এটিএম বুথ ও ই-ওয়ালেটে ভোগান্তি, এদিক-ওদিক ছোটাছুটিতে গ্রাহক

তৌহিদ জামান সরকারি চাকরিজীবী। পরিবার নিয়ে ঢাকার ধোলাইপাড়ে থাকেন। নগদ টাকা বহনের ঝামেলা এড়াতে ব্যাংকের এটিএম কার্ডের ওপর নির্ভরশীল। কেনাকাটার ক্ষেত্রে বেশিরভাগ সময় এটিএম কার্ডের মাধ্যমে বিল পরিশোধ করেন। সবসময় এ ধরনের লেনদেনে বেশি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন তিনি।

একই অবস্থা বেসরকারি চাকরিজীবী শুভ্র সিনহার, থাকেন ধানমণ্ডিতে। বিল পরিশোধসহ টাকা ট্রান্সফারের জন্য ই-ওয়ালেটের (ডিজিটাল ওয়ালেট) ওপর নির্ভরশীল তিনি। এটিএম বুথের ওপর পুরোপুরি নির্ভরশীল মনির হোসেন, সাফিন আলী ও লতিফ আকন্দও।

আজ মঙ্গলবার (২৬ মে) কথা হয় তাদের সঙ্গে। অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরে অভিযোগ জানান এটিএম বুথ ও ই-ওয়ালেটের নানা ভোগান্তির বিষয়ে। বলেন এটিএম বুথে টাকা না থাকার নানা সমস্যাসহ কষ্টের কথা।

এনটিভি অনলাইনকে তৌহিদ জামান বলেন, ‘প্রতিবছর ঢাকায় সামর্থ্য অনুসারে কোরবানি দেই। এতদিন ভাগে দিলেও এবারে একাই গরু কোরবানি দেওয়ার নিয়ত করেছি। হাটে যাওয়ার আগে ধোলাইপাড়সহ যাত্রাবাড়ীর বেশকিছু এটিএম বুথে ছোটাছুটি করে টাকা তোলার চেষ্টা করে ব্যর্থ হই। কারণ বেশির ভাগ এটিএম বুথে টাকা নেই। সার্ভার সমস্যাসহ অন্য ব্যাংকের কার্ড ব্যবহারে জটিলতাও আছে। তাই নগদ টাকা না তুলেই কমলাপুর হাটে এসেছি। অল্প সময়ের মধ্যে গরুও পছন্দ হয়েছে। কিন্তু অনলাইনে বিল পরিশোধে সমস্যা হচ্ছে। আরও দুটি এটিএম বুথ ঘুরে পরে মতিঝিলের ব্র্যাক ব্যাংকের এটিএম বুথ থেকে টাকা তুলেছি।’ 

ই-ওয়ালেটের ভোগান্তি নিয়ে কথা বলেন শুভ্র সিনহা। তিনি বলেন, ‘সোনালী ব্যাংকের ই-ওয়ালেট ব্যবহার করছি দীর্ঘদিন ধরে। ব্যাংকটির ই-ওয়ালেট সেবা এখন খুবই খারাপ, ব্যবহার করতে রীতিমতো ভয় লাগে। অনলাইনে বিল পরিশোধসহ টাকা ট্রান্সফারে ই-ওয়ালেটে নানা সমস্যার সামনে পড়তে হচ্ছে। অন্য ব্যাংকের এটিএম বুথ থেকে টাকা তুলতেও নানা জটিলতা হচ্ছে। এছাড়া সোনালী ব্যাংকের সার্ভার সমস্যাতো আছেই।’ 

শুভ্র সিনহা বলেন, ‘গতকাল ই-ওয়ালেটের এনপিএসবির মাধ্যমে ৪৫ হাজার টাকা অন্য ব্যাংকে ট্রান্সফার করতে গিয়ে রীতিমতো ভয় পেয়েছি। এনপিএসবির মাধ্যমে টাকা পাঠালে তা মুহূর্তের মধ্যে প্রত্যাশিত একাউন্টে চলে যায়। কিন্তু আমার বেলায় ব্যালেন্স কেটেছে ঠিকই কিন্তু কাঙ্খিত একাউন্টে টাকা ট্রান্সফার হয়নি। পরে ব্যাংকটির জরুরি নম্বরে যোগাযোগ করা হলে আমাকে অপেক্ষা করতে বলে। একদিন পর সেই টাকা যোগ হয়েছে।’

সোনালী ব্যাংকের সার্ভার সমস্যা নতুন কিছু না জানিয়ে একই ব্যাংকের গ্রাহক মনির হোসেন বলেন, ‘প্রতি ঈদের ছুটিতে দেখছি, এই ব্যাংকের এটিএম বুথ সেবা খুবই খারাপ থাকে। এসময় অন্য ব্যাংকের এটিএম বুথে বেশিরভাগ ক্ষেত্রে সোনালী ব্যাংকের এটিএম কার্ড চলে না। যদিও চলে তাও হাতেগোনা দুই-তিনটি ব্যাংকের এটিএম বুথে।’ তিনি আরও বলেন, ‘সোনালী ব্যাংকের এটিএম কার্ড দিয়ে আজ ২০ হাজার টাকা তুলতে অন্য এটিএম বুথে যাই। প্রত্যাশিত টাকার পরিমাণ লেখার পর আমার একাউন্ট থেকে টাকা কেটে নিয়েছে, কিন্তু এটিএম বুথ থেকে প্রত্যাশিত টাকা বের হয়নি। এখন কবে টাকা পাব সেটা নিশ্চত না। ঈদ একদিন পর, আমার টাকা প্রয়োজন। এখন কি করি? অবশ্য এর আগেও এ ধরনের ঘটনা ঘটেছিল আমার সঙ্গে। পরে সেই টাকা পেতে আমাকে দেড় মাস অপেক্ষা করতে হয়েছে।’    

যাত্রাবাড়ীতে বসবাস করেন শরিফ সুমন। তিনি বলেন, ছুটি থাকায় আজ সকালে গুরুতর অসুস্থ মামাকে দেখতে যান বাড্ডাতে। ছয়টি এটিএম বুথে গিয়েও তিনি কোনো টাকা তুলতে পারেননি। এতে নানা বিড়ম্বনার শিকার হয়েছেন তিনি। এমন পরিস্থিতির মুখে শুধু তৌহিদ, শুভ্র সিনহা, মনির, সাফিনই পড়েননি, আরও হাজার হাজার গ্রাহককে টাকার জন্য বিভিন্ন এলাকার এটিএম বুথে ছোটাছুটি করতে দেখা গেছে।

এটিএম বুথে গিয়ে টাকা তুলতে না পারার কষ্টের কথা জানিয়ে লতিফ আকন্দ বলেন, ‘জীবনে এমন পরিস্থিতিতে কখনো পড়েছি বলে আমার মনে নেই। গ্রামে যাব হাতে টাকা নেই। টাকা তুলতে গিয়ে দেখি বেশিরভাগ বুথে নেট সমস্যা, টাকা নেই। ব্যাংক এশিয়া, ইউসিবি, সাউথইস্টসহ বেশিরভাগ ব্যাংকের বুথে অন্য ব্যাংকের এটিএম কার্ড দিয়ে টাকা তোলা যাচ্ছে না। সাতটি বুথ ঘুরে শনিআখড়া ডাচ বাংলা ব্যাংকের এটিএম বুথে যাই। সেখানে গিয়ে দেখি টাকা নেই। প্রয়োজনের কথা শুনে বুথটির নিরাপত্তাকর্মী বললেন, একটু অপেক্ষা করুন। কেউ যদি টাকা জমা দিতে আসে তবে আপনি চেষ্টা করতে পারেন। পরে আধঘন্টা অপেক্ষার পর এক গ্রাহক টাকা জমা দিতে আসলেন। পরে সেই বুথ থেকে টাকা তুলতে পেরেছি।’ 

গ্রাহকদের অভিযোগের প্রেক্ষিতে রাজধানীর বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা যায়, অধিকাংশ এটিএম বুথেই ‘এই বুথে টাকা নেই’ লেখা, কোথাও বুথের সাটার নামানো। কোথাও পোস্টার না থাকলেও এটিএম বুথগুলোতে টাকা নেই বলে গ্রাহকদের জানিয়ে দিচ্ছেন নিরাপত্তাকর্মীরা। গ্রাহক ব্যাংকে তার গচ্ছিত টাকা এটিএম বুথের মাধ্যমে তুলতে নিরাপদ ও স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন। প্রয়োজন অনুযায়ী যেকোনো সময় এটিএম বুথ থেকে টাকা তোলার সুযোগ থাকায় গ্রাহকরা ব্যাংকের শাখায় না গিয়ে বুথগুলোতেই যান টাকা তুলতে। তবে এবারের কোরবানির ছুটিতে বুথে টাকা তুলতে গিয়ে সীমাহীন বিড়ম্বনায় পড়তে হচ্ছে বলে জানান গ্রাহকরা।

শীর্ষস্থানীয় বেসরকারি ব্যাংকের ক্যাশ ম্যানেজমেন্টের দায়িত্ব পালন করছেন আব্দুল রাজ্জাক। তিনি বলেন, ‘আমি নগদ টাকা বেশি রাখি না। প্রয়োজন হলে বুথ থেকে টাকা তুলি। ঈদের ছুটিতে ব্যাংক এখন বন্ধ। কার্ড আছে এ জন্য বাসায় অতিরিক্ত টাকা রাখি নাই। কিন্তু এখন দেখছি, বিপদে পড়েছি।’ এটিএম বুথে টাকা না থাকার প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘আমি নিজেই এটিএম বুথে গিয়ে টাকা তুলতে পারিনি। পরে বউয়ের কাছ থেকে টাকা ধার করেছি।’

এটিএম বুথে নগদ টাকার সংকটের জন্য কয়েকটি উল্লেখযোগ্য কারণ তুলে ধরে আব্দুল রাজ্জাক বলেন, ঈদের আগে গ্রাহকরা যে পরিমাণ নগদ টাকা তুলেছেন তার বিপরীতে জমা হয়েছে কম। তাই সবগুলো ব্যাংকেই নগদ টাকার সংকট তৈরি হয়েছে এখন। ফলে এটিএম বুথের জন্য যে পরিমাণ টাকা গচ্ছিত রাখার দরকার ছিল তা যোগান দেওয়া সম্ভব হয়নি। আরেকটি কারণ উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘আমরা এটিএম বুথের জন্য যে টাকা রেখেছিলাম তা দিয়ে কমপক্ষে পাঁচ-ছয়দিন চলার কথা ছিল। অনেক গ্রাহক বুথ থেকে অতিরিক্ত টাকা তুলে ফেলেছেন। এতে দুইদিনের মধ্যেই এটিএম বুথগুলো খালি হয়ে গেছে।’

এর আগে গত ২১ মে বাংলাদেশ ব্যাংক এক নির্দেশনায় ঈদুল আজহার ছুটিতে সব বাণিজ্যিক ব্যাংক, মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিস, পেমেন্ট সার্ভিস প্রোভাইডার ও পেমেন্ট সিস্টেম অপারেটরদের ডিজিটাল লেনদেন ও এটিএম সেবা সার্বক্ষণিক সচল রাখার নির্দেশ দিয়েছিল।

নগদ টাকা তোলার ক্ষেত্রে কোনো বিধিনিষেধ নেই উল্লেখ করে বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান বলেন, যেসব ব্যাংক ঠিকমতো এটিএম সেবা দিতে পারছে না বা নগদ টাকার জোগান নিশ্চিত করতে পারছে না, তাদের এটিএম বুথ বন্ধ করে দেওয়া উচিত।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *