বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর পাশাপাশি প্রতি ৬ মাস পর পর দাম সমন্বয়ের প্রস্তাব করা হয়েছে। ভবিষ্যতে জ্বালানির দাম বেড়ে গেলে গণশুনানি ছাড়াই দাম বাড়ানোর ফর্মূলা চায় বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (বিপিডিবি)।
বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনে (বিইআরসি) দাখিলকৃত বিদ্যুতের দাম বৃদ্ধির প্রস্তাবে এমন আবেদন করা হয়েছে।
বিপিডিবির প্রস্তাবে বলা হয়েছে, বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যয়ের অধিকাংশই জ্বালানি ব্যয়। বর্তমানে বিশ্বব্যাপী কয়লা, ফার্নেস অয়েল, ডিজেল ও এলএনজির দাম দ্রুত পরিবর্তন হচ্ছে। মূল্য বৃদ্ধির কারণে জ্বালানি খরচ বেড়ে যাচ্ছে। পরিবর্তিত মূল্যের সঙ্গে বিদ্যুতের উৎপাদন পর্যায়ে দাম সমন্বয় করা হয়।
গড় জ্বালানি ব্যয় বৃদ্ধি পেলে ইউনিট প্রতি জ্বালানি ব্যয় যে পরিমাণ বৃদ্ধি পাবে সেই পরিমাণ দাম স্বয়ংক্রিয়ভাবে বৃদ্ধির ব্যবস্থা রাখা প্রয়োজন। গড় জ্বালানি ব্যয় বৃদ্ধি কিংবা কমে গেলে পাইকারি দাম সমন্বয় করার ব্যবস্থা রাখা প্রয়োজন।
বিপিডিবির আবেদন, প্রতি ৬ মাস পর পর জ্বালানি খরচের ভিত্তিতে দাম সমন্বয়ের প্রস্তাব করা হয়েছে। প্রতি ৩ মাসের ভারিত গড়ের ভিত্তিতে হিসাব বিবরণী দাখিল করবে বিপিডিবি, সেই তথ্যের ভিত্তিতে বিইআরসি আদেশ জারির ব্যবস্থা করবে।
বিইআরসি চেয়ারম্যান জালাল আহমেদ বার্তা২৪.কমকে বলেছেন, বিইআরসি চাইলে ৬ মাস পর পর সমন্বয়ের আদেশ দিতে পারে। তবে বিষয়টি ঝুঁকি আছে কি-না যাচাই করতে হবে। গণশুনানিতে বিষয়টি নিয়ে নিশ্চয় আলোচনা হবে।
ঝড়ো গতিতে চলছে বিদ্যুতের দাম বৃদ্ধির তৎপরতা। পাইকারি এবং খুচরা দাম বৃদ্ধির পাশাপাশি সঞ্চালন চার্জ বৃদ্ধির প্রস্তাব করা হয়েছে। আগামী ২০ ও ২১ মে গণশুনানির তারিখ নির্ধারণ করেছে বিইআরসি। সব ঠিক থাকলে জুন থেকেই বাড়তি বিল গুনতে হতে পারে বলে আভাস পাওয়া গেছে।
পাইকারি পর্যায়ে ইউনিট প্রতি ১.২০ টাকা (১৭ শতাংশ) থেকে ১.৫০ টাকা (২১ শতাংশ) দাম বাড়ানোর প্রস্তাব দিয়েছে বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (বিপিডিবি)। অন্যদিকে গ্রাহক পর্যায়ে ১.২৯ টাকা (১৪.২১ শতাংশ) থেকে ১.৬১ টাকা (১৭.৭৬ শতাংশ) বৃদ্ধির প্রস্তাব করা হয়েছে।
পাইকারি ও খুচরা দাম বৃদ্ধির পাশাপাশি পিজিসিবিও (পাওয়ার গ্রিড বাংলাদেশ পিএলসি), প্রতি ইউনিটে ১৬ পয়সা সঞ্চালন চার্জ বাড়ানোর প্রস্তাব করেছে। পাশাপাশি, পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ড, ডেসকো, ডিপিডিসি, ওজোপাডিকো এবং নেসকো গ্রাহক পর্যায়ে দাম বৃদ্ধির প্রস্তাব করেছেন বলে বার্তা২৪.কমকে নিশ্চিত করেছেন বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের (বিইআরসি) চেয়ারম্যান জালাল আহমেদ।
বিপিডিবির পাইকারি দাম বৃদ্ধির প্রস্তাবে বলা হয়েছে, ২০২৬-২৭ অর্থবছরে বিদ্যুতের সম্ভাব্য উৎপাদন খরচ পড়বে প্রায় ১ লাখ ৪৩ হাজার ১০৮ কোটি টাকা। প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের দাম পড়বে ১২.৯১ টাকার মতো। বিদ্যমান পাইকারি দামে বিক্রিতে আয় হবে ৭৭ হাজার ৫৫৩ কোটি টাকা। এতে করে ঘাটতি দাঁড়াবে প্রায় ৬৫ হাজার ৫৫৫ কোটি টাকা। ইউনিট প্রতি ১.২০ টাকা (১৭ শতাংশ) বৃদ্ধি হলে ঘাটতি কমবে ১ হাজার ৩২৯ কোটি আর ১.৫০ টাকা (২১ শতাংশ) হারে দাম বাড়লে ঘটতি কমবে ১ হাজার ৬৬৬ কোটি টাকা।
আইন অনুযায়ী বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর এখতিয়ার বিইআরসির হাতে। নিয়ম অুনযায়ী প্রস্তাব পাওয়ার পর যাচাই-বাছাইয়ের জন্য টেকনিক্যাল কমিটি গঠন করা হয়েছে। দাম বৃদ্ধির প্রস্তাব এবং টেকনিক্যাল কমিটির রিপোর্ট গণশুনানিতে উপস্থাপন করা হয়। সেখানে সকল পক্ষের মতামত নিয়ে সিদ্ধান্ত দেন বিইআরসি। তবে প্রস্তাব পাওয়ার এক সপ্তাহের কম সময়ে টেকনিক্যাল কমিটি গঠন এবং গণশুনানির তারিখ নির্ধারণের ঘটনা নজির বিহীন।
সর্বশেষ ২০২৪ সালের ২৯ ফেব্রুয়ারি নির্বাহী আদেশে বিদ্যুতের দাম বাড়ানো হয়। ওই আদেশে পাইকারি বিদ্যুতের গড় দর ৬.৭০ টাকা থেকে ৫ শতাংশ বাড়িয়ে ৬.৯৯ টাকা করা হয়। অন্যদিকে গ্রাহক পর্যায়ে গড়ে ৮.৫০ শতাংশ হারে দাম বৃদ্ধি করা হয়। তার আগে ৩০ জানুয়ারি এবং ১২ জানুয়ারি বিদ্যুতের দাম বাড়িয়ে গেজেট প্রকাশ করে বিদ্যুৎ বিভাগ।
আর বিইআরসি সর্বশেষ ২০২২ সালের ২১ নভেম্বর পাইকারিতে ইউনিট প্রতি ১৯.৯২ শতাংশ বাড়িয়ে ৬.২০ টাকা নির্ধারণ করে। এরপর বিতরণ কোম্পানিগুলোর আবেদনের প্রেক্ষিতে ২০২৩ সালের ৮ জানুয়ারি গণশুনানি করে প্রায় গুছিয়ে এনেছিল নতুন দর ঘোষণার প্রস্তুতি।
হঠাৎ করে বিইআরসিকে থামিয়ে নির্বাহী আদেশে দাম বাড়িয়ে দেয় তৎকালীন সরকার। তারপর আইনও সংশোধন করে বিইআরসির ক্ষমতায় ভাগ বসায় নির্বাহী বিভাগ। অন্তবর্তীকালীন সরকার আইনটি বাতিল করায় একক এখতিয়ার ফিরে পেয়েছে বিইআরসি।
এসএন/পিডিকে