দেশে কয়েক দশকের মধ্যে সবচেয়ে ভয়াবহ রূপ নিয়েছে সংক্রামক ব্যাধি হামের প্রাদুর্ভাব। এ মহামারিতে ইতোমধ্যে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ও স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের হিসাব অনুযায়ী শিশু মৃত্যুর সংখ্যা প্রায় ১ হাজারের কাছাকাছি গিয়ে ঠেকেছে।
আজ শনিবার (৫ সেপ্টেম্বর) আন্তর্জাতিক বার্তা সংস্থা এএফপির এক বিশেষ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, চলতি বছরের মার্চ মাস থেকে এখন পর্যন্ত হামে আক্রান্ত হয়ে অন্তত ৯৮৬ জন শিশুর মৃত্যু হয়েছে। একই সময়ে সন্দেহভাজন ও নিশ্চিত আক্রান্তের সংখ্যা ১ লাখ ৮০ হাজার অতিক্রম করেছে।
রাজধানীর ঢাকা শিশু হাসপাতালের চিত্র তুলে ধরে প্রতিবেদনে বলা হয়, হাসপাতালের হাম ওয়ার্ডগুলো এখন পূর্ণ। প্রতিদিন হাসপাতালটিতে আশঙ্কাজনক অবস্থায় শত শত শিশু চিকিৎসা নিতে আসছে। বর্তমানে হাসপাতালটিতে ১০১ জন শিশু ভর্তি রয়েছে। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, প্রতিদিন দেশে গড়ে ১ হাজারের বেশি সন্দেহভাজন হাম রোগী শনাক্ত হচ্ছে। আক্রান্তদের বেশিরভাগেরই বয়স ৬ মাস থেকে ৫ বছরের মধ্যে।
ঢাকার শিশু হাসপাতালে স্বজনদের আর্তনাদ আর অক্সিজেনের শব্দের মাঝে ৯ মাসের সন্তান সাবিত হককে নিয়ে জেগে আছেন রিমা আক্তার। গত বৃহস্পতিবার (৩ সেপ্টেম্বর) রাতে ৩০ বছর বয়সী এই মা এএফপিকে বলেন, মাত্র এক ঘণ্টা আগেই আমাদের চোখের সামনে একটা বাচ্চা মারা গেল। আজকে আমরা দুটি বাচ্চাকে মারা যেতে দেখলাম।
রিমা আক্তার আরও বলেন, এই রোগ অনেক সংক্রামক। আমার ছেলেকে প্রথমে ব্রংকাইটিসের জন্য ভর্তি করা হয়েছিল। ছাড়পত্র পাওয়ার পর আবার হামের জন্য হাসপাতােল ফিরে আসতে হয়েছে।
ছয় মাসের শিশু আয়ানের মা ১৯ বছর বয়সী সানজানা ইসলাম মদিনা বলেন, জুলাই মাস থেকেই ছেলেকে সঠিক চিকিৎসার জন্য এক হাসপাতাল থেকে অন্য হাসপাতালে দৌড়াচ্ছি। নিউমোনিয়া থেকে সুস্থ হওয়ার পরই হামে আক্রান্ত হয় আয়ান। নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (আইসিইউ) ১৫ দিন কাটাতে হয় তাকে। তিনি আরও যোগ করেন, নিউমোনিয়ার কারণে ওর ফুসফুস এমনিতেই খুব দুর্বল ছিল, তার ওপর হামের কারণে শ্বাসকষ্ট বেড়ে গেছে। গত পাঁচ দিন ধরে একটানা তাকে অক্সিজেন দিয়ে রাখতে হচ্ছে।
চিকিৎসকেরা জানিয়েছেন, হামে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে আসা শিশুদের অনেকেই অপুষ্টির শিকার, যা তাদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা আরও কমিয়ে দিচ্ছে।
প্রধানমন্ত্রীর স্বাস্থ্য বিষয়ক বিশেষ সহকারী এস এম জিয়াউদ্দিন হায়দার এই প্রাদুর্ভাবকে ‘বিধ্বংসী’ বলে বর্ণনা করেছেন। তিনি জানান, ২০২৪ সালের রাজনৈতিক সরকার পরিবর্তন এবং ২০২৫ সালের স্বাস্থ্যকর্মীদের ধর্মঘটের কারণে টিকাদান কর্মসূচি বিলম্বিত হয়। জিয়াউদ্দিন হায়দার বলেন, শিশুদের বড় একটি সংখ্যা টিকার ডোজ থেকে বাদ পড়েছিল। স্বাস্থ্যকর্মীরা এখন সেই ঘাটতি মেটাতে দ্রুত শিশুদের টিকা দিচ্ছেন।
আইইডিসিআরের সাবেক পরিচালক মহামারি বিশেষজ্ঞ মাহমুদুর রহমান জানান, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আরও বড় পরিসরে টিকাদান অভিযান চালানো দরকার। পাশাপাশি আক্রান্ত শিশুদের আলাদা রাখা, হাত ধোয়া ও সেবা প্রদানকারীদের মাস্ক ব্যবহারের মতো সচেতনতামূলক পদক্ষেপও জরুরি।