শিল্পায়নে কোন প্রণোদনাই কাজে আসবে না গ্যাস ছাড়া!

গ্যাস ও নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ নিশ্চিত করা ছাড়া শিল্পায়নে কোন উদ্যোগই কাজে আসবে না! এমনকি রুগ্নশিল্প বাঁচাতে বাংলাদেশ ব্যাংকের ২০ হাজার কোটি টাকার পুনঃঅর্থায়ন বা প্রি-ফাইন্যান্স স্কিমের সফলতা নিয়েও সংশয় প্রকাশ করেছেন ব্যবসায়ীরা।

তারা বলেছেন, গ্যাস সংযোগ বন্ধ রেখে শিল্পায়ন আশা করা মূল ফটক বন্ধ করে কেউকে দাওয়াত দেওয়ার নামান্তর। শত-শত বিনিয়োগকারী কারখানা রেডি করে বসে রয়েছেন গ্যাসের অভাবে চালু করতে পারছেন না। কারখানা চালু করতে না পারায় অনেকে ব্যাংকের কিস্তি দিতে না পেরে চালু করার আগেই রুগ্ন হয়ে পড়েছে। রেডি কারখানা যখন গ্যাস অভাবে কারখানা চালু করতে পারছে না, তেমন পরিবেশে নতুন বিনিয়োগকারী ঝুঁকি নিতে চাইবে কেন!

উদ্যোক্তারা দাবি করেছেন, কারখানা তৈরি করার পর জুতার তলা ক্ষয় করে গ্যাস সংযোগের অনুমোদন পেয়েছে। এরপর কোটি কোটি টাকা নিরাপত্তা জামানত দিয়েছি, তারপরও গ্যাস সংযোগ মিলছে না। আমাদের জামানতের টাকায় গ্যাস কোম্পানি মুনাফা করছে, আর আমরা বিনিয়োগকারীরা খেলাপী হয়ে পড়ছি।

কুমিল্লা অর্থনৈতিক অঞ্চলে মেঘনা গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রিজের (এমজিআই) এর এমন দু’টি কারখানা রয়েছে। কাঁচ তৈরির কারখানার নির্মাণ শেষ হয়েছে প্রায় আড়াই বছর আগে। আর রডের কারখানার কাজ শেষ হয়েছে দেড় বছর আগে। এমজিআই যখন বিনিয়োগ করে, তখন তারা গ্যাস-সংযোগের আশ্বাস পেয়েছিল। সরকারের সঙ্গে আলোচনার ভিত্তিতে নিজেরাই ৫৫০ কোটি টাকা খরচ করে গ্যাসলাইন ও অন্যান্য অবকাঠামো নির্মাণ করেছে; কিন্তু গ্যাস-সংযোগ আজও পাওয়া যায়নি। দুই কারখানায় বিনিয়োগ রয়েছে প্রায় ৭ হাজার ৩২০ কোটি টাকা। গ্যাস-সংযোগ না পেয়ে কারখানা দুটি চালু করতে পারছে না।

এমজিআইয়ের চেয়ারম্যান মোস্তফা কামাল বলেছেন, ‘এই বিনিয়োগ বিদেশি ঋণে হয়েছে। বিদেশি ঋণে তো আর রিশিডিউল (পুনঃ তফসিল) করা যায় না। সুদও মাফ পাওয়া যায় না। গ্যাস না পেলে কারখানা দুটি চালু করা যাবে না।’ তিনি বলেন, কুমিল্লা অর্থনৈতিক অঞ্চলে মোট সাতটি কারখানায় ১৫ হাজার লোকের কর্মসংস্থান হওয়ার কথা। সবকিছু থেমে আছে গ্যাসের অভাবে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে ব্যবসায়ীদের সভায় ২০ জুন বিষয়টি তিনি তুলে ধরেছেন।

হবিগঞ্জের মাধবপুরে স্কয়ার গ্রুপ তাদের টেক্সটাইল কারখানায় গ্যাসের লোডবৃদ্ধির আবেদন করে বসে রয়েছে দুই বছর ধরে। গ্যাস পেলে প্রায় ২ হাজার নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে। শুধু মেঘনা কিংবা স্কয়ার গ্রুপ নয় সারাদেশে এমন কয়েক’শ শিল্প ঝুলে রয়েছে গ্যাস সংযোগের অভাবে।

এক তিতাস গ্যাস ট্রান্সমিশন অ্যান্ড ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানির ৩৭৯টি শিল্পের বিপরীতে প্রতিশ্রুত লোডের পরিমাণ রয়েছে ৩৮০ মিলিয়ন ঘনফুট। যারা কোটি কোটি টাকা জামানত দিয়ে সংযোগের জন্য ঘুরছেন। পেট্রোবাংলা তথ্য অনুযায়ী ৬ গ্যাস বিতরণ কোম্পানির কাছে ১ হাজার ৮০০টির বেশি আবেদন ঝুলে রয়েছে। এরমধ্যে প্রায় ৫৫০টি প্রতিষ্ঠান সব প্রক্রিয়া শেষ করে সংযোগের (প্রতিশ্রুত সংযোগ) অপেক্ষায় রয়েছে।

অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময় জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগ থেকে অফিস আদেশ দিয়ে সংযোগ বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। এরপর থেকে স্থবিরতা নেমে এসেছে শিল্পায়নে। ওই আদেশ জারিতে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগ সচিব সাইফুল ইসলাম। যিনি গ্যাস নেই বলে এখনও ওই আদেশ বহাল রেখেছেন। এতে গোড়াতেই গলদ থেকে যাচ্ছে, আর গলদ রেখে শিল্পায়ন আশা করা কঠিন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

কনফিডেন্স গ্রুপের চেয়ারম্যান ইমরান করিম বার্তা২৪.কমকে বলেছেন, জ্বালানি হচ্ছে প্রধান চালিকা শক্তি। জ্বালানির নিশ্চয়তা না পাওয়ায় যেমন নতুন শিল্প আসতে পারছে না। অন্যদিকে চাহিদা অনুযায়ী গ্যাস সরবরাহ না থাকায় কমবেশি সব জায়গায় উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। আগে যারা কারখানা ১৬ ঘণ্টা চালাতেন এমন ৮ ঘণ্টা চালাচ্ছেন।

গত সপ্তাহে (২ জুলাই) গাজীপুরে লিথী গ্রুপের পাঁচটি পোশাক কারখানা (এ্যাপারেল-২১ লিমিটেড, ফমকম ফ্যাশন লিমিটেড, ফমকম ডাইং লিমিটেড, ফমকম প্রিন্টিং লিমিটেড ও ফমকম নিটিং লিমিটেড) অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ ঘোষণা করেছে মালিকপক্ষ। বন্ধের নোটিশে প্রথম কারণ হিসেবে উল্লেখ করেছে ঠিকমত গ্যাস সরবরাহ না পাওয়া।

পেট্রোবাংলার হিসাব অনুযায়ী দেশের প্রতিশ্রুত লোডের পরিমাণ ৫৫০০ মিলিয়ন ঘনফুট। প্রকৃত চাহিদা বিবেচনা করা হয় ৩৮০০ মিলিয়ন থেকে ৪০০০ মিলিয়ন ঘনফুট, আর সরবরাহ দেওয়া হচ্ছে মাত্র ২৭০০ মিলিয়ন ঘনফুট। অর্থাৎ অর্ধেক কারখানা বসে থাকছে গ্যাস অভাবে।

এ বিষয়ে জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের সচিব মুহাম্মদ সাইফুল আলমের দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে তিনি বার্তা২৪.কমকে বলেন, অনেক ব্যবসায়ী বেশি করে অনুমোদন নিয়ে রেখেছেন, যাতে ভবিষ্যতে সম্প্রসারণ করতে সহজ হয়। অনেক সময় বেশি চাইলে কম অনুমোদন দিয়েছে, যে কারণে হয়তো বেশি করে প্রস্তাব করেছে, কোন কোন ক্ষেত্রে বেশিই অনুমোদিত হয়েছে।

তবে জ্বালানি সচিবের ওই বক্তব্যের সঙ্গে একমত নন ফ্যালকন টেক্স লিমিটেড, প্যাসিফিক ব্লু জিন্স ওয়্যার লিমিটেডসহ অনেক প্রতিষ্ঠান। তাদের মতো অনেক শিল্প মালিক রয়েছেন যারা কেউ কেউ ৫ থেকে ১০ বছর ধরে ধর্না দিচ্ছেন সংযোগ কার্যকর করার জন্য। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারও যাদের সংযোগ ঠেকাতে রীতিমতো আদেশ জারি করে আটকে রেখেছে।

আবাসিকে গ্যাস সংযোগ বন্ধ প্রায় এক যুগ হতে চলছে, শুধু সীমিত পরিসরে শিল্প প্রতিষ্ঠানের সংযোগ দেওয়া হয়। আওয়ামী লীগের পুরো সময়জুড়ে হর্তাকর্তা ছিলেন তৎকালীন প্রধানমন্ত্রীর বিদ্যুৎ জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিষয়ক উপদেষ্টা তৌফিক ই-ইলাহী চৌধুরী। উপদেষ্টার কমিটির সুপারিশ ছাড়া কোন সংযোগ দেওয়ার সুযোগ ছিল না। আওয়ামী লীগের পতনের বছর খানের আগে সেই কমিটি বাতিল করা হলে ক্ষমতা ফিরে পায় বিতরণ কোম্পানিগুলো। সরকার পরিবর্তনের পরেও কয়েকমাস সেই পদ্ধতি চালু ছিল। ২০২৫ সালের ১৮ জুন এক অফিস মাধ্যমে আবার নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নেয় জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগ।

জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের তৎকালীন অতিরিক্ত সচিব (অপরেশন) ড. রফিকুল আলমের নেতৃত্বে ৫ সদস্যের কমিটি বিতরণ কোম্পানিগুলো থেকে অপেক্ষমাণ তালিকা চেয়ে পাঠান। সে অনুযায়ী বিতরণ কোম্পানিগুলো তালিকা প্রেরণ করেন, বেছে বেছে হাতে গোনা কয়েকটি প্রতিষ্ঠানকে অনুমোদনের সুপারিশ করা হয়। বিতরণ কোম্পানির তালিকাতে নেই, আবার মন্ত্রণালয় কমিটিও সুপারিশ করেনি। এমন কোম্পানিকেও সংযোগ প্রদানের আদেশ দেওয়ায় ব্যাপক বিতর্ক শুরু হয়েছে। পাশাপাশি ঘুষ ও দুর্নীতির যোগসুত্র খুঁজছেন অনেকেই।

জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের স্বেচ্ছাচারিতার কারণে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে হতাশা বিরাজ করছে। যে কারণে ব্যবসা সম্প্রসারণ থেকে শুরু করে নতুন বিনিয়োগে স্থবিরতা দেখা যাচ্ছে। আবার অতীতে যারা অনুমোদন পেয়েছেন তারাও কার্যকর করতে পারছেন না।

গ্যাস পেতে যেমন সমস্যা তেমনি নতুন শিল্পে ভিন্ন দাম আরেকটি বড় বাধা হিসেবে বিবেচনা করছেন ব্যবসায়ীরা। ২০২৫ সালের ১৩ এপ্রিলে গ্যাসের দাম বৃদ্ধির আদেশে বিদ্যমান শিল্পে ঘনমিটার প্রতি ৩০ টাকা বহাল রাখা হলেও নতুন শিল্পে ৪০ টাকা, একইভাবে বিদ্যমান ক্যাপটিভে ৩১.৭৫ টাকা রেখে নতুন ক্যাপটিভে ৪২ টাকা নির্ধারণ করা হয়। ওই দাম বাড়ানোর সময় ব্যবসায়ী নেতারা আপত্তি করেছিলেন। তারা বলেছিলেন নতুন প্রতিষ্ঠানে বাড়তি সহায়তা প্রয়োজন হয়। কোন কথাই কানে নিতে চায়নি জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগ।

এই যখন গ্যাসের পরিস্থিতি, নতুন করে বিদ্যুতের লোডশেডিং ব্যবসায়ীদের মধ্যে আতঙ্কের সৃষ্টি করেছে। অনেক প্রতিষ্ঠান রয়েছে ১ মিনিটের জন্য বিদ্যুৎ বিভ্রাট হলেও মারাত্মক ক্ষতি মুখোমুখী হতে হয় তাদের। এ সব সমস্যার সমাধান ছাড়া শিল্পায়ন সম্ভব নয় বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

এসএন/পিডিকে

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *