হাওরের ফসলরক্ষা বাঁধের দুই হাজার ব্লক লুট, আতঙ্কে কৃষক

নেত্রকোনার মোহনগঞ্জের ডিঙাপোতা হাওরের চরহাইজদায় ফসলরক্ষার জন্য নির্মাণ করা বাঁধ থেকে দুই হাজারের বেশি কংক্রিটের ব্লক লুটের অভিযোগ উঠেছে। গত ১৮ আগস্ট দিনগত রাত থেকে গাগলাজুর ইউনিয়নের করাচাপুর গ্রামের সামনে বাঁধটি থেকে এসব ব্লক তুলে নেওয়া হয়েছে বলে স্থানীয় লোকজন জানিয়েছেন। তাদের অভিযোগ, প্রশাসন ও পুলিশকে বিষয়টি জানানো হলেও লুটপাট বন্ধে দৃশ্যমান কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।

এ ঘটনায় গত ২৩ আগস্ট মোহনগঞ্জ থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেছেন পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) উপসহকারী প্রকৌশলী মো. এনায়েত হোসেন।

পাউবো সূত্রে জানা যায়, ডিঙাপোতা হাওরের বোরো ফসল রক্ষায় ২০১৯ সালে ৩৯ কোটি ৬৪ লাখ টাকা ব্যয়ে ৫ দশমিক ৩ কিলোমিটার অতিঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় ব্লক দিয়ে স্থায়ী ফসলরক্ষা বাঁধ নির্মাণ করা হয়।

স্থানীয় লোকজন ও পাউবো কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ১৮ আগস্ট রাতে বাঁধ থেকে দুই হাজারের বেশি ব্লক তুলে নেওয়া হয়। পরদিন বিষয়টি জানাজানি হলে পাউবোর পক্ষ থেকে থানায় জিডি করা হয়। তবে এরপরও রাতের আঁধারে বাঁধ থেকে ব্লক তুলে নেওয়া হচ্ছে বলে অভিযোগ স্থানীয়দের।

স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, এর আগেও প্রায় দেড় মাস আগে দুর্বৃত্তরা বাঁধটির কয়েকটি অংশ কেটে দিয়েছিল। তখনও কার্যকর কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।

উপজেলার বরান্তর গ্রামের বাসিন্দা বজলু মিয়ার অভিযোগ, ১৮ আগস্ট রাতে তিনি দেখতে পান পাশের ধরুন বানিয়াহারী গ্রামের ২৫ থেক ৩০ জন ব্যক্তি নৌকায় করে বাঁধের ব্লক তুলে নিয়ে যাচ্ছে। তিনি বাধা দিলে তাকে অশালীন ভাষায় গালাগাল ও দেশীয় অস্ত্র দেখিয়ে ভয়ভীতি দেখানো হয়। পরে তিনি সেখান থেকে চলে যান। এর জেরে পরদিন রাতে তার মাছের আড়তে হামলা চালানো হয় বলে অভিযোগ করেন তিনি। এ ঘটনায় থানায় লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন বজলু মিয়া।

গাগলাজুর ইউনিয়নের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান আশরাফ চৌধুরী বলেন, ধরুন বানিয়াহারী গ্রামের লোকজন রাতের আঁধারে বাঁধের ব্লক নিয়ে গেছেন বলে তারা জানতে পেরেছেন। তাদের বাড়িতে এসব ব্লক পাওয়া যাবে। থানায় অভিযোগ দেওয়ার পরও ব্লক নেওয়া বন্ধ হয়নি। এখন স্থানীয় রাজনৈতিক নেতারা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সঙ্গে কথা বলে ব্লকগুলো ফেরত দেওয়ার উদ্যোগ নিয়েছেন।

বরান্তর গ্রামের কৃষক তানিম খান আদনান বলেন, ১৮ আগস্ট রাত থেকে প্রায় প্রতিদিনই বাঁধের ব্লক তুলে নেওয়া হচ্ছে। বিষয়টি প্রশাসনকে জানানো হয়েছে এবং থানায় জিডিও হয়েছে। কিন্তু কার্যকর কোনো পদক্ষেপ দেখা যাচ্ছে না। এভাবে ব্লক তুলে নেওয়া হলে বাঁধটি ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়বে।

একই গ্রামের যুবক বায়েজিদ হোসেন বলেন, বাঁধ থেকে ব্লক সরিয়ে নেওয়া হলে সামান্য বন্যাতেই বাঁধ ভেঙে হাওরের বোরো ফসল তলিয়ে যেতে পারে। এতে ক্ষতিগ্রস্ত হবেন কৃষকেরা। তিনি ব্লক লুটের ঘটনায় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানান।

মোহনগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) হাফিজুল ইসলাম হারুন বলেন, বিষয়টি নিয়ে উপজেলা প্রশাসন, রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ ও স্থানীয় লোকজনের সঙ্গে আলোচনা হয়েছে। আগামী দুই দিনের মধ্যে লুট হওয়া ব্লকগুলো আগের জায়গায় ফিরিয়ে দিতে বলা হয়েছে। তা না হলে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) আমেনা খাতুন বলেন, পুলিশ ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছে। যারা ব্লক নিয়েছে, তাদের বাড়িতে গিয়েও খোঁজ নেওয়া হয়েছে। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের চিহ্নিত করা হয়েছে। স্থানীয় রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দের সঙ্গে আলোচনা করে দুই–তিন দিনের মধ্যে ব্লকগুলো আগের জায়গায় ফিরিয়ে দিতে বলা হয়েছে। তা না হলে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

পাউবোর নির্বাহী প্রকৌশলী শাখাওয়াত হোসেন বলেন, ব্লক লুটের ঘটনায় সংশ্লিষ্ট এলাকার দায়িত্বে থাকা পাউবোর কর্মকর্তা থানায় জিডি করেছেন।  জেলা প্রশাসন, পুলিশ প্রশাসনের সাথে এ বিষয়ে কথা হয়েছে। স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গ ও রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দের সঙ্গে আলোচনা করে ব্লকগুলো ফিরিয়ে দেওয়ার জন্য সময়সীমা বেঁধে দেওয়া হয়েছে বলে জানান তিনি।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *