই আক্রমণ প্রতিহত করে ক্ষণে ক্ষণে ভীতি ছড়িয়েছে প্যারাগুয়ে। তবে গোল আর পায়নি কোনো দল। নির্ধারিত সময়ের খেলা ১-১ গোলের সমতায় থাকায় খেলা গড়ায় অতিরিক্ত সময়ে।
৯৭তম মিনিটে ভালো আক্রমণ তৈরি করেছিল জার্মানি। ডি-বক্সের মধ্যে উড়ে আসা ক্রস প্রথমে নিচে নামিয়ে শট নিয়েছিলেন নিক ভোল্টমেড। তবে দারুণভাবে সেটি আটকে দেন প্যারাগুয়ের দুই ডিফেন্ডার। ৯৯তম মিনিটে সুযোগ পেয়েও বলে মাথা ছোঁয়াতে ব্যর্থ হন জনাথন তাহ।
১০৩তম মিনিটে ঠিকই প্যারাগুয়ের জালে বল জড়িয়েছিলেন তাহ। কর্ণার থেকে উড়ে আসা বল দূরের পোস্টে অনেকটা লাফিয়ে উঠে হেডে গোলরক্ষককে পরাস্ত করেন তিনি। সঙ্গে সঙ্গে উল্লাসে ফেটে পড়ে জার্মান শিবির। তবে মুহূর্তেই উড়ে যায় সেই উল্লাস। ভিএআর মনিটরে দেখা যায় গোল হওয়ার আগে গোলরক্ষকে ফাউল করেছিলেন ভালদেমার অ্যান্টন। ফলে গোল বাতিলের সিদ্ধান্ত দেন রেফারি।
অতিরিক্ত সময়ের যোগ করা সময়ের চতুর্থ মিনিটে দারুণ দক্ষতায় প্যারাগুয়েকে রক্ষা করে জার্মানিকে হতাশ করেন গোলরক্ষক গিল। হাভার্টজের ক্রস প্রথম দফায় গোললাইন থেকে আটকে দিয়ে দ্বিতীয় প্রচেষ্টায় গ্লাভসবন্দি করেন বল।
১১০তম মিনিটে কর্ণার থেকে অলিম্পিক গোলের চেষ্টা করেছিলেন কিমিখ। তবে পাঞ্চ করে সেটি বাইরে পাঠিয়ে দেন গোলরক্ষক গিল। মূল ম্যাচে আর গোল না হওয়ায় খেলা গড়ায় টাইব্রেকারে। এবারের বিশ্বকাপে এটাই প্রথম টাইব্রেকার।
sm/sks