ইরান-সমর্থিত হুথি বিদ্রোহীদের ধারাবাহিক ও প্রাণঘাতী হামলার মুখে পড়েছে সৌদি আরব। গত শনিবার রিয়াদের কিং খালিদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে এক ভয়াবহ হামলায় ১২ জন নিহত এবং ৩০০ জনেরও বেশি মানুষ আহত হয়েছেন। এক দশকেরও বেশি সময়ের মধ্যে বিশ্বের শীর্ষ তেল রফতানিকারক দেশটির প্রধান বিমানবন্দরে এটিই সবচেয়ে বড় ও প্রাণঘাতী হামলার ঘটনা। পরিস্থিতির ভয়াবহতায় বিদেশি কূটনৈতিক মিশনগুলো তাদের নাগরিকদের ওই বিমানবন্দর এড়িয়ে চলার পরামর্শ দিয়েছে।
চলতি বছরের শুরুর দিকে ইরান-সমর্থিত হুথি বিদ্রোহী ও সৌদি-সমর্থিত ইয়েমেন সরকারের মধ্যকার যুদ্ধবিরতি ভেস্তে যাওয়ার পর রিয়াদ সেখানে সামরিক তৎপরতা বাড়ালে এই উত্তেজনার সৃষ্টি হয়। ইয়েমেনের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ ভূখণ্ড হুথিদের নিয়ন্ত্রণে, যেখানে দেশটির ৭০ থেকে ৮০ শতাংশ মানুষ বাস করেন। গত মাসে লোহিত সাগর উপকূলের বেশ কিছু কৌশলগত এলাকা হুথিরা দখল করে নিলে তাদের বিরুদ্ধে সৌদি আরব বিমান হামলা চালায় এবং সরকারি বাহিনীর পাল্টা অভিযানে সমর্থন দেয়। এর জবাবে সৌদি আরবের অত্যন্ত সংবেদনশীল তেল ও পর্যটন অবকাঠামোকে লক্ষ্যবস্তু বানাতে শুরু করেছে হুথিরা।
তবে হুথিদের এই ক্রমবর্ধমান পাল্টা হামলা সৌদির কোটি কোটি ডলারের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার চরম দুর্বলতা প্রকাশ করে দিয়েছে। পাশাপাশি তেলের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে অর্থনীতিকে বৈচিত্র্যময় করতে সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান রিয়াদকে যেভাবে বিনিয়োগ ও ব্যবসার নিরাপদ গন্তব্য হিসেবে গড়ে তোলার চেষ্টা করছিলেন, তার সেই নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতার ভাবমূর্তিও মারাত্মক ক্ষুণ্ন হয়েছে।
সৌদি ও হুথিদের সামরিক সক্ষমতা
বিশ্বের সবচেয়ে সুসজ্জিত সামরিক বাহিনীর একটির মালিক সৌদি আরব। ২০২৫ সালে দেশটি তাদের জিডিপির ৬.৫ শতাংশ বা প্রায় ৮৩ বিলিয়ন ডলার প্রতিরক্ষাতে ব্যয় করেছে, যা বিশ্বে অষ্টম সর্বোচ্চ সামরিক বাজেট।
সম্প্রতি তুরস্ক ও পাকিস্তানের সঙ্গে প্রতিরক্ষা চুক্তি করা সৌদির নিজস্ব সামরিক পণ্য উৎপাদনের সক্ষমতা সীমিত। তাই তারা পশ্চিমা নির্মাতাদের, বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য ও ফ্রান্সের উন্নতমানের আধুনিক অস্ত্রের ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল। সৌদির বহরে রয়েছে এফ-১৫ ইগল, ইউরোফাইটার টাইফুন যুদ্ধবিমান এবং প্যাট্রিয়ট ও থাড-এর মতো অত্যাধুনিক ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা।
অন্যদিকে, ২০১৪ সালে সানা দখল করার পর থেকে হুথিরা তাদের অস্ত্রাগার লক্ষণীয়ভাবে উন্নত করেছে। তাদের ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র ইয়েমেন থেকে প্রায় ২ হাজার কিলোমিটার দূরের ইসরায়েলে আঘাত হানতে সক্ষম। আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে বিভ্রান্ত করতে তারা একসঙ্গে ভিন্ন ভিন্ন গতির ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করছে। তাদের কাছে মাঝারি পাল্লার হাইপারসনিক ক্ষমতার ‘প্যালেস্টাইন-২’ এবং ইরানের কদর ক্ষেপণাস্ত্রের উন্নত রূপ ‘তুফান’ ছাড়াও ‘বোরকান’ ও ‘বদর’ সিরিজের মতো বহু স্বল্পপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র রয়েছে।
যেভাবে ভেঙে পড়ছে সৌদির আকাশ প্রতিরক্ষা
সামরিক খাতে বিপুল অর্থ ঢালার পরও সৌদির প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ফাঁকি দিয়ে হুথিদের হামলা সফল হচ্ছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দেশের বিশাল ভৌগোলিক আয়তনই এর অন্যতম প্রধান কারণ।
অটোয়া ইউনিভার্সিটির নিরাপত্তা বিশ্লেষক থমাস জুনো বলেন, সৌদি আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা হুথিদের কিছু হামলা প্রতিহত করতে সক্ষম হলেও, দেশটি আয়তনে এত বড় যে ধারাবাহিকভাবে সব জায়গায় সুরক্ষা দেওয়া অসম্ভব।
উল্লেখ্য, প্রায় ২২.২ লাখ বর্গকিলোমিটারের বিশাল এলাকা জুড়ে রিয়াদ, বিমানবন্দর, তেল স্থাপনা, সামরিক ঘাঁটি ও ধর্মীয় পবিত্র শহর রক্ষা করা কেবল প্যাট্রিয়ট বা থাড ব্যবস্থার পক্ষে একা সম্ভব নয়। লন্ডনভিত্তিক ঝুঁকি বিশ্লেষণকারী প্রতিষ্ঠান মেনা অ্যানালিটিকা’র অ্যান্ড্রেয়াস ক্রিগ বলেন, এমনকি প্যাট্রিয়ট, থাড, যুদ্ধবিমান ও সেন্সরের যৌথ স্তরযুক্ত ব্যবস্থাও সৌদির মতো এত বড় দেশে সম্পূর্ণভেদ্য কোনও সুরক্ষা বলয় তৈরি করতে পারে না।
টানা আক্রমণের কারণে সৌদির ইন্টারসেপ্টর ক্ষেপণাস্ত্রের মজুতও দ্রুত ফুরিয়ে আসছে, যা বিশ্বজুড়েই সংকটজনক অবস্থায় রয়েছে।
কেন এই উত্তেজনা বাড়াচ্ছে হুথিরা?
অ্যান্ড্রেয়াস ক্রিগ বলেন, হুথিদের লক্ষ্য অর্জনের জন্য প্রতিবার প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ভেদ করার প্রয়োজন নেই। মাঝেমধ্যে দু-একটি সফল আঘাতই রিয়াদের মতো কৌশলগত লক্ষ্যবস্তুতে আতঙ্ক ছড়াতে যথেষ্ট।
বিশ্লেষক জুনো জানান, হুথিরা মূলত খেলার নিয়ম নতুন করে লিখতে চায়। সৌদি বিমান বাহিনী সানার বিমানবন্দরে হামলা চালানোয়, তারা এখন সৌদির সঙ্গেও ঠিক একই আচরণ করছে। তিনি বলেন, হুথিদের বার্তা স্পষ্ট, শান্তির মূল্য দিন দিন বাড়ছে। তিনি আরও বলেন, সৌদির জন্য এটি একটি চরম বিপর্যয়, কারণ তারা বেশ কয়েক বছর ধরে ইয়েমেন যুদ্ধ থেকে নিজেদের বের করে আনার চেষ্টা করছিল।
রিয়াদ বিমানবন্দর কেন সৌদির জন্য এত বড় দুশ্চিন্তা?
সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানের ‘ভিশন ২০৩০’-এর কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে রিয়াদ। শহরটিকে পর্যটন, বহুজাতিক প্রতিষ্ঠান ও আন্তর্জাতিক ইভেন্টের বড় হাব হিসেবে গড়ে তোলাই তাদের লক্ষ্য। কূটনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে বিমানবন্দরটি অত্যন্ত সংবেদনশীল।
ক্রিগ সতর্ক করে বলেছেন, বিমানবন্দরে এই হামলায় সামরিক ক্ষতি কম হলেও এর অর্থনৈতিক ও মনস্তাত্ত্বিক প্রভাব অত্যন্ত সুদূরপ্রসারী। রিয়াদে শুরু হতে যাওয়া ‘ডব্লিউপিসি এনার্জি কংগ্রেস’-এর মতো হাই-প্রোফাইল ইভেন্টের ঠিক আগেই শনিবারের এই প্রাণঘাতী হামলাটি ঘটল।
পূর্বে হামলার আগে কর্তৃপক্ষ নাগরিকদের ফোনে সতর্কবার্তা পাঠালেও সম্প্রতি তা বন্ধ থাকায় সাধারণ মানুষের উদ্বেগ আরও বেড়েছে। শনিবারের হামলার পর সৌদি সরকারের কোনও প্রথমিক বিবৃতি আসার আগেই বেশ কয়েকটি দেশের দূতাবাস নিজেদের নাগরিকদের রিয়াদ বিমানবন্দর এড়িয়ে চলার পরামর্শ দেয়, যা কূটনৈতিক অস্বস্তি বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে।
সূত্র: এনডিটিভি
এসএন/পিডিকে