টাঙ্গাইলে সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত নওগাঁর ১০ জনকে আহাজারি, কান্না আর অশ্রুসজল চোখে শেষ বিদায় জানিয়েছেন পরিবারের সদস্য, স্বজন ও এলাকাবাসীসহ স্থানীয় প্রশাসনের কর্মকর্তারা। নওগাঁর মান্দা উপজেলার রাজেন্দ্রবাটি গ্রামে আজ মঙ্গলবার (২৬ মে) দুপুরে একই সঙ্গে সাত জনের জানাজা শেষে পাশাপাশি দাফন করা হয়। এছাড়া আজ ভোরে বাকি তিন জনের মধ্যে পাকুড়িয়া গ্রামের দুজন এবং নিয়ামতপুর উপজেলার একজনকে দাফন করা হয়।
শেষ বিদায়ে প্রিয়জনদের মরদেহ ঘিরে বুকফাটা কান্না ও আর্তনাদে এলাকার পরিবেশ ভারি হয়ে ওঠে। স্থানীয়রা বলছেন, একসঙ্গে এত মানুষের মৃত্যু কখনো দেখেনি তারা। একসাথে জানাজা শেষে গ্রামের কবরস্থানে দাফন করা হয় সবাইকে।
সারি সারি করে রাখা মরদেহগুলো ঘিরে স্বজনদের আহাজারিতে ভারি হয়ে উঠেছে মান্দার রাজেন্দ্রবাটি গ্রামের আকাশ-বাতাস। শেষবারের মতো প্রিয় মুখটি দেখতে দূর-দূরান্ত থেকে ছুটে এসেছেন আত্মীয়-স্বজনরা। চোখে অশ্রু আর বুকফাটা কান্নায় স্তব্ধ হয়ে আছে পুরোগ্রাম।
একসঙ্গে এত মানুষের মৃত্যু এর আগে কখনও দেখেননি তারা। শোকের ছায়া নেমেছে প্রতিটি ঘরে। কেউ হারিয়েছেন বাবা, কেউ ভাই, কেউবা জীবনের একমাত্র উপার্জনক্ষম মানুষটিকে। স্বজনদের কান্না আর বিলাপ বাতাস ভারি করে তুলছে।
গতকাল সোমবার (২৫ মে) ভোরে টাঙ্গাইলের কালিহাতীতে রডবোঝাই ট্রাক উল্টে নওগাঁর একই গ্রামের ৬ জনসহ ১০ জনের মর্মান্তিক মৃত্যু হয়। তাদের ১০ জনের দাফন আজ ভোরে ও দুপুরে সম্পন্ন হয়েছে।
আজ মঙ্গলবার (২৬ মে) সকাল ১০টা ৪৫ মিনিটে নওগাঁর মান্দা উপজেলার রাজেন্দ্রবাটি গ্রামের একটি মাঠে জানাজা শেষে তাদের পাশাপাশি কবরস্থ করা হয়।
গতকাল সোমবার (২৫ মে) সন্ধ্যা সাড়ে সাতটার দিকে টাঙ্গাইল জেনারেল হাসপাতালে ময়নাতদন্ত শেষে স্বজনদের কাছে মরদেহগুলো হস্তান্তর করে টাঙ্গাইল জেলা পুলিশ। মরদেহগুলো আজ মঙ্গলবার (২৬ মে) ভোরে মান্দার রাজেন্দ্রবাটি গ্রামে এসে পৌছায়।
মঙ্গলবার (২৬ মে) সকালে রাজেন্দ্রবাটি গ্রামে গিয়ে দেখা যায়, মরদেহগুলো দাফনের জন্য আশেপাশের গ্রাম থেকে আনা হচ্ছে খাঁটিয়া। শরিয়া নিয়ম অনুযায়ী, মরদেহগুলো সারি করে রাখা ৬টি খাটিয়াতে রাখা হয়েছে। তাদের এক নজর দেখতে ভিড় করছেন আশেপাশের কয়েক গ্রামের প্রতিবেশিসহ নিহতদের স্বজনরা।
জানাজায় রাজশাহীর বিভাগীয় কমিশনার ড. আ ন ম বজলুর রশিদ, রাজশাহী রেঞ্জের ডিআইজি মোহাম্মদ শাজাহান, নওগাঁ-৪ (মান্দা) আসনের সংসদ সদস্য ডা. ইকরামুল বারি টিপু, নওগাঁ-১ আসনের সংসদ সদস্য মোস্তাফিজুর রহমান, নওগাঁর জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম, জেলা পুলিশ সুপার মোহাম্মদ তারিকুল ইসলাম, মান্দা উপজেলা নির্বাহী অফিসার আখতার জাহান সাথী, মান্দা থানা পুলিশের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) খোরশেদ আলমসহ আশেপাশের গ্রামের কয়েক হাজার মানুষ অংশগ্রহণ করেন।
রাজশাহীর বিভাগীয় কমিশনার আ ন ম বজলুর রশিদ বলেন, নিহত পরিবারগুলোকে জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে ইতোমধ্যে প্রতি পরিবারের মাঝে ২৫ হাজার টাকা এবং শুকনা খাবার বিতরণ করা হয়ে। এটি অত্যন্ত হৃদয়বিদারক ঘটনা। এ ঘটনায় আমরা সকলেই শোকাহত। এক গ্রাম থেকে ৬ জন মানুষের এক সঙ্গে চলে যাওয়া আমাদেরকে মর্মাহত করেছে। পরিবারগুলোকে প্রশাসনের পক্ষ থেকে সার্বিক সহযোগিতা করা হবে।
প্রসঙ্গত, সোমবার (২৫ মে) ভোর ৪টার দিকে ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়কের কালিহাতিতে রডবোঝাই একটি ট্রাক উল্টে ১৫ জন নিহত হয়। মহাসড়কের সরাতৈল দক্ষিণপাড়া এলাকায় এ দুর্ঘটনা ঘটে। নিহতদের ১০ জনের বাড়ি নওগাঁয়। এর মধ্যে নওগাঁর মান্দা উপজেলার রাজেন্দ্রবাটি গ্রামে ৭ জনের, পাকুড়িয়া গ্রামের দুজন এবং নিয়ামতপুর উপজেলার একজন। নিহতরা সকলেই পরিবারের সদস্যদের সাথে ঈদ করার উদ্দেশে বাড়ি ফিরছিলেন।
নওগাঁর নিহতরা হলেন মান্দা উপজেলার সাকিম মিয়ার ছেলে মো. সাগর মিয়া (২০), একই এলাকার শহিদুল ইসলামের ছেলে রবিউল ইসলাম (২৫), আব্দুর রশিদের ছেলে মো. বারিক (২১), একই উপজেলার আব্দুর রহিমের ছেলে বাদশা (৩২), উপজেলার পাকুরিয়া গ্রামের রশিদের ছেলে গিয়াস (২০) ও তার ভাই মাইনুল (২৮), রাজেন্দ্রবাটি এলাকার একাব্বর আলীর ছেলে ইয়াকুব (২০), একই এলাকার সুলতানের ছেলে তারেক (২০), জাফরের ছেলে মাইনুল (৩৫), নিয়ামতপুর উপজেলার রামগা এলাকার সুজন আলী (৩৫)।
নওগাঁর মান্দা উপজেলার ভারশো ইউনিয়নের বিলবেষ্টিত রাজেন্দ্রবাটি গ্রামে এখন শুধু শোকের মাতম। যে গ্রামে ছিল জীবনের কোলাহল, সেখানে এখন শুধুই শোকের নীরবতা।