শনিবার নয়াদিল্লিতে গণজমায়েতের ডাক

ভারতে নির্বাচন কমিশন ও নরেন্দ্র মোদির বিরুদ্ধে ক্ষোভ বাড়ছে

একটি সংবাদপত্রের অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে ভারতের ভোটার তালিকা সংশোধনে অনিয়মের অভিযোগ ওঠার পর দেশটির নির্বাচন কমিশন বেশ চাপের মুখে পড়েছে এবং এ চাপ ক্রমশ বেড়েই যাচ্ছে।

‘দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস’ গত মাসে এক প্রতিবেদনে দাবি করেছে যে, খসড়া ভোটার তালিকা থেকে লাখ লাখ নাম বাদ পড়া সম্পর্কিত এই ব্যাপক সংশোধন প্রক্রিয়ার মূল সিদ্ধান্তগুলো তিন সদস্যের নির্বাচন কমিশনের দুজন কমিশনারের অনুমোদন ছাড়াই নেওয়া হয়ে থাকতে পারে।

সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান ভারতের নির্বাচন কমিশন (ইসিআই) অবশ্য এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছে। সংস্থাটি জানিয়েছে, তাদের সব সিদ্ধান্ত সর্বসম্মতিক্রমে নেওয়া হয়েছে এবং সেগুলো আইনগতভাবে বৈধ ছিল।

তবে বিরোধী দলগুলোর দাবি, প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির ক্ষমতাসীন দলকে সুবিধা দিতে বৈধ ভোটারদের নাম তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হচ্ছে।

প্রতিবেদনটি প্রকাশের পর থেকে ভারতের নির্বাচন কমিশনের প্রধান (সিইসি) জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগের দাবিতে আন্দোলন ক্রমশ তীব্র হচ্ছে। এর অংশ হিসেবে আগামী শনিবার (১০ অক্টোবর) রাজধানী নয়াদিল্লিতে পরিকল্পিত একটি প্রতিবাদ কর্মসূচিতে বিশাল গণজমায়েত হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

ভারতে গত জুলাই মাসে শিক্ষার্থীদের তীব্র আন্দোলনের মুখে শিক্ষামন্ত্রী পদত্যাগ করতে বাধ্য হওয়ার পর, ৭৬ বছর বয়সী প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির তৃতীয় মেয়াদের শাসনকালে এই নতুন অভিযোগটি একটি বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে সামনে এসেছে।

বিতর্কটি কী নিয়ে?

‘দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস’-এর খবরে বলা হয়েছে, ২০২৫ সালে ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন (এসআইআর) প্রক্রিয়া শুরু হওয়ার পর থেকেই নির্বাচন কমিশন অভ্যন্তরীণ মতভেদে জর্জরিত হয়ে পড়ে।

প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, গত ১০ মাসে এসআইআর-এর মূল সিদ্ধান্তগুলো নিয়ে নির্বাচন কমিশনের তিন কমিশনারের দুজন সদস্য ডজন খানেকেরও বেশি বার আনুষ্ঠানিকভাবে আপত্তি নথিভুক্ত করেছিলেন।

নিয়মানুযায়ী, তিন সদস্যের এই নির্বাচন কমিশনের যেকোনো সিদ্ধান্ত সর্বসম্মত সম্মতি বা সংখ্যাগরিষ্ঠতার ভিত্তিতে নেওয়া উচিত।

কেন এটি জনক্ষোভের জন্ম দিয়েছে?

নির্বাচন কমিশনের দাবি, এই সংশোধন প্রক্রিয়ার উদ্দেশ্য হলো ভুয়া বা জাল ভোটারদের চিহ্নিত করা এবং ‘বিদেশি অবৈধ অভিবাসীদের’ ভোট দেওয়া থেকে বিরত রাখা।

তবে সমালোচকদের মতে, এই অভিযানের কারণে প্রান্তিক ও সংখ্যালঘু সম্প্রদায়গুলো আনুপাতিকভাবে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

নরেন্দ্র মোদির হিন্দু জাতীয়তাবাদী দল ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) সদস্যরা দীর্ঘদিন ধরেই অভিযোগ করে আসছেন যে, প্রতিবেশী বাংলাদেশ থেকে আসা বিপুল সংখ্যক অবৈধ মুসলিম অভিবাসী জালিয়াতির মাধ্যমে ভারতের ভোটার তালিকায় নাম অন্তর্ভুক্ত করেছে।

কত মানুষকে বাদ দেওয়া হয়েছে?

ভারতীয় গণমাধ্যমে প্রকাশিত নির্বাচন কমিশনের তথ্য অনুসারে, খসড়া ভোটার তালিকা থেকে ১৩ কোটি ৩০ লাখেরও বেশি নাম বাদ দেওয়া হয়েছে।

বিশ্বের সবচেয়ে জনবহুল এই দেশটির ক্ষেত্রে এই সংখ্যাটি প্রায় মেক্সিকোর মোট জনসংখ্যার সমান, যা দেশটির মোট ভোটারের প্রায় ১৫ শতাংশ।

অবশ্য বাদ পড়া এসব নামের মধ্যে একই ব্যক্তির একাধিক এন্ট্রি (ডুপ্লিকেট) এবং মারা যাওয়া ব্যক্তিরাও অন্তর্ভুক্ত রয়েছেন।

তবে দাবি ও আপত্তি প্রক্রিয়ার নিষ্পত্তি এবং চূড়ান্ত তালিকা প্রকাশের পরেই বাদ পড়া মোট ভোটারের চূড়ান্ত সংখ্যা স্পষ্ট হবে।

আন্দোলনের পরিধি কতটা বড়?

হাজার হাজার মানুষ প্রতিবাদ জানাতে রাজপথে নেমে এসেছে এবং তরুণদের নেতৃত্বাধীন ইন্টারনেট-ভিত্তিক আন্দোলন ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ (সিজেপি) ২ অক্টোবর মুম্বাইতে নতুন করে বিক্ষোভ শুরু করেছে।

প্রতিবাদ জানাতে বিরোধী দল কংগ্রেস নয়াদিল্লিতে প্রতিবাদ সমাবেশ আয়োজন করে এবং এখান থেকে তাদের অন্যতম প্রধান নেতা রাহুল গান্ধীকে মঙ্গলবার ও বুধবার দুদিনই কিছু সময়ের জন্য পুলিশি হেফাজতে নেওয়া হয়।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লাখ লাখ অনুসারী থাকা সিজেপি গত জুলাই মাসে শিক্ষার্থীদের ভর্তি পরীক্ষার প্রক্রিয়ায় অনিয়মের অভিযোগে তৎকালীন শিক্ষামন্ত্রীকে অপসারণের আন্দোলনে সফল হয়েছিল।

বামপন্থি দলগুলোর অনুসারী ছাত্র সংগঠনগুলোর সমর্থনে এই আন্দোলনটি আগামী শনিবার আবারও ব্যাপক গণজমায়েতের আহ্বান জানিয়েছে।

সাম্প্রতিক এই আন্দোলনের অন্যতম পরিচিত মুখ হয়ে ওঠা শিক্ষার্থীদের নেত্রী নেহা বোরা এ প্রসঙ্গে বলেন, ‘গতবার আমরা যখন এভাবে একজোট হয়েছিলাম, তখন একজন ক্যাবিনেট মন্ত্রীকে পদত্যাগ করতে হয়েছিল। এবার আমরা প্রধান নির্বাচন কমিশনারের বিদায় দেখব।’

সিইসি জ্ঞানেশ কুমার কে?

৬২ বছর বয়সী জ্ঞানেশ কুমার ভারতের ইন্ডিয়ান অ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ সার্ভিস (আইএএস)-এর একজন অবসরপ্রাপ্ত আমলা। তিনি গত বছরের ফেব্রুয়ারিতে নির্বাচন কমিশন প্রধান হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন এবং ২০২৯ সালের জানুয়ারি পর্যন্ত তার এই পদে বহাল থাকার কথা রয়েছে।

জ্ঞানেশ কুমারের সিভিল সার্ভিস কর্মজীবন শুরু হয়েছিল দক্ষিণাঞ্চলীয় রাজ্য কেরালায়। এই মাসেই কেরালা সরকার ২০০৬ সালের একটি পুরোনো দুর্নীতি মামলার বিষয়ে তার বিরুদ্ধে তদন্ত শুরু করেছে।

আদালত কী বলছে?

সুপ্রিম কোর্ট সরকার এবং নির্বাচন কমিশনকে ভোটার তালিকা সংশোধন সম্পর্কিত সিদ্ধান্তগুলোর ব্যাখ্যা দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছে। এছাড়া সংশোধন প্রক্রিয়ার আইনি বৈধতাও সুপ্রিম কোর্টে খতিয়ে দেখা হচ্ছে।

গত মে মাসে আদালত যোগ্য ভোটারদের সুরক্ষায় পর্যাপ্ত ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশ দিয়ে নির্বাচন কমিশনকে দেশব্যাপী কাজ চালিয়ে যাওয়ার অনুমতি দিয়েছিল।

আগামী সপ্তাহে এই সংক্রান্ত বিষয়ে পরবর্তী শুনানির কথা রয়েছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *